নারী মানেই আনাড়ী না

শামীম আজাদ

যখন আবহাওয়া পাগল হয়ে ওঠে, বাজ পড়ে, বৃষ্টি ঝরা থামেনা, বান আসে অথবা খরা হয়। তখন পৃথিবীর অন্য কোথাও হয়তো অগ্নুৎপাত বা সুনামী হচ্ছে, লু হাওয়া বইছে, সমুদ্র হয়ে উঠেছে মহাশয়তান। বুঝি তা যেখানেই হোক কারণতো আছে। সব কিছুই কোন না কোন কারনেই হচ্ছে। এর যে কোন একটা হবার আগে তার একটা পূর্ব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যা কিনা সৃষ্ট হয়েছে আরো আগের কোন এক কারনে। তো আঁতিপাতি করে খুঁজলে এসব বিশাল বিশাল ব্যাপার গুলোর পেছনের প্রকৃতিক কারণ পেলেও জানি এর বৈজ্ঞানিক কারণও আছে। তবে তার জন্য মানুষ ঈশ্বরকেই দায়ী করে। আর যথসাধ্য চেষ্টা করে তার ধাক্কাটা কমাবার।বান আসবে আশংকা হলে মাচা বাঁধে , মূল্যবান জিনিষগুলো গায়ে বেঁধে নেয়। আর ঈশ্বরকে শাপাশাপান্ত করে হয় মরে না হয় বাঁচে।এই প্রাকৃতিক বা ঈশ্বর প্রদত্ত শাস্তিগুলো সবার ভাগেই সমান ভাবে পড়ে। নারী পুরুষ বেছে পড়ে না।

আবার সূর্য, জল , হাওয়া, পাথর ও পানিতে সবারই সমান অধিকার। কিন্তু তারই ব্যত্যয় ঘটে যখন কোন মানুষ অন্য সমান মাপের মানুষের কাছে ঈশ্বর হয়ে একটি ছাকনী নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। সেই ছাকনীতে সে কিছু রেখে কিছুটা খেয়ে বাকি কিছুটা নারীর জন্য বরাদ্দ করে। সে হচ্ছে নর।

এখানেই কথা, তাদের কথা যারা মানুষ এবং পুরুষ। তারা ঈশ্বর ঈশ্বর রাজনীতি করে। করে নারীর উপরে বাজ বৃষ্টি বান খরা আনে আর দায়টা দিয়ে দেয় ঈশ্বরের উপর। গ্রন্থের উপর। ব্যাতিক্রম বাদ দিয়ে দেখা যায় পুরুষগন নারীর জন্য নিজেরাই ছোট ছোট ঈশ্বর হয়ে যায়। সংসারে তারা প্রধান মন্ত্রী হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট হয়ে যায়। অর্থমন্ত্রী হয়ে যায়। হয়ে যায় পীর পয়গম্বর। কারণটা এই- কে হায় নিজের নির্বুদ্ধিতা, অক্ষমতা কিংবা অসহায়ত্ব জানাতে চায়? কে নিজেকে শক্তিহীন স্বীকার করবে বলুন? সত্যি চেহারা দেখানো তাদের দ্বারা সম্ভবো হয় না। সামাজিক চাপে আমরাই তাদের অমন করে তুলেছি। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে তারাও মানুষ। তাদের ও ভয়ভীতি, ক্ষমতা একজন নারীরই সমান। পুরুষ মানেই বুদ্ধিমান, শক্তিময়, সাহসী, যোদ্ধা না। ওরা নারীর সমানই বুদ্ধিমান, সাহসী ও যোদ্ধা। তুলনা মূলকভাবে তাদের দেহগত শক্তি নারীর চেয়ে কিছু বেশি। তো নারীরওতো কিছু ব্যপার ও ক্ষমতা পুরুষের চেয়ে বেশি। তাহলেই তো কাটাকাটি। সমান সমান। নারীর যে টিকে থাকার ক্ষমতা, জন্মদানের ক্ষমতা আছে, দেহ থেকে সন্তানের আহারের উপায় আছে তাতো পুরুষের নেই! না থাকুক এর কিছু ওর। এটাতো রিলে রেস না। এরা পরস্পরের সম্পূরক হবে এবং নিজেদের সীমাবদ্ধতা অন্যকে দিয়ে পূর্ণ করেই চলবে সেটাই কাম্য।

কিন্তু সেখানে নর নিজের সুবিধার্থে ঈশ্বরকে কাটিয়া ছাটিয়া বাটিয়া একজন বর্ণবাদী সেক্সিস্ট করিয়া তুলিয়াছে। এসব তারই নাকি বিধান! হা হা … হাসা ছাড়াতো উপায় দেখিনা। এক মানুষ হইতে আরেক মানুষের ব্যবধান তৈরী করলো নিজেরা আর ঈশ্বরকে দায়ী করে বুদ্ধিমানের কাজটি করলো। এবং এতেই তাদের মোক্ষ হচ্ছে দেখে অনুন্নত বিশ্বে বিদ্যার অভাবে তাই করেই চলেছে। আর এদিকে মেয়েরা একের পর এক যাহা যাহা কঠিন কাজ বলে, পুরুষের কাজ বলে পরিচিত তা- যেমন এভারেস্টে বেয়ে ওঠা, প্লেন চালানোটা-, মাটি কাটা, ইট ভাঙা, শুটিং করা, সবই প্রমান করে দিতেই থাকলো যে কোনভাবেই তারা কমতো না বরং বেশী শক্তিময়ী। কারণ ছেলেরা এসব কাজ যখন করে তাদের একজন ‘বউ’ থাকে বা কন্যা বা ভাবী থাকে বা মা থাকে ঘর সামলানোর জন্য, পাতে গরম খাবার তুলে দেবার জন্য, ঘরের কাজের জন্য, ও সন্তানদের বমি মোছানোর জন্য। মেয়েদেরতো কোন ‘বউ’ নেই। ভাই বাবা থাকলেও তারতো পুরুষ। আমাদের দেশে তারাতো ‘মেয়েদের কাজ’ করবেনারে ভাই! সুতরাং এ যুগের নারীকে মেয়েদের এবং ছেলেদের উভয়েরই কাজ করতে হচ্ছে। পারছেও। এ কোন ব্যতিক্রম নয়। এ ‘নিয়ম’। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে অভ্যাসে পরিবারে সব চেয়ে কম খেয়ে, কম সময় ঘুমিয়ে তারা সবার চেয়ে বেশি দিতে পারছে। আর তাতে পুরুষের সকল ক্ষমতা উবে যেতে যেতে গিয়ে তা এসে চোয়ালে এসে ঠেকেছে। যতবড় বুর্বক ত্ত বেশি চোয়ালের চেলা। ব্যতিক্রম আছে। আর ব্যতিক্রমই যা স্বাভাবিক বলে ঘটিয়ে যাচ্ছে তাকে আলাদা করে তোলে। রাখে তার সুষ্পষ্ট প্রমাণ । যে পুরুষ সমতা মানে সংবেদনশীল হয় তাকে বলে অপুরুষ, মেয়েদের মত, বোকা ,স্ত্রৈণ। নরম সরম মানবিক ছেলেটিকে বলে, ও নারীর মত ওকে চুরি পরাও! কেন ভাই পুরুষ, মানবিক গুণধারী কি কেবল মেয়েরাই?

যাহোক এবার সাঁঝের আগে একবার পড়ুন নারীদের নিয়ে ক্ষুদ্রমনা কথা বলেছেন কোন ঈশ্বর? তারা কিন্তু কোন নারী না। দৈবিক বা বৈদিক না সবাই পরাক্রমশালী চোয়াল সর্বস্ব পুরুষ। এন্তার উদাহরণ আছে। সব দিচ্ছি না। এ শোনা কথাও হতে পারে। তাই আমাকে বিশ্বাস করবেন না। অনুগ্রহ করে নিজেরাই সার্চ করুন গুগুলে বা লাইব্রেরীতে।

আমি শুনেছি লিও টলষ্টয় বলেছেন- ‘নারী সমাজ জীবনে এক অনিবার্য নিরানন্দের উৎস। মেয়েদের একটি সুবিধা হিসেবেই গ্রহণ করা উচিত। তাই যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। ‘ নেপোলিয়ানের কথা ছিল নাকি , ‘মেয়েরা আমাদের দাসী হবে এটাই প্রকৃতির নিয়ম, মেয়েরা আমাদের সম্পত্তি গাছের ফল যেমন বাগানের মালিকের সম্পত্তি । হায় হায়! আর আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট নাকি বলে গেছেন, কোনো মেয়ে যখন ভাবে তখন সে অশুভ জিনিষই ভাবে। ‘ আমি এ নিয়ে বেনিফিট অব ডাউট রাখতে চাই। এসব ‘গ্রেট ম্যান’রা এসব বলতে পারেন না নিশ্চয়ই মেয়েদের ষ্রযন্ত্র! আর না হলে তা এ হচ্ছে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার রাজনীতি।এ হচ্ছে বিদ্যাবুদ্ধি ও সহিংশতা্র সংশ্লেষ। ক্ষুদ্র ও অশক্ত পুরুষের হাতিয়ার।

আর তাই তারা গ্রেট ওম্যান খণার জিহব্বা কেটে নেয়। রোকেয়া সাখাওয়াতের বই থেকে তাদের জন্য অস্বস্তিকর বানী মুছে দেয়। বেশী বুদ্ধিমান মেয়েটি মুখ খুললে তাকে পেত্নী আখ্যা দেয়। মেধাবী মেয়েটিকে বাঁধে পুরুষের মত বলে। আচ্ছা পুরুষের যা হলে ভালো তা কি করে মেয়েদের জন্য খারাপ হতে পারে?

এমনকি এধরণের নেতিবাচক ধারণার সামান্য পরিবর্তন ঘটলেই তা রোধ করার রাজনীতি শুরু হয়ে যায়। বিশ্বব্যপী এ কূটনীতির কারণেই এখনো এক প্রুষের ব্যর্থতা ও তার একক দূর্বলতা চিহ্নিত হচ্ছে – তারই নিজস্ব না পারা হিসেবে আর নারীর ব্যাপারে দায়ী হচ্ছে পুরো নারী জাতি। ওদিকে আবার সফলতায় সব পুরুষকে সিক্ত করে তুললেও নারীর অর্জনকে দেখছে তারা ব্যতিক্রম হিসেবে। বলছে এভাবেই বিধাতা বেঁধে দিয়েছে। এ কোন বিধাতা? কেউ কি দেখেছে অন্যায় বিধানকারী বিধাতা এমন? আসলে এ হচ্ছে ঘরের বিধাতা। আর সে সব দায় তুলে দিচ্ছে অদৃশ্য ও বৈদিক- দৈবিকের হাতে। সে কোন দায় নেবে না। তাতে পৃথিবীর বস্তুগত, বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদের উপর অযোগ্য হলেও নিয়ন্ত্রনটা বলবৎ থাকে আর অসম মানদন্ডে নারী ও পুরূষকে বিচার করতেই থাকবে… করতেই থাকবে।

তাহলে যারা তা করছেন তারা কি জানেন না বা বোঝেন না বা যে তারা তা অন্যায় করছেন! এবং অন্যায় সংঘটিত হচ্ছে এমনকি তার নিজ কন্যা ও মাতার সঙ্গে ! এখানে স্ত্রীর কথা বাদ দিলাম- সে সারাজীবণ পর। সম্পত্তির হিস্যাতে তার কথা ভাবনায়ই থাকে না। বাকি দু সম্পর্কেই যা একটু ঝাঁকি। কিন্তু বৃহত্তর ব্রাদার হুডের কাছে সে প্রেম ও পরাজিত হয়ে যায়।

ছবি: গুগল