শহর এক আশ্চর্য্য প্রেমিকার নাম- পাঁচ

আহমেদুর রশীদ টুটুল

নরওয়ে অনেক বড় দেশ। এখানকার মানুষেরা বলে লম্বা দেশ। পাহাড়-পর্বত-হ্রদ আর উপকূলের দেশ। আয়তনের তুলনায় জনবসতি অল্পই। সুযোগ-সুবিধার হিসাবে সবই শহর। তারপরও গ্রামের আমেজ পাওয়া যায় এমন প্রচুর ছোট শহর আছে। অবশ্য বড় শহরগুলোও আসলে খুব বড় নয় এখানে। এমনকি রাজধানী অসলোও লন্ডন,প্যারিস বা নিউইয়র্কের তুলনায় একদম পিচ্চি একটা শহর। অসলো থেকে ট্রেনে ঘন্টা দুয়েকের দূরত্বের একটা শহরের নাম লিল্লেহামার। গত সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো এই শহরে যাওয়া হয়েছিল। প্রতিবছর এখানে দ্যা নরওয়েজিয়ান লিটারেচার ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করা হয় বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে। গত বছর এই ফেস্টে আমার পাঁচটি কবিতা নরওয়েজিয়ান ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল। অনুবাদ করেছিলেন আর্লিং কিটেলসেন। নরওয়ের বিখ্যাত এই কবি-সাহিত্যিক-অনুবাদক কিটেলসেন ২০১৬র বইমেলার সময় বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। মাত্র সপ্তাহখানেকের ভ্রমনে তিনিও বুঝতে পেরেছিলেন ঢাকার কবিদের দলাদলি আর গলাগলির হাবভাব। এই শহরের মাঝখানে একটা বিশাল কাঠের তাবুর মতো বানানো হয়। সেই তাবুতে বসে কবিতা পাঠের আসর, গানের আসর বা কথোপকথন। মানুষজন টিকেট কেটে সেই অনুষ্ঠানগুলো উপভোগ করে। একদিন বিকেলে আমার কবিতাগুলোও পাঠ করেছিলাম বাংলায় ও অনুবাদে। লিট ফেস্ট নিয়ে এই কয়েকটাদিন পুরা শহরটাই মেতে থাকে। অনেক লেখক-শিল্পীর সমাগম ঘটে শহরে। আর্ট এক্সিবিশন, কার্টুন এক্সিবিশন, সেশনের পর সেশন, বক্তৃতা ইত্যাদি নানা আয়োজনে মেতে থাকে শহর। এবার অবশ্য এসেছি একটা কনফারেন্সে জয়েন করতে সঙ্গে লিট ফেস্ট দেখা। নরওয়েজিয়ান ভাষায় লিল্লে শব্দের মানে হলো বেগুনি রং। লিল্লেহামার আক্ষরিক অর্থেই একটা কালারফুল শহর। সারা বছরই এখানে নানান ইভেন্ট চলতে থাকে। ১৯৯৪ সালে এই শহরে শীতকালীন অলিম্পিক অনুষ্টিত হয়েছিল। এখানকার অলিম্পিক মিউজিয়ামে গেলে অলিম্পিকের আগা-পাছতলা সবই জানা যায়। আর্ট মিউজিয়ামও সমৃদ্ধ। লিল্লেহামার নরওয়ের সবচেয়ে লম্বা মোইয়সা লেকের তীরে অবস্থিত। প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য পুরা নরওয়ই বিখ্যাত। বিখ্যাতের মধ্যে আবার লিল্লেহামার হলো আরো বেশি বিখ্যাত, অনেক বেশি মনোমুগ্ধকর। তবে নরওয়েতে এখনো অনেক বেশি পর্যটক আসেনা। নরওয়ের সরকার ফ্রি-টু্রিজমকে প্রমোট করে না। নরওয়ের মানুষজনও পর্যটনের নামে তাদের পরিবেশ দুষিত করা পছন্দ করে না।ফ্রিদইয়ফ নানসেন( ১৮৬১-১৯৩০ )নামে নরওয়েতে একজন মানবতাবাদি বিজ্ঞানী-কুটনীতিবীদ ও ক্রীড়াবিদ ছিলেন। যুদ্ধ বিগ্রহ ইত্যাদি নানান রাজজনৈতিক সমস্যায় ভারাক্রান্ত মানুষদেরকে রিফিউজ করার ধারনা নানসেনই প্রতিষ্টা করেছিলেন।তাঁর প্রবর্তিত নানসেন পাসপোর্টই হলো আজকের ইউএনসিআরএইচ পাসপোর্ট। ১৯২২ সালে তিনি মানবতায় অবদান রাখার জন্য নোবেল পুরষ্কার পান। নানসেন এর নামে লিল্লেহামারে একটি একাডেমি আছে। এখানে ফোক, ক্রিয়েটিভ রাইটিং, ক্রিয়েটিভ আর্ট বিষয়ে নির্বাচিত লেখক-শিল্পীদেরকে নিয়ে প্রোগ্রাম-কোর্স-সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এই লিল্লেহামারের দুইজন সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। একজন বিয়োর্নস্টেইয়োর্নেবিয়োর্নসন্স (১৮৩২-১৯১০)। নরওয়ের জাতিয় সংগীতের রচয়িতা এই কবি নোবেল পেয়েছিলেন ১৯০৩ সালে। আরেকজন হলেন সিগরিড উন্ডসেট (১৮৮২-১৯৪৯)। ১৯২৮ সালে নোবেল পাওয়া। সিগরিড ডেনমার্কে জন্মগ্রহন করেছিলেন যদিও ,কিন্তু আমৃত্যু বসবাস করেছেন এই লিল্লেহামারে। নরওয়ে তথা সারা বিশ্বের অন্যতম আলোচিত নাট্যকার-কবি-সাহিত্যিক হেনরিক ইবসেন কিন্তু নোবেল পুরষ্কার পান নাই। আরেকটা মজার তথ্য জানিয়ে রাখি, নরওয়ের বর্তমান যে রাজা তার পুর্বপুরুষকে ডেনমার্ক থেকে ধার করে আনা হয়েছিল। সে গল্প আরেকদিন বলা যাবে।