শহর একআশ্চর্য প্রেমিকার নাম-চার

আহমেদুর রশীদ টুটুল

জীবিত শহর খোঁজ করলে পাবে

কবরখানায়

শুঁড়িখানায়

আর পুরনো বেশ্যার ঘরে..

প্রয়োজনহীনতা আর যোগাযোগহীনতার মধ্য দিয়ে সম্পর্কের সুতা আলগা হয়ে পরে মানুষের সঙ্গে মানুষের , মানুষের সঙ্গে শহরের। সিলেটের কাছ থেকে ক্রমেই আমি যেরকম ভাবে আলাদা হয়ে পরেছি। আমার ভাবনা হয় আবার যদি কখনো ফিরে যেতে পারি ঢাকায় বা সিলেটে- কতটুকু আলাদা মনে হবে নিজেকে বা কতটুকু ফিরে পাবো আমার আমিকে? অভ্যস্থতা আর সংযুক্ত থাকার স্মৃতির আরেক নামই তো নস্টালজিয়া; একাধারে সুখ আর অসুখ। প্রথম কবে ঢাকা এসেছিলাম মনে নেই। তবে প্রথম এরোপ্লেনে করে ঢাকা আসার স্মৃতি মনে আছে। ছোটছিলাম, অনেক  ছোট, স্কুলে ভর্ত্তি হইনি তখনো। স্যান্ডউইচ-কেক-সুগার কিউব গুলো কী যে মজার ছিল!তখন প্লেন নামতো তেঁজগাও এয়ারপোর্টে। নাইন-টেনে পড়ার সময় থেকে যখন ট্রেনে করে ঢাকা আসতাম টঙ্গী স্টেশনে আসার পরই একটা আলাদা উত্তেজনা অনুভব করতাম। রেলাইনের দুপাশের বস্তিগুলোতে মানুষের জীবনযাপন, ঝা-ঝকঝকে সেনানিবাস-উত্তরা এবং আবার বস্তির পর বস্তির বৈসাদৃশ্য কোনো না কোনোভাবে আমাকে আক্রান্ত করতো। শহরের নতুন সংজ্ঞা মাথার ভেতর নানান প্রশ্নের জন্মদিতে শুরু করলো। অবশ্য সেই প্রশ্নের যথাযথ উত্তর এখনো ঠিকঠাক জানতে পারিনি। কী এক অদম্য বেঁচে থাকার নেশায় মানুষ ছুটে আসে শহরে। শহরের উপযোগী হয়ে উঠতে মানুষ কত কিছু যে ছেটে ফেলে নিজের থেকে ; শহরের মানুষগুলোর দিকে তাকালেই এ রকম উৎকট ভাবনায় আমার মাথা ভারী হয়ে উঠে। উৎকট ভাবনার বোঝা এই জীবনে মাথা থেকে নামবে বলে মনে হয়না। একবার হংকং যেতে হয়েছিল। আসলে গিয়েছিলাম চীন। সে যাত্রায় যখন এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে গেলাম দেখি রাস্তা দিয়ে দলবেঁধে জোড়া জোড়া নাইট ক্লাবে যাচ্ছে। পরদিন বেশ ভোরে কোথাও যাওয়ার জন্য যখন লবি পার হয়ে রাস্তায় নামছি দেখি জোড়াগুলো তখন বের হয়ে আসছে। হংকং তখনো পুরাদস্তুর বৃটিশ কলোনী।  পাশ্চাত্য ঘরানার লাইফ স্টাইল সরাসরি প্রত্যক্ষ করা সেবারই ছিল আমার প্রথম। কিন্তু আমার মাথায় সে সময় ক্রমাগত ভাবে ঘুরেছিল দুইটি শব্দ। “হংকংয়ের ঘাস”। জীবনানন্দ দাশের হংকংয়ের ঘাস দেখার জন্য আমার চোখ উদগ্রীব হয়েছিল। আমি অবশ্য পাথর আর সিমেন্টে বাঁধানো সেই নগরে খুঁজে বের করতে পারিনি জীবনানন্দ ঠিক কোন ঘাসটির কথা কবিতায় বলেছিলেন। সেবার আরেকটি ঘটনা ঘটনা ঘটেছিল। আমরা চীনের যে ফ্যাক্টরি দেখতে গিয়েছিলাম সেখানে পৌঁছে দেখি গেটের সামনে চীনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকাও উড়ানো। পরে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম, আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানাতেই নাকি এটি করা হয়েছে। সেই দৃশ্য দেখে আবেগে চোখে পানি এসে গিয়েছিল। হংকং নিশ্চিতভাবে এক আশ্চর্য জীবন্ত শহর। এই শহরে আমাদের সন্মানে এক ডিনার পার্টিতে সার্ভ করা হয়েছিল সাপের স্যুপ, বানরের মগজ ফ্রাই আর টাকিলা। টাকিলাতে আপত্তি ছিলনা তবে ওই বিশেষ স্যুপ আর ফ্রাই ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।

ছবি:গুগল