কাফনের সাদা রঙের ভাব কার জানা ?

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

কনকচাঁপা আমার বাবার আজিজুল হক মোর্শেদ ছিলেন একজন চিত্রকর। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সাহেবের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র ছিলেন আব্বা। কিন্তু সে সময়ে একজন সাধারন বিত্তের মানুষের পক্ষে ছবির আঁকা পেশা হিসেবে নেয়া সহজ ছিল না। তাও আবার তিনি শিশু বয়সেই বাবা হারিয়ে এতিম হয়েছিলেন। দাদীমা একদমই চাইতেন না ছবি আঁকাকে আব্বা পেশা হিসেবে নেন। বাবা আমার অসম্ভব মাতৃভক্ত। তাই তিনি ওপথ আর মাড়ালেন না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অভিমান, শিল্পী মনের আকুতি, গুমরে গুমরে ফিরতো। অনেক সময় অভিমানে তুলি ধরতেন না আবার মনের আকুতি থেকেই তুলিতে ছোঁপছাপ দিতেন। আম্মার স্কেচ আঁকতেন। আমাদের মজার মজার ছবি এঁকে দিতেন। তখন তো ছোট ছিলাম বুঝতে পারিনি তাঁর মনের অব্যক্ত কষ্ট। রক্ত কথা বলে। আব্বা আমার গান নিয়ে পড়লেন, আর আমার মন চলে গেল রংতুলিতে! পয়লা পয়লা আব্বা খেয়াল করেননি। পরে যখন নিজেরা কঠিন সিদ্ধান্তে আসলেন যে আমাকে গানই শেখাবেন তখন আব্বা আমাকে তুলি ধরতে দিতেন না। আব্বা বলতেন দুই নৌকায় পা দিয়ে জীবনে গন্তব্যে পৌছনো যায়না। তবুও আব্বা আমাকে রংতুলি থেকে নিরস্ত করতে পারতেন না। কখনো কখনো হয়তো আব্বার মায়া লাগতো। রংতুলি ধরে আব্বা রং মেখে দেখাতেন এটা গভীর কালো, এটা আনন্দের কালো, এটা ভয়ংকর একলা কালো। এ ছাইরং ডুবে যাওয়ার, এ ছাইরং ভেসে বেড়ানোর এ ছাই নিমগ্নতার। এ সাদা উজ্জীবিত, এ সাদা ভীষণ একলা, এ সাদা মিথ্যাচার, এ সাদা অনন্তকালের! নীলের প্রতি আব্বার খুব ভালবাসা ছিল। সব ছবিতেই নীলের টান। আম্মা কি বুঝতেন কে জানে, বলতেন বাচ্চাটাকে ছবি আঁকতে দেবে না ভালো কথা কিন্তু তুমি এতো গভীর কথা বলে বলে ভয় পাইয়ে দিচ্ছো, এটা ঠিক না। প্রাপ্ত বয়সে আমি আমার গানের হোমওয়ার্ক গুলো করে তারপর তুলি ধরেছি। তখন আব্বা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। মা বললেন মাগো, তোমার আব্বা চাইতেন গান নিয়ে তুমি একটা গন্তব্যে পৌঁছে যাও। কতদূর গিয়েছ জানিনা তবে চেষ্টা তো করেছো। আজ আমি তোমার বাবার সব রংতুলি দিলাম, তুমি তুলিতে রং ভরাও কাগজে মাখো, আমি মা আছি সঙ্গে। এই বয়সে এসে আমি দেখি আমার গান গুলি একবার ছবি হয় ছবিগুলো একবার সুর হয়, সুর গুলো অবশেষে কান্নার হয়, কান্নার দুটি ডানা গজায়, শেষে প্রজাপতি হয়ে আমার সব কল্পনার রং সুর নিয়ে আকাশে মিলিয়ে যায়। খুব আব্বাকে মনে হয়। আমার জীবনসঙ্গী বলেন এসো ওঠো, ছবি আঁকো, তুমি সব পারো। তোমার সবকিছুর মুগ্ধ পাঠক দর্শক শ্রোতা আমি! এবার আমি প্রেমে ভালবাসায় মাখামাখি করে জেগে উঠি। রংতুলিতে রং মাখাই! কিন্তু উজ্জীবিত সাদা, একাকী সাদা, প্রেমময় সাদা সবকিছু ছাপিয়ে আমার চোখে ভাসে কাফনের নীলাভ সাদা, সেই সাদা এতো বিষণ্ণ! আব্বা আমাকে কখনোই এ সাদার ব্যখ্যা দেননি। আমি কাফনের সাদায়াত পেচিয়ে যাই, ডুবে যাই। কান্নায় সব সাদা ভেসে যায়।

 ছবি : লেখক