শহর এক আশ্চর্য্য প্রেমিকার নাম-ছয়

আহমেদুর রশীদ টুটুল

আমি যত্ন করে জমাতে চেয়েছি মানুষ

অযত্নে জমে যাওয়া শহরগুলোই এখন প্রেম…

কলিকাতা কমলালয় না মেমীজানুর রহমানের একটা অসাধারণ স্মৃতিকথা পড়েছিলাম। এই বইটি যখন পড়ি তখন অবশ্য বেশ কয়েকবার আমার কলকাতা যাওয়া হয়ে গেছে। প্রথম যেবার কলকাতা যাই তখন আমি নিতান্তইকিশোর। চিকিৎসার জন্য দিল্লী যেতে হবে, সেই উপলক্ষে কলকাতা যাওয়া। সে সময় কলকাতা যাওয়ার সময় ঢাকা এয়ারপোর্টের ডিউটিফ্রি শপ থেকে প্রায় সবাই দুই কার্টন ফাইভ ফিফটি ফাইভ সিগারেট আর এক বা দুই বোতল হুইস্কি কিনে নিয়ে যেতো। দমদম এয়াপপোর্টে নেমে টেক্সিতে উঠার আগেই এগুলো বিক্রি করে ফেলা যেতো। বিক্রি করে যে লাভ পাওয়া যেতো তাতে করে দুই তিন দিনের হোটেল ভাড়া, খাবার খরচ মোটামুটি ভাবে হয়ে যেতো। তো প্রথম বার কলকাতায় গিয়ে একটু হতচকিত হয়ে গিয়েছিলাম। এয়ারপোর্ট থেকে সদর স্ট্রীট যেতে যেতে মলিন আর অপরিচ্ছন্ন শহর দেখে মনে হয়েছিল আরে, এর চেয়ে তো আমাদের ঢাকা অনেক সুন্দর।

বাস-ট্রাম মায় ট্যাক্সি পর্যন্ত জীর্ণ শীর্ণ। কলকাতাকে উপজিব্য করে বেশ কিছু বই আমার পড়া ছিলো প্রথম কলকাতা দেখার আগেই। এরমধ্যে শংকরের চৌরঙ্গী , কমরেড মোজাফফর আহমেদের আমারস্মৃতিকথা আর আবুল মনসুর আহমদের আমার দেখারা জনীতির পঞ্চাশ বছর’ র কথা মনে আছে। তখন মনে হয় সুনীল গঙ্গোধ্যায়েরপূর্ব-পশ্চিম দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ হচ্ছিল। বই টই পড়ে মনের মধ্যে কলকাতা সম্পর্কে একটা একটা ছবি আঁকা হয়েছিল। তো সেই কলকাতার সন্ধান পেলাম ধর্মতলা মোড় ফেলে জওহরলাল নেহেরু রোড ধরে নিউমার্কেট-গড়ের মাঠ-ভিক্টেরিয়া মেমোরিয়াল পাড় হতে হতে। সব নাম ধাম মনে থাকেনা। চলতে চলতে একেবারে ইতিহাসের ভিতরে ,পঞ্চাশ-একশ কী দুশো বছর পেছনে হেঁটে আসা যায়। তারপর কলকাতায় অনেক বার যাওয়া হয়েছে। বার পনেরোর মতো তো হবেই। এইআসা-যাওয়ার মাঝে কলকাতা চষে বেড়িয়েছি, একটু একটু করে একে দেখেছি-জেনেছি। কিন্তু এখনো আসলে অনেক কিছুই দেখা হয় নাই।প্রিন্সেপ ঘাটে যাবো যাবো করে যাওয়া হয়নি কোনোদিন। সেই কবে থেকে কমল কুমার মজুমদারের প্রিয় খালাসী টোলায় একবেলা আড্ডা দেয়ার লোভ, এটিও এখনো বাকি। বাকির লিস্টে আরো অনেক কিছু। সেই প্রথম দেখা আর শেষ দেখার মাঝখানে কলকাতা অবশ্য বদলে গিয়েছে অনেক। মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার আরও কতকী! প্রথম দেখার মতো জীর্ণতা টা আর নেই। অনেক স্মার্ট, অনেক পরিষ্কার এখন। রাজনৈতিক পালাবদলও ঘটেছে বিস্তর। তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির শিক্ষিত-মধ্যবিত্তিয় আদর্শিক ভাবটুকু খুব চোখে পরার মতো করে দূরে সরে গেছে। অথচ এই সংস্কৃতির উপর ভর করেই কলকাতার সাহিত্য-সিনেমা-গান-নাটক-আর্টের একটা অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছিলো। তবে রবীন্দ্র সদনের ভীড়টা এখনো ঠিকঠাক জমে।

কলকাতা শহরে এক কলেজ স্ট্রীটে বই দেখে দেখে কয়েকটা দিন পার করে দেয়া যায়। আর কফি হাউসের নস্টালজিয়া বাঙালিকে খুব সহজে ছেড়ে যেতে পারবে বলে মনে হয়না। যতবার কলকাতা গিয়েছি কলেজ স্টীট আর কফি হাউসে একবার ঢু মারার চেষ্টা করেছি। বিড়লা প্ল্যানেটেরিয়ামে শো দেখেছি দুইবার। ঢাকার বসুন্ধরার তুলনায় সাউথ সিটি মল ছোটহলে ও বেশ গোছানো মনে হয়েছে আমার কাছে। বিশেষ করে ফুডকোর্টের সংগতিপূর্ণ দামে মান সম্পন্ন খাবার। দুই হাজার বারো সালে যখন বইমেলা করতে গিয়েছিলাম তখন চৌরঙ্গী রোডে হলদিরামের ফুডসিটির শত পদের ঝাল-মিষ্টি খাবার খেয়ে একেবারে গদগদ অবস্থা। সত্যি, খাবারগুলো এখনো মিসকরি। সিরাজ, রয়্যাল, আমিনিয়ার বিরিয়ানী; আজ লিখতে বসে মনে হচ্ছে গন্ধটা যেন আশপাশ কোথাও থেকেই আসছে। নাখোদা রোডের আমানিয়া রেস্তোরাঁর নেহারি-নান বা নিউমার্কেট এলাকার বাদশা রোল, সেও যে অমৃত বটে। আমি-আমরা স্ট্রীট ফুডের জন্মের ভক্ত, রাস্তার পাশের পানিপুরি-ভেলপুরি-চাট-নুডলস; বড় খাবারের মাঝখানে এই খাবারগুলোতো হিসাব ছাড়া। এই মহানগরীর আরো কত যে মজাদার খাবার দাবার লুকিয়ে আছে, দুদিনের পর্যটকের সাধ্য কি সেসবের খবর পাত্তি বের করে আনার? কলকাতা আসবো আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কোনো না কোনো ভাবে মনে হবেনা তাকি করে সম্ভব। তবে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে গিয়েছিলাম মাত্র একবার। ঠাকুরবাড়ি এখন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। শান্তিনিকেতনেও গিয়েছি একবারই। আহা শান্তিনিকেতন! সেতো আরেক কবিতা। দুই হাজার বারোতে শান্তিনিকেতনে গিয়ে মনে হয়েছিলো, এটলিস্ট দুইটা বছর এখানে কাটাতে পারলে জীবনটা অন্য রকম হতো। দুই হাজার পনেরো সালের ডিসেম্বরে মেয়েদেরকে নিয়ে যাওয়ার একটা প্ল্যান আমরা করে রেখেছিলাম। কিন্তু ডিসেম্বর আসার আগেই আমাদেরকে সংসার-ব্যবসা সব ফেলে এক স্যুটকেসে দেশ থেকে বের হয়ে আসতে হয়েছে। প্রথমবার যেবার কলকাতা গিয়েছিলাম সেবারই সদর স্ট্রীট দিয়ে বের হয়ে নেহেরু রোডের উপরে ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম দেখেছিলাম।

কী যে অসাধারণ সংগ্রহ সেখানে! আমার কিশোর বয়সের সেই দেখার বিস্ময়ের ঘোর এখনো আমি তেমন করেই অনুভব করি। কলকাতার ট্রামে খুব বেশি চড়া হয়নি, তবে চড়েছি। ট্রাম দেখলেই আমার জীবনানন্দ দাশের কথা মনে পরে। কলকাতা জুড়ে মাকড়শার জালের মতো ট্রাম লাইন ছড়িয়ে থাকলেও একের পর এক রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাই অনলাইন পত্রিকার পাতায়। আটান্নব্বুইয়ের দিকে নিকো পার্কে যাওয়া হয়েছিলো, তখন মোটামুটি ভালই মনেহয়েছিল। কিন্তু পরবর্তিতে বোধহয় ঢাকার ফ্যান্টাসি কিংডম আর নন্দন সবকিছু মিলে অনেক এগিয়ে গিয়েছে। তবে কলকাতার সায়েন্স সিটির মতো কোনো কিছু এখনো ঢাকাতে হয়নি। ধর্মীয় মৌলবাদের কবল থেকে মানুষকে বের করে আনতে এই ধরনের প্রচেষ্টা খুব কার্যকর বলে আমি মনে করি। দালান-কোটা-ব্রীজের চেয়ে বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের প্রসার প্রকৃত পক্ষে একটা দেশ ও জাতির উন্নয়নের সূচক নির্ণয় করে বলে আমি মনে করি।

কলকাতার সাউথ সিটি মলে একটা বুক শপ দেখে আমার খুব ভাল লেগেছিলো। বেশ কয়েকবার গিয়েছিলাম সেখানে। আমি যে বুক ক্যাফের স্বপ্নটা দেখতাম, স্বপ্নের মধ্যে তার আদল এরকমই বিশাল ছিল। ঢাকা ও চিটাগঙে কয়েকটা বড় বুকশপ অবশ্য এর মধ্যে হয়ে গেছে। একত্রিশে অক্টোবরে নিহত দীপনের স্মরণে দীপনপুর নামে একটা বুকশপ চালু হচ্ছে বলে শুনেছি। বইয়ের মধ্য দিয়ে দীপনকে মনে রাখার এই প্রচেষ্টায় দীপনের স্ত্রী সফল হবেন এই প্রত্যাশা করি। আমি বলছিলাম আমার বুক ক্যাফের স্বপ্নের কথা, যে স্বপ্নটা খুব আস্তে আস্তে আমাকে রক্তাক্ত করে, ক্ষত বিক্ষত করে আমার প্রাত্যহিক চিন্তা-ভাবনার জগৎ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আমি আমার ভেতরের সকল অস্থিরতা চেপে রেখে নির্লিপ্ত নয়নে স্বপ্নের প্রস্থান অবলোকন করছি। কলকাতার পার্ক স্ট্রীটের অক্সফোর্ড বুকস্টোর, এটাও দারুণ। এই রকম একটা বইয়ের দোকান এখনো ঢাকায় হলোনা। এ পর্যন্ত যতবার কলকাতা গিয়েছি থাকা হয়েছে ঘুরে ফিরে সদরস্ট্রীট, পার্কস্ট্রীট এলাকার হোটেলগুলোতে। আবার কখনো কলকাতা গেলে অন্যকোথাও থাকার চেষ্টা করবো। এটা সত্য, কলকাতা কেন যেন টানে। বার বার যেতে ইচ্ছে করে।(…চলবে)