দোলনায় দুই নারী

নীনা হাসেল

জেইন গুডাল শিম্পাঞ্জিদের মাঝখানে দোলনায় দোল খাচ্ছেন। এই অসামান্য মহিলার অসাধারন অবদান শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে আজীবন কাজ করার জন্য। তিনি কাজ করছেন বন্য প্রাণীদের সংরক্ষণে, কাজ করছেন পৃথিবীর বুক থেকে এদের বিলুপ্তি ঠেকাবার জন্য।এক বিশাল পল্লবিত গাছের সবুজ ছায়ায় তাঁর দোল খাওয়ার  ছবিটা দেখে অন্য এক সময়ের একটা মিষ্টি স্মৃতি মনে পড়ে গেল।
আমাদের বাড়ীর পাঁচিল অনেক উচু ছিল পুরানো আমলের মত। আমাদের ভাল লাগেনি। ধানমন্ডী সাতাশের বাড়ীগুলো সেই সময়ে বেশ আধুনিক ছিল।  আশেপাশের বাড়ীর পাঁচিলগুলি ছিল বেশ নিচু সেটাই তখন চলতি ফ্যাশন ছিল, আধুনিক ছিল। অবশ্য এই উচু পাচিলের মাহাত্ম পরে বুঝেছিলাম।
বাবা আমাদের জন্য একটা বেশ সুন্দর মজবুত লোহার স্ট্যান্ডের দোলনা তৈরি করালেন পিছনের উঠোনে। আমরা সবাই মহা খুশী। যেহেতু আমি বড়, দোলনায় চড়ার পালা আসতে একটু সময় লেগেছে। প্রথম দিকে প্রায় রায়ট হোয়ে যাবার উপক্রম হয়েছিল দোলনার দখল নিয়ে। কে আগে চড়বে। রত্না, সারা, জাহাঙ্গির আলমগিরের মধ্যে। তার মধ্যে ছোট ভাইবোনদের বন্ধুরাও আসত দোলনার আকর্ষণে। একদিন দোলনার মোটা দড়ি ছিড়ে দোলনা থেকে ছিটকে পড়েছিল ছোট ভাইটা। আলমগির আর ওর বন্ধু পাশের বাড়ীর জাকিমামুর ছেলে। দুজনেই বেশ ব্যাথা পেয়েছিল তবে গুরুতর কিছু ঘটেনি। সবাই বকুনি খেল চিন্তিত বড়দের কাছ থেকে। বেশ ক’দিন কেটে গেল দোলনা ছাড়াই।অবশ্য দোলনা সচল হতে সপ্তাহ খানেক লেগেছিল।আম্মা ভয় পেয়েছিলেন। তিনি চান নি দোলনা ঠিক করা হোক।যখনই আব্বাকে একা পেতাম তখনই আর্জি পেশ করতাম দোলনা ঠিক করাবার জন্য।
আমার বিকেলের প্রিয় কাজ ছিল ধীরে ধীরে দোলনায় বসে দোল খেতে খেতে বই পড়া। পা দুটো মাটি ছুঁয়ে থাকত একটু ছ্যচরাতো মাটির উপর। কাক্কু দেখে বলতেন দ্যাখ, বইয়ের পোকাটা ভাল একটা পড়ার জায়গা পেয়েছে। আব্বা চাচাদের গোপন এই প্রশ্রয় টুকু ছিল আমার জীবনের শক্তির উৎস।

কোনরকমে কিছু একটু খেয়ে বড়দের সামনাসামনি হবার আগেই নিয়েই ছুট দিই পিছনের উঠোনে। ।কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে সন্ধ্যা না হওয়া পর্যন্ত বই পড়ি দোলনায় দোল খেতে খেতে।নারকেলের দীর্ঘ চঞ্চল পাতার ছায়া দোলে বইয়ের পাতায়। আলো যতক্ষণ না পুরোপুরি মিলিয়া যায় অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসে। দাদুন এসে বকুনি দেন, ‘চোখ দুটো তো খোয়াবি।’ তবুও আরও একটু দোল খাই। বাড়ীর ভিতর থেকে জোড়ালো তাড়া এলে ছুটি বাড়ির ভেতর। তারপর শুনতে হয়,  “এত বড় মেয়ে চুল ছেড়ে অবেলায় দোল খায়। আশেপাশের বাড়ির ছাদ থেকে লোকজন দেখে কি ভাববে?” সন্ধ্যার অন্ধকারে কত রকম অশরীরীরা ঘুরে বেড়ায় গাছগাছালির ভিড়ে, খোলা উঠোনে।আম্মা আর দাদুন গজগজ করেন। জানি  আমি ভালো মেয়েদের তালিকা থেকে প্রতিদিন বিচ্যুত হচ্ছি। মনে মনে বেশ একটু রাগ হয় ঝাঁঝিয়ে জবাব দিতে ইচ্ছে করে। আব্বা তো এই দোলনা আমাদের জন্যই বানিয়েছেন।তাহলে এদের এত গা জ্বলে কেন? বিকেলে ছাদে আশেপাশের সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে ছাদে আড্ডা দেয়া, দোলনায় দোলা রাত জেগে বই পড়ার সেই আনন্দের স্বাদ ছিল অসাধারণ এক্সটেসি।  কিন্তু আম্মারা মনে করতেন বেশরম মেয়ে হয়েছি আমরা। কিশোরী মেয়ে কোথায় নারীসুলভ আচরণ করবে তা- না বালিকদের মতো করছে।তিনি মেয়েদের খেলাধুলাকে বাড়াবাড়ি ভাবতেন। এসব কারনে আমি আসলে খুব বেশীদিন দিন বালিকা বয়সে আটকে থাকতে পারিনি। উত্তরণ ঘটেছিল দ্রুত। পারিপার্শ্বিকতার কারনে মনের দিক থেকে বড় হয়ে গিয়েছিলাম। বইয়ের জগতে হারিয়ে যেতে ভালবাসতাম। সামাজিকভাবে যথাযথ হবার জন্য যে চাপ আছে সেটা ভালোই বুঝেছিলাম।
ঘরে এসে ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনার তদারকি করি। মাঝে মাঝে শাসন করি ওদের, ভালবাসি আরও অনেক বেশী। রাতের খাবার শেষে দশটার দিকে রেডিওতে একঘণ্টা রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনি আকাশবাণী কলকাতা। দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংবাদ পরিক্রমা শুনি বাবার সঙ্গে বসে। আগ্রহ নিয়ে শুনতাম সেই পরিক্রমা। রেডিও পাকিস্তানে সেসব কিছুই বলা হত না।
সেদিন ছুটির দিন ছিল। সবাই বাড়ীতেই আছে যে যার মত।
হঠাৎ জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি ধবধবে সাদা থান পরা দাদুন দোল খাচ্ছেন দোলনায়। মাথার কাপড় পড়ে গেছে।দু হাতে ধরে আছে দোলনার দড়ি। রোদের আলোয় মাথার রূপালী চুলে ধাতব আভা। এই প্রথম আমার মনে হল দাদুন দেখতে কত   সুন্দর কত, মিষ্টি দেখতে। যৌবনে তিনি শানিত সুন্দরী ছিলেন সন্দেহ নেই। আপনমনে ধীরে ধীরে দুলছিলেন। দাদুনকে বুড়োই দেখে এসেছি। কিন্তু তিনি তো সব সময় আর আশি বছর বয়সী ছিলেন না। তাঁরও খেলার সাধ ছিল। বড়দের ও দোলনায় দোল খেতে মন চায়, তাদেরও খেলতে ইচ্ছে হতে পারে। আমাকে জানলায় দাড়িয়ে থাকতে দেখে সারা এলো। ও খুব মজা পেয়ে হাসতে শুরু করল, তারপর রত্না আর আম্মাও এলেন। আমাদের হাসি শুনে দাদুন অপ্রস্তুত হলেন। তাঁর দোল খাওয়া থেমে গেল। আব্বা আমদের হাসি শুনে কৌতূহলী হয়ে তার ঘর থেকে বেড়িয়ে এলেন । আমাদের হাসাহাসির কারণ জেনে তিনি আমাদের ওপর খুব বিরক্ত হলেন। ধমকালেন আমাদের দাদুনের প্রতি রূঢ়তার জন্য। বললেন, ‘আজ থেকে এই দোলনায় শুধু আমার মায়ের। তোরা কেউ দোলনায় চড়তে পারবি না।’আব্বা তাঁর মাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তুমি এক’শ বার দোলনায় চড়বে, যখন খুশী দুলবে। ওরা যদি আবার তোমাকে জ্বালায় আমি ওদের আস্ত রাখব না।’ দাদুন লজ্জা পেয়েছিলেন। বিরক্তও হয়েছিলেন আমাদের উপর। ছেলে এসে তাঁর মনটা ভাল করে দিল।
আজ জেইন গুডআলের দোলনায় বসা ছবি দেখে অন্য এক সময়ের স্মৃতি এসে নাড়িয়ে দিল আমাকে। সেই স্থান ও সময়ে বয়স বিভেদ লিঙ্গ বিভেদের উঁচু প্রাচীরের সীমাবদ্ধতার মাঝে মেয়েদের জীবন কেটেছে এবং প্রতি মুহূর্তে তার স্বাদ আমিও পেয়েছি। বাঁধা পেয়েছি আম্মার কাছ থেকেই। তিনি মেয়েদের খেলাধুলা পছন্দ করতেন না। হয়ত তখন থেকেই স্বাধীনতার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়েছিল মনের গভীরে। দৃঢ় শিকড় গেড়েছিল অসীমের সাধ পাবার তীব্রতা। সেটা আজও আছে।
আমাদের দাদী, নানী, ফুফু খালা এরা বিন্দুতম স্বাধীনতার স্বাদ  পান নি। তাদের ইচ্ছে গুলো মাটিচাপা দিয়ে রাখতে হয়েছিল। এটাই স্বাভাবিক মনে করা হত। মজার কথা হচ্ছে এই দোলনা নিয়েই এক ধরনের সমাজের প্রতিফলন মেয়েদেরকে নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে রাখার প্রবণতাও রাজনীতি ছিল।
মেয়েরা খেলবে এ নিয়ে বাড়ীর মহিলাদের মধ্যেই প্রতিহত করার প্রবণতা সেই সময়ের সমাজের মাইক্রোসম। প্রতিমুহূর্তের পারস্পরিক ব্যবহার ও আচরণে তা উচ্চারিত হয়েছে। নারীর মনন স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রন করা হয়েছে বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে।
আমার ছোট ভাইয়েরা যখন বাড়ীর সামনের লনে ক্রিকেট, ফুটবল খেলেছে তা নিয়ে কখন কোন সমস্যা ছিলো না। কেউ বলেনি ছেলেরা খেলবে না।
জেন গুডআলকে শিম্পাঞ্জীদের মাঝে দোল খেতে দেখে মনে পড়ে গেল আমার দাদুনের কথা। দাদুনের বয়স তখন জেন গুডালের সমান ছিলো। জেন সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ান, গভীর অরন্যে শিম্পাঞ্জীদের সঙ্গে সময় কাটান। আমার দাদুন ও অনেক দিক থেকে শক্তিশালী নারী ছিলেন। তাঁর অবদান আমার জীবনে অপরিসীম। একদিক থেকে যেমন তিনি আমাদের প্রচলিত প্রথাকে মেনে চলতে চাপ দিয়েছেন অন্যদিকে তিনি মহীয়সী নারীদের
জীবনের গল্প শোনাতেন। জ্ঞান চর্চায় উৎসাহ দিয়েছেন। পরীক্ষার সময় আমার সঙ্গে রাত জেগেছেন। তিনি ছিলেন আমার গার্ডিয়ান এঞ্জেল।

ছবি:গুগল