আসল-নকল

ইশতিয়াক নাসির,স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান

যে দেশে যে নীতি, সেইভাবে চলাফেরা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের দেশে আপনি অনেক টাকা খরচা করে নাইকি বা এডিডাস এর জুতা পরে ঘুরলেও, লোকে ভাববে গুলিস্থানের ফুটপাথ থেকে কেনা। খালি জুতা কেন, টি-শার্ট, মাথার ক্যাপ থেকে শুরু করে সব কিছুরই নকল পাওয়া যায় আমাদের দেশের ফুটপাথে। লোকে সস্তায় কেনেও ওসব জিনিষ। তো, আপনি একা দাম দিয়ে আসলটা কিনলে লোকে বুঝবে কি করে? আর কিনে লাভই বা কি? নাইকির জুতা পরে আপনাকে সেই কাদা, ধূলা-বালির মধ্য দিয়েই পথ চলতে হবে। আপনি কোটি টাকা দিয়ে মার্সিটিজ বা বিএমডব্লিউ গাড়ি কিনতে পারেন, কিন্তু বাসের হেল্পারের কাছে আপনি সারাজীবনই ‘পেলাস্টিক’ হয়ে থাকবেন। সে যখন চিৎকার করে, ‘ওস্তাদ, ডাইনে পেলাস্টিক (প্লাস্টিক!!! বড় বাসের কাছে ছোট গাড়িগুলো কেন যে প্লাস্টিক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে আমি জানিনা)!’ তখন কিন্তু গাড়ীর ব্র্যান্ড দেখে তার ড্রাইভারকে সাবধান করেনা। রিকশাওয়ালা, ভ্যান, সিএনজি সবাই পাশ কাটানোর সময় আপনার অতি দামী ব্র্যান্ডের গাড়িটিকে একটা হাল্কা ঘষা দিয়ে যেতেই পারে।অনেক চিন্তা করে ফেসবুকে একটা মৌলিক লেখা দেন, কিছু লোক হয়ত পছন্দ করবে। কোন একটা নামীদামী বিদেশী লেখকের বই থেকে কোন কোটেশন চুরি করে স্ট্যাটাস হিসেবে প্রতিদিন দিতে থাকেন, লোকের কাছে আপনি অল্প কিছুদিনের মধেই মহান, নীতিবান লোক হিসেবে খ্যাতি পেয়ে যাবেন। হাজারে হাজারে মানুষ আপনাকে পছন্দ করা শুরু করবে। বিজ্ঞাপন বানাবেন? কোন একটা বাইরের দেশের বিজ্ঞাপন দেখে আইডিয়া নিয়ে দেশি ফ্লেভার দিয়ে একটা বিজ্ঞাপন বানিয়ে ফেলুন। চারদিকে আপনার নামে হৈচৈ পড়ে যাবে। নিজে একটা সলিড, মৌলিক আইডিয়া ডেভেলপ করে বসের কাছে নিয়ে যান। প্রথমেই শুনতে হবে, আমাদের দেশে এই রকম জিনিষ কেউ খাবেনা! নাটক বা সিনেমার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার কাজ করে। মাথা খাটিয়ে মৌলিক গল্প ভাবার চেয়ে পরিচালকরা ইদানীং নিজেই গল্প লিখে, নিজেই ডিরেকশন দিচ্ছে। লাভ, কিছু পয়সা বাঁচানো। অল্প বাজেটের নাটকে যদি স্ক্রিপ্ট লেখা জন্য হাজার পাঁচেক টাকা খরচ হয়ে যায় তো নিজের পকেটে কি থাকবে?সিনেমা দেখতে গেলেও শান্তি পাইনা। গল্প আগেই কোন না কোন তামিল বা ইংরেজী বা কোরিয়ান সিনেমায় দেখা। নকল জিনিষের মূল্য এই সমাজে বোধহয় সব ক্ষেত্রেই বেশি। যে ছেলেটা নিজে কিছু করে না কিন্তু বাবার টাকায় কেনা গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ায় তার গার্লফ্রেন্ডের অভাব হয়না অথচ যে ছেলেটা মেধাবী, ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, সে হয়ত সারা জীবন একাই থেকে যায়। পাশের বাড়ির যে মেয়েটা মেকআপ মেরে কায়দা করে ফেসবুকে ছবি দেয়না, তার দিকে হয়ত কেউ ফিরেও তাকায়না অথচ একই রকম দেখতে আরেকটা মেয়ে লেখাপড়া বাদ দিয়ে সারাক্ষণ এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায় আর পাঁচ মিনিট পর পর ফেসবুকে মুখ বাঁকা করে ছবি আপলোড করে তার পিছনে ছেলেদের লাইন পড়ে যায়। হোটেল বলি, বাসা-বাড়ি বলি, যেখানেই যাই শুধু ফার্মের মুরগী। ফার্মের মুরগী খেতে খেতে এখন এমন অবস্থা অনেক টাকা খরচ করে গ্রাম থেকে দেশি মুরগী এনে রান্না করলেও অতিথি হালকা একটু খোঁচা মেরে বলতেই পারেন, ‘ভাবী, মুরগীটা বোধহয় সেদ্ধ হয় নাই, এত শক্ত!’ আগের দিনে কেউ অসুস্থ হলে তাঁকে দেখতে যাবার সময় ফল নিয়ে যাওয়া ছিল রেওয়াজ। সেদিন আমার এক বন্ধু উত্তরার এক হসপিটালে হাঁটুর লিগামেন্ট অপারেশন করে বিছানায় পড়ে আছে। আমি দেখতে গেলাম খালি হাতে। দোকানের সাজানো যে ফলগুলো ছিল, কেন জানি মনে হচ্ছিল এইসব ফরমালিন দেয়া জিনিষ খাওয়ার চেয়ে না খাওয়া ভালো। মুড়ি খেতে এত ভালো লাগে, ডাক্তার নিষেধ করল বেশি না খাওয়ার জন্য। জিজ্ঞেস করতেই জানলাম আজকাল মুড়ি নাকি ইউরিয়া দিয়ে ভাঁজে বেশি মচমচে করার জন্য। আসল খাবার তাহলে কোথায় পাবো? গায়ে পারফিউম মেখে একটু মুড নিয়ে ঘুরবো সে উপায় নেই। বাজারে ভর্তি খালি নকল পারফিউম! বাধ্য হয়ে অনেক দাম দিয়ে আসলটা কিনলেও লোকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার পারফিউমের গন্ধটা তো খুব ভালো, কত নিসে? আমি নিরীহ মুখে জবাব দেই ‘৫০০০ টাকা’। ‘আরে মিয়া, মজা লন নাকি? আমি বলি, ‘জ্বী, রসিক মানুষ, একটু রসিকতা করলাম আর কি!’ একবার মনে আছে কলকাতার এক দোকান থেকে পিটার ইংল্যান্ডের একটা শার্ট কিনেছিলাম। বন্ধু বান্ধব কাউকে বিশ্বাস করাতে পারিনি যে সেটা আসল পিটার ইংল্যান্ড। তারপর থেকে আমি ৫০০ টাকায় খাঁটি বাংলাদেশি ফ্লেভারের গ্রামীন চেকের শার্ট কিনে পড়ি। পিটার ইংল্যান্ড আর গ্রামীন চেকের ‘চেক’ একই রকম। আসল আসল বলে এত চেঁচাই কিন্তু আসলের মজা উপভোগ করার মত সামর্থ্য কি আসলেই আমার আছে কিনা ভাবি মাঝে মাঝে।সোজা বাংলায় কুকুরের পেটে যেমন ঘি সহ্য হয়না সেরকম আর কি! ঢাকার তথাকথিত চাইনিজ, থাই রেস্টুরেন্টগুলো নিয়ে কম মজা করেছি? কারন তাদের মেন্যুলিস্টে খাবারের ‘নাম’টাই খালি চাইনিজ বা থাইল্যান্ডের মত, খাবারের টেস্ট সেই একই রকম বাংলাদেশী ফ্লেভার। কিন্তু সত্যিই যেদিন এক জাপানীজ বান্ধবী তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালো আমি খুশিতে আটখানার বদলে ষোলখানা হয়ে গিয়েছিলাম সামনে সাজানো ২৬ পদের খাবারের আইটেম দেখে। শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র ভদ্রতার খাতিরে (যেন পার্টিতে উপস্থিত কেউ আমাকে ‘গ্রাম্য ক্ষ্যাত’ না ভাবে) একটা কি দুইটা আইটেম না চিবিয়ে কোনরকমে গিলতে পেরেছিলাম। কারন একটা খাবারেও মসলা দেয়া নেই, আর লতা পাতা জাতীয় ব্যাপার স্যাপার। সবচেয়ে বিখ্যাত যে জাপানিজ আইটেম ছিল ‘সুশি’ ঐটা মুখে দেয়ার পর অল্পের জন্য বমি করিনি। ভাতের কেকের মধ্যে সিদ্ধ না করা কাঁচা মাছ দেয়া! সেই ছোটবেলায় দেখতাম ভোরবেলা মাঠাওয়ালা মাঠা নিয়ে আসত বিক্রির জন্য। হালকা লবন দেয়া মাঠা, কি মজার ছিল। বড়বেলায় সেই মাঠাই যখন দোকানের ফ্রিজে দেখতাম সাজানো তখন আমার মাথায় বাড়ি মেরেও কেউ আমাকে কোক পেপসি খাওয়াতে পারতোনা। আমি প্রতিদিন নিয়ম করে সকাল বিকাল সেই বোতলে ভরা মাঠা খেতাম। পরে একদিন টিভিতে দেখি সেই মাঠা বানানোর গল্প সচিত্র প্রতিবেদন হিসেবে দেখাচ্ছে। গুড়ো পাওডার দুধ পানিতে গুলে, সেই পানিতে সাদা রঙের টয়লেট টিস্যু মেশানো হচ্ছে মাঠার ঘনত্ব বৃদ্ধির জন্য। জীবনে অন্য কোন ব্যাপারে কখনও আফসোস না করলেও, এই টয়লেট টিস্যু মেশানো মাঠা খাওয়া নিয়ে এখনো মাঝে মাঝে আফসোস করি।

আমার সবচেয়ে প্রিয় পানীয় যদি বলি সেটা হচ্ছে খেজুরের রস। শীতের সকালে আমি একবারে এক থেকে দেড় লিটার খেজুরের রস একা সাবাড় করে ফেলতে পারব। কিন্তু একদিন এক রসওয়ালা নিজেই আমাকে বলল, আমি আপনার প্রোগ্রাম অনেক দেখসি…আপনে এই রস খাইয়েন না। জিজ্ঞেস করে জানলাম উনি খুব যত্ন সহকারে পুকুরের ঘোলা পানি ভরে এসেছেন যেন খাঁটি রস হিসেবে কেউ সন্দেহ না করে। উনি কথা দিয়েছিলেন যে শুধু আমার জন্য এক কলসী খাঁটি রস নিয়ে দেখা করবেন। পরে আর দেখা হয়নি যদিও। খাঁটি রস বেচার দরকার কি তার? এমনিতেই তো পাবলিক খায়। পাবলিকের খাওয়ার উপরে কোন কথা আছে নাকি? আমার এক ফেসবুক ফ্যান, দেখতে কিছুটা আমার মত কিন্তু মাথায় চুল আছে। ফেসবুকে নিজের নাম ‘ইসতিয়াক নাসির’ করে রেখেছে। এখন তার বন্ধু সংখ্যা আমার চেয়ে বেশি, তার প্রতিটা ছবিতে ‘লাইক’ পড়ে আমার চেয়ে বেশি। লোকে পছন্দ করেছে তাঁকে এটাই বড় কথা। নকলের রাজ্যে, আসল কোণঠাসা! রাজনীতির মাঠেও একই অবস্থা।পাবলিক আসল ত্যাগী নেতার পেছনে স্লোগান দেয় না, স্লোগান দেয় ভন্ড নেতার পেছনে। অফিসের বস প্ররিশ্রমী কর্মীর চেয়ে আগে প্রমোশন দেয় যে তাঁকে নিয়মিত তেল মারে। নকলের বাজারে একটাই ভালো ব্যাপার ঘটে মাঝে মাঝে, তা হলো আজকাল আর কেউ বিষ খেয়ে মরেনা। বিষেও ভেজাল! তবে সবচেয়ে বড় ভাগ্যবতী আমার পরিচিত এক মহিলা। উনি রাতের বেলা শরীর ভর্তি গহনা নিয়ে বিয়ে বাড়ি থেকে ফিরছিলেন আরো কয়েকজনের সাথে। রাতের নির্জনতায় যথারীতি ছিনতাইকারী আক্রমণ করে বসল। বাকী সবার কাছ থেকে হাতঘড়ি, মানিব্যাগ, আংটি এইসব ছিনিয়ে নিলেও ঐ ভদ্রমহিলার দিকে কেউ ফিরেও তাকায়নি। উনার গায়ে এত ভারি ভারি গহনা দেখে ওরা ভেবেছিল ইমিটেশন বা নকল। তিনজন ছিনতাইকারীর একজন উনার দিকে হাত বাড়াতেই ওদের সর্দার নাকি বলেছে, ‘হ্যার শরীরের এইসব ইমিটেশনের মাল বেইচ্যা এক প্যাকেট সিগারেটও কিনতে পারমুনা… হুদাই ঝামেলা বাড়াইস না’!

ছবি: গুগল