ইভ টিজিং: ছোট্ট শব্দ,প্রবল অনুরণন

বাবলু ভট্টাচার্য

“ইভ টিজিং প্রকাশ্যে যৌন হয়রানি, পথেঘাটে উত্ত্যক্ত করা বা পুরুষ দ্বারা নারীনিগ্রহ নির্দেশক একটি কাব্যিক শব্দ যা মূলত ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালে ব্যবহৃত হয়। ইভ দিয়ে পৌরানিক আদিমাতা হাওয়া অর্থে সমগ্র নারীজাতিকে বোঝানো হয়।

এটি তারুণ্যে সংঘটিত একধরনের অপরাধ। এটি এক ধরনের যৌন আগ্রাসন, যার মধ্যে রয়েছে যৌন ইঙ্গিতবাহী মন্তব্য, প্রকাশ্যে অযাচিত স্পর্শ, শিস দেওয়া বা শরীরের সংবেদনশীল অংশে হস্তক্ষেপ…”-উইকিপিডিয়া

‘ইভ টিজিং’ শব্দের ‘ইভ’ অর্থ নারী, টিজিং মানে উত্যক্ত বা বিরক্ত করা৷ সহজভাষায় বলা যায়, ইভ টিজিং মানে, নারীদের উত্যক্ত করা৷ তবে বিষয়টা এত সহজ না৷

ইভ টিজিংয়ের সত্যিকার অর্থ হচ্ছে, ‘‘কেউ নারী বলেই তাকে উত্যক্ত করা৷” বাক্যটা সামান্য বড় করার ফলে পুরো বিষয়টিতে লুকিয়ে থাকা সবচেয়ে জরুরি কথাটা বের হয়ে আসে৷ জানা যায়, নারীদের কেন উত্যক্ত করা হয় এবং কেন ঘটনাটিকে একটি ‘টার্ম’ দিয়ে প্রকাশ করতে হয়৷

‘ইভ টিজিং’ বলতে যেমন একটা চিত্র চোখে আসে, কিছু মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে আর বখাটে কিছু ছেলে পথে দাঁড়িয়ে দু’টো শব্দ উড়িয়ে দিচ্ছে বা শিস দিচ্ছে৷ বাস্তবে ইভ টিজিং বিষয়টা এখানেই সীমাবদ্ধ না৷ এর প্রয়োগ এতই ব্যাপক যে, ‘ইভ টিজিং’ শব্দটা পুরো ঘটনা ব্যাখ্যা করার সাপেক্ষে অনেক হালকা একটা শব্দ৷

আপনার অফিসে একজন নারীকে হেয় করে কিছু বললেন– সেটা ইভ টিজিং৷ পুরুষ শিক্ষক নারী শিক্ষার্থীকে তুচ্ছজ্ঞান করলেন বা কোনো দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখলেন– সেটাও ইভ টিজিং৷ বাসে মহিলা সিট খালি নেই বলে একজন নারীকে কন্ডাক্টর বাসেই উঠতে দিলেন না– সেটাও ইভ টিজিং৷ এমনকি পরিবারে বাবা ঠাট্টার ছলে মাকে বললেন- ‘মেয়েলোকের বুদ্ধি কম’– এটাও ইভ টিজিং৷

প্রতিদিনের এ রকম ছোট ছোট অসংখ্য ঘটনা একটি সামাজিক ধারণাতে এনে সমাজকে দাঁড় করায়, তা হচ্ছে— একজন মানুষ নারী বলেই তার শক্তি কম, অপরদিকে একজন শুধু পুরুষ বলেই তার শক্তি বেশি৷ আর সেই শক্তিবলে পুরুষ চাইলেই নারীকে হেয় করতে পারে, তাকে তুচ্ছ করতে পারে, তাকে নিয়ে উপহাস করতে পারে এবং তাকে অবহেলাও করতে পারে– এরই কেতাবি নাম, ‘ইভ টিজিং’৷

কোনোদিন মোটেই উত্যক্ত হননি এমন নারী পাওয়া বিরল৷ খুঁজলে এমন পুরুষ পাওয়া যেতে পারে, যারা কখনোই কোনো নারীকে ‘নারী বলেই উত্যক্ত করেনি৷ তবে কোনোদিন ‘ইভ টিজিং’য়ের শিকার হননি, এমনি নারী পাওয়া দুঃসাধ্য৷

ইভ টিজিংয়ের মূল কারণ, একটি শক্তির খেলা, যেখানে পুরুষেরা শক্তিশালী আর নারীরা দুর্বল৷ তবে নারীদের এই দুর্বল থাকা একটি সামাজিক প্রচেষ্টার ফল৷ ধরুন, একটি পরিবার সে পরিবারে একটা মেয়ে টিজিংয়ের শিকার হয়৷ মেয়েটি এই বিষয়টি বাড়িতে উত্থাপন করে৷ বাড়ি থেকে প্রথম প্রশ্ন করা হয়, তুই কী করিস? নিশ্চয়ই তুই কিছু করেছিস, অন্য কাউকে করল না, তোকেই কেন করল? এভাবে ঘটনা সেখানেই মিটে যায়৷

একই পরিবারের একটা ছেলে যখন শিস দিতে গিয়ে ধরা পড়ে, তখনও সবাই মিলে মেয়েটার পোশাক, চাল-চলন, দিনের কোন সময় বের হয় ইত্যাদি নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত হয়৷ ফলে ছেলেরা জানেই কাউকে টিজ করা হলে দোষ ভিকটিমের দিকেই যাবে৷ সে একটি সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ে থেকে নিরাপদে টিজিং চালিয়ে যায়৷

টিজিং নিয়ে বাংলাদেশের আইনও খুব শক্তিশালী কিছু না৷ পেনাল কোড ৫০৯-এ শুধু বলা আছে যে, “কোনো নারীর শালীনতা ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্য, কোনো শব্দ উচ্চারণ, আওয়াজ বা অঙ্গভঙ্গি তৈরি বা কোনো কিছু প্রদর্শন করে, এটা জেনে যে উক্ত নারী সেই শব্দ, আওয়াজ শুনবেন বা উক্ত নারী সেই অঙ্গভঙ্গি দেখবেন বা তা উক্ত নারীর গোপনীয়তায় আঘাত হানবে, সেক্ষেত্রে তিনি সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন৷”

এ ধারার শাস্তি পর্যন্ত যেতে হলে একজন নারীকে অনেক বাধা পার করতে হবে, সমাজ উলটো তার উপর দায় আনবে, তাকে লজ্জা দেবে, অনেক ক্ষেত্রেই এইসব আইনের মারপ্যাঁচে লেগে থাকার মতো শক্তি খরচ করার আগে তাকে অনেক অনেক শক্তি খরচ করতে হবে সামাজিক শৃঙ্খল ছিঁড়তে৷ এর পরেও যদি ধরে নেওয়া হয়, অপরাধীর শাস্তি হবে, তাহলে কে বলতে পারবে, এ সমাজে পরম-শক্তিশালী পুরুষ এক বছর কারাদণ্ড ভোগ করে এসে এই নারীর জীবন ধ্বংস করে দেবে না?

আসলে এত দূর যেতে হয় না৷ একজন নারী যখন রুখে দাঁড়ায়, তখন পুরুষের পৌরুষ বাঁচিয়ে রাখতে তার পাশে পুরো সমাজ দাঁড়িয়ে যায়৷ ফলাফল– এ দেশে আট বছরের ধর্ষিত শিশুকন্যাকে নিয়ে বাবা বিচারের আশা বাদ দিয়ে ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দেয়৷

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইভ টিজিং কীভাবে রুখে দেওয়া যায়? চেষ্টা করলে এটাও রুখে দেওয়া সম্ভব৷ তবে সম্ভব কাজটা খুব অসম্ভব হয়ে যায়, কারণ, নারী আক্রান্ত হলে, সবচেয়ে বেশি হেরে যায় জন সমর্থন তৈরিতে৷ দেখবেন, যখন একজন নারী কোনোভাবে হেয় হয়, আরেকজন নারী এসে তার পাশে দাঁড়ায় না৷ যে নিরাপদে আছে, সে নিজের গা বাঁচিয়ে সরে যায়৷ এমনকি যে আক্রান্ত হয়, সে-ও সহজে রুখে দাঁড়ায় না, কারণ, বাল্যকাল থেকে সে শিখে এসেছে ‘ভালো মেয়েরা গলার আওয়াজ তোলে না’৷ এমন বিষয়গুলো পুরুষদের সাথে হয় না৷ ছেলেদের দলে একটা ছেলে সামান্য আক্রান্ত হলেও দলের সব ছেলে বের হয়ে আসে৷ মেয়েদের সাধারণত কোনো দলই থাকে না৷

যখন একজন নারীকে হেয় করা হয়, পাশের নারীটি যদি গলা তোলেন, তারপরের জন…. তারপরের জন…. এভাবে দু’জন, পাঁচজন, দশজন? একজনকে দাবিয়ে রাখা যত সহজ, দশজনকে দাবানো এত সহজ নয়৷ যখন দশজন নারী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবে, ইভ টিজিং অনেক কমে যাবে৷

পরিবার থেকে মেয়েদের যেভাবে শিখানো হয়, তাকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, ছেলেদেরও কি এভাবে শিখানো যায় না? অন্যকে আক্রমণ করা যাবে না? এটা অন্যায়? অবশ্যই যায়, তবে বিচিত্র কারণে পরিবারগুলো এখানে নীরব ভূমিকা পালন করে, যা এই দুষ্ট চক্রকে শুধু শক্তিশালীই করে যায়৷

আইনগুলোও শক্তিশালী করা যায়, এগুলো প্রয়োগে আরও কঠোর হওয়া যায়৷ দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায়৷ যেসব ছেলে এ কাজগুলো করছে, তাদের আলাদা করে কাউন্সেলিং করা যায়৷ ২০০৯ সালের নারীর প্রতি নিপীড়ন বিষয়ে হাইকোর্টের একটি পূর্ণাঙ্গ রায় রয়েছে, সেটির ব্যবহারও খুব সীমিত৷ এতে বলা ছিল, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও চাকুরিক্ষেত্রে নারীদের হয়রানির অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য আলাদা সেল খোলা হবে৷ এর প্রয়োগও প্রায় শূন্যের কোঠায়৷

পাঠ্যপুস্তকে, গণমাধ্যমে, মসজিদে, খেলার মাঠে, ঘরে বাবা-মায়েদের মধ্যে এ ধরনের আলোচনা শুরু করা যেতে পারে, যা ছোটবেলায় ছেলেদের বুঝতে শিখাবে, নারীদের উত্যক্ত করা অন্যায়৷ নারী পুরুষের চেয়ে ছোট নয়, বরং পুরুষেরই সম্পূরক যঅংশ৷ না শিখালে ছেলেগুলোই বা শিখবে কোথা থেকে?

মানসিকতা বদলানো খুব সহজ কাজ নয়৷ তবে, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি অনেক উন্নত করা সম্ভব৷ প্রয়োজন শুধু বিশ্বাস যে, বদল আনতে হবে এবং আমাদেরই আনতে হবে৷

ছবি:গুগল