শহর এক আশ্চর্য্য প্রেমিকার নাম-আট

আহমেদুর রশীদ টুটুল

মূহুর্তগুলোর নাম ধরা যাক পাখি

অথবা পাখিগুলোর নাম মূহুর্ত

সাত দ্বীপের শহর মুম্বাইয়ের মেরিন ড্রাইভ এলাকাগুলোকে রাতের বেলা দূর থেকে ঝকঝকে সোনার নেকলেসের মতো মনে হয়। প্রথমবার গিয়েছিলাম বাল্যবন্ধু বুলবুলের সঙ্গে ভারতবর্ষ পর্যটনের উদ্দেশ্য নিয়ে, দ্বিতীয়বার বড়ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য আর শেষবার আমাদের গন্তব্য ছিলো অজন্তা-ইলোরা কিন্তু অবিরাম বৃষ্টিপাতের কারণে মুম্বাইতেই কয়েকদিন থেকে ফিরে এসেছিলাম। মুম্বাইর জাঁক-জমক দেখে যেমন চোখ কপালে উঠে তেমনি এই শহরের বস্তিগুলোর দৈন্যতা দেখে চোখ কপাল থেকে আরও উপরে উঠে যেতে চায়। প্রথম ভ্রমনের সময় একদিন প্যাকেজ ট্যুরে মুম্বাই ঘুরে দেখেছিলাম। হ্যাংগিং গার্ডেন, সঞ্জয় গান্ধী ন্যাশনাল পার্ক, ফিল্ম সিটি বা মিনি কাশ্মীর ছিলো সেই ট্যুরের উল্লেখযোগ্য অংশ। হ্যাংগিং গার্ডেনে শেষেরবারও গিয়েছিলাম। ন্যাশনাল পার্কে ঘুরার সময় শুনেছিলাম সেখানে সাদা রঙের বাঘ আছে। যদিও আমাদের চোখে পড়েনি। মিনি কাশ্মীরে কমল সাদানা আর নাম না জানা এক নায়িকার গানের স্যুটিং দেখেছিলাম। পরে অনেকদিন পর্যন্ত হিন্দী সিনেমার লিস্ট ফলো করেও এই সিনেমার ঠিকুজি আবিষ্কার করতে পারিনি। হাজী আলীর দরগা, মহালক্ষী মন্দিরসহ আরো কয়েকটি মন্দির মুম্বাই শহরের বাধ্যতামূলক দর্শনীয় জায়গা। প্যাকেজ ট্যুরে যান আর প্রাইভেট গাড়ি বা ট্যাক্সি ভাড়া করে ঘুরতে বের হন, গাইড, ড্রাইভার আপনাকে এই জায়গাগুলোতে নিয়ে যাবেই। নাম ভুলে গেছি একটা মন্দিরের সামনে গিয়ে ড্রাইভার আমাদেরকে বলেছিলো, ভেতরে ঢুকে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকো কোন না কোন স্টারকে দেখে ফেলতে পারবে। হাজী আলী দরগায় যাওয়ার রাস্তাটা যখন সকালবেলা ডুবে থাকে তখন ভক্তদের মনে কতনা অলৌকিক ধারনার জন্ম হয়। গত বৎসর ইল্যান্ডের ইস্টবর্ন এ বেড়াতে গিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে পাড় থেকে অনেক ভিতরে একটা স্থাপনা দেখে আমার হাজী আলী দরগার কথা মনে পরেছিলো। সেই স্থাপনার প্রবেশ পথে গিয়ে দেখি এটা একটা বার ও রেস্টুরেন্ট।

হাজী আলী দরগার

হিন্দী সিনেমার কোর্টের দৃশ্য দেখানোর সময় প্রায়ই একটা চওড়া, উঁচু সিঁড়ি দেখানো হয়, এই সিঁড়িটা হলো মুম্বাই এশিয়াটিক সোসাইটি লাইব্রেরীর সিঁড়ি। মুম্বাই ঘুরে বেড়ানোর সময় অনেক জায়গা-স্থাপনা আপনার পরিচিত মনে হবে হিন্দী সিনেমার বদৌলতে। আরব সমুদ্র বেষ্টিত মুম্বাইয়ের বিচ গুলো খুব একটা বড় নয়। এর মধ্যে জুহু বিচ আর চৌপাতি বিচ মোটামোটি আকারের। জুহু আর বান্দ্রা এলাকাতেই বেশিরভাগ বলিউড ফিল্মস্টারদের বাসা বা এপার্টমেন্ট। ক্রিকেটস্টার শচিন টেণ্ডুলকারের বাসাও এখানেই। শাহরুখ খানের বাসার গেইটে লেখা মান্নাত এবং এর নীচে ছোট করে লেখা ল্যান্ডস এন্ড। ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য যেবার গিয়েছিলাম তখন প্রায় একমাস থাকতে হয়েছিলো মুম্বাই। আমরা ছিলাম কোলাবা এলাকার একটা হোটেলে, হোটেলের মালিক ছিলেন করিমগঞ্জের এক ভদ্রলোকের। এই এলাকায় করিমগঞ্জের লোকজনের আরও বেশ কয়েকটা ব্যবসা ছিলো। ভালই লাগতো বিদেশবিভুঁইয়ে সিলেটি কথাবার্তা শুনতে। শেষবার যখন গিয়েছিলাম তখন বউ-বাচ্চাদের নিয়ে সে এলাকাটা একবার চক্কর দিয়ে একটা করিমগঞ্জী জুসবারে জুস খেয়ে এসেছি। এই এলাকাটা হলো গেইট ওয়ে অব ইন্ডিয়া এবং তাজ হোটেলের খুব কাছের। প্রথমবার যখন গিয়েছিলাম তখন রাজধানী এক্সপ্রেস থেমেছিলো ভিক্টোরিয়া টার্মিনালে। দ্বিতীয়বার প্লেনে গিয়েছি। ততদিনে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হয়ে গিয়েছে ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাল।

ভিক্টোরিয়া টার্মিনাল

মুম্বাইতে নানান দেশ থেকে প্রচুর ট্যুরিস্ট আসে। চিকিৎসা এবং ব্যবসার জন্যও প্রচুর মানুষ আসে। আরবের লোকেরা আসে বেড়াতে, আমোদ করতে, কেউ কেউ আসে চিকিৎসার জন্য। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের লোকজনকে দেখেছি মুম্বাই থেকে কাপড় ও অন্যান্য জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যায় তাদের দেশে বিক্রি করার জন্য। এখানকার বেশ কিছু হসপিটাল ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য বেশ বিখ্যাত। আমার বড়ভাইয়ের অপারেশন হয়েছিলো ব্রীচ ক্যান্ডি হসপিটালে। এটি মুম্বাইয়ের বেশ পুরোনো এবং নামকরা হসপিটাল। এই হসপিটালে এটেন্ডেন্ট অনুমোদন করে না। আমাকে ওয়েটিং রুমেই সময় কাটাতে হতো। তবে অপারেশনের পরে রাত বারোটা থেকে আলো না ফোটা ভোর পর্যন্ত রোগীর কেবিনে থাকার অনুমতি দিতো। কেবিনের পিছনে একটা বিশাল খোলা ছাদ ছিলো। একেবারে সমুদ্র লাগোয়া। হসপিটালে থাকার দিনগুলিতে প্রতিদিন ভোরে খোলা ছাদের রেলিং এ বসে আমি প্রাণায়াম করতাম আর অনেকক্ষণ, সূর্য উঠা পর্যন্ত নিরবে বসে বসে সমুদ্রের গর্জন শুনতাম। এই সমুদ্র-সঙ্গতের কারণেই মনে হয় অনিয়মিত খাওয়া-ঘুম সত্ত্বেও এ কয়টাদিন আমি আসলেই তেমন কোনো ক্লান্তি বোধ করিনি। ব্রীচ ক্যান্ডিতে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো রাজনৈতিক বা ফিল্মি ভিআইপিকে দেখতাম।

এশিয়াটিক সোসাইটি লাইব্রেরী

সাড়ে পাঁচ কিলোমিটারের মতো লম্বা ব্রান্দ্রা-ওরলি সমুদ্র লিংক, যার অফিসিয়াল নাম হলো রাজীব গান্ধী সমুদ্র লিংক, মুকেশ আম্বানীর বাড়ি, নতুন নতুন টাওয়ার আর পুরোনো ঐতিহ্যের স্থাপনা সবকিছুই আকর্ষণীয়, দেখার মতো। জেহাঙ্গীর আর্ট গ্যালারির অনেক নাম শুনেছিলাম। প্রথমবার , দ্বিতীয়বার চোখেও পরেছিলো। তবে দেখা হয়েছে তৃতীয়বার। সেদিন সকালে খুব বৃষ্টি ছিলো। মুম্বাইয়ের মহাবৃষ্টি মাঝে-মধ্যে জনজীবন মহাস্থবির করে দেয়। বৃষ্টির কারণে স্থবিরতার বিশ্বরেকর্ড আছে মুম্বাইয়ের। মুম্বাইতে প্রথম উপনিবেশ স্থাপন করেছিলো পর্তূগীজরা। পরে হাত বদল হয়ে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে পরে। বৃটিশরা মুম্বাইকে পাশ্চাত্যের শহরগুলোর আদলেই গড়ে তোলেছিলো। জেনেভা-প্যারিস-হেগ দেখে আমার তা-ই মনে হয়েছে।

হ্যাংগিং গার্ডেনে

সব কথা সবসময় মনে থাকে না। দেখা গেলো লেখা প্রকাশ হয়ে যাবার পর আরও কত কত জায়গার কথা, অভিজ্ঞতার কথা মনে আসে। কিন্তু তখন তো আর যুক্ত করে দেয়ার সুযোগ থাকে না। প্রথম যেবার মুম্বাই যাই তখন শুদ্ধস্বরের জীবনানন্দ সংখ্যার একটা পরিকল্পনা মাথায় ঘুরছিলো। জীবনানন্দে আসক্ত একজন বাঙালী তরুণ লেখক তখন থাকতেন মুম্বাইয়ে। সেই সংখ্যার লেখাজোকা বিষয়ে আলাপ করতে তার বাসায় গিয়েছিলাম। তারপর আর কোন যোগাযোগ ছিল না তার সঙ্গে। অনেকদিন পর ফেসবুকের মাধ্যমে আবার যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। বর্তমানে তিনি কাজ করছেন পুরুলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ফনিক্স মার্কেট সিটি

মুম্বাইয়ের কিছু শপিং সিটি কাম মাল্টিপ্লেক্স খুবই চোখ ধাঁধানো আর চুড়ান্ত রকমের আন্তর্জাতিক মানের। ফনিক্স মার্কেট সিটি এরকমই একটা কমপ্লেক্স। এইখানে একদিন আমরা একটা সিনেমা দেখে, খানিকটা ঘুরাঘুরি করে, ওপেন ফুড কোর্ট থেকে খেয়েদেয়ে, ভবিষ্যতে অগুনতি টাকা-পয়সা নিয়ে এই মার্কেটে আসার প্ল্যান করে বেশ ফুরফুরে মেজাজে হোটেলে ফিরে গিয়েছিলাম। এই কারণে তো বটেই আরো অনেক কিছু দেখার বাকি আছে বলে মুম্বাই আবার যেতে হবে, যেতেই হবে।