পলিমাটি হতে চাই

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

কনকচাঁপা ওস্তাদজী জনাব বশীর আহমেদ সাহেবের কাছে যখন গান শেখা শুরু করেছিলাম তখন আমার বয়স সাকুল্যে সাত কি আট বছর। তার বিশালতা তখন ওই বয়সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারিনি। তবে আব্বা যেভাবে ওনার সামনে কুঁচকে যেতেন তাতে বুঝতাম আমি হিমালয় এর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ওস্তাদজীর ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন নায়ক রহমান সাহেব। উনি মাঝেমধ্যে আমাদের গান শেখানোর সময় আসতেন। ওস্তাদজী একদিন বলছেন রহমান, কাদা পেয়েছি কাদা! উনি অবাক, কিসের কাদা? ওস্তাদজী আমাকে দেখালেন, আরও কি কি যেন বললেন। আব্বা খুবই আপ্লুত, আনন্দিত । বাসায় এসে আম্মাকে খুলে বলছিলেন, বুঝলে মোমেনা, নায়ক রহমানকে ওস্তাদজী কি বলেছেন জানো? বলেছেন

ওস্তাদজীর কাছে গানে করছেন লেখক

তোমার মেয়ে নাকি কাদা, একেবারে পলিমাটি। আম্মা অবাক। কেন? আমার কন্যা পলিমাটি কেন? আমরা গ্রামের দিকে থাকি বলে? আব্বা হাসেন তারপর আম্মাকে ব্যপারটার আসল ব্যাখ্যা বুঝিয়ে বলেন। আম্মাও বোঝেন, কিন্তু আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়নি বয়সের কারণে। তবে আমি কল্পনা করেছি আমি কাদা মাটি। থকথকে নরম ভেজা, আর আমার ভেতর মাগুর শিং খেলা করছে, দু একটি ঢোড়া সাপ ও আছে হয়তো! এমা!!!! হাহাহাহাহা।এরপর কঠিন অনুশীলন অনুশাসন কঠিন সাধনা সব কিছুর ভেতর জড়িত হয়ে যেতে হলো। এরপর আমি কাদা নাকি আগুন নাকি পানি নাকি বাতাস এগুলো ভাবার আমার সময়ই হয়নি। সাধনা সাধনা সাধনা এই ছিল আমার জীবনের ব্রত। আমি গানের গান আমার এই বটমলাইনেই আমি খাই ঘুমাই হাঁটি হাসি কাঁদি। আর কিছু নিয়ে ভাবার কোনও অবকাশ, অধিকার কিছুই আমার ছিল না। বাবার বাড়িও না স্বামীর বাড়িতেও না। শুধু গান আর গান। ওস্তাদজী বলেছেন দম নাও, নিলাম। পিঠ সোজা করে বস, বসলাম। নাভি থেকে দম নাও, তাও চেষ্টা করলাম। কিন্তু যখনই বলেন আত্মা হালকা করো, আমি আর তা পারিনা। উনি বলেন সপাট তান কর করলাম, কিন্তু যেই বলেন কাদামাটি হও, আমি পারিনা, আমি হেসে উঠি, কল্পনায় শিং মাগুর আমার ভেতরে কিলবিল করে দুয়েকটা সাপ সহ! ওস্তাদজী রেগে গিয়ে ধমক দেন! আমি কেঁদে ফেলি। আম্মা বলেন তোমরা মেয়েটাকে বেশী অত্যাচার করছো। আব্বা বলেন শোনো, মানুষ যতটুকু ভারনিতে পারেন ঠিক অতটুকুন ভারই চাপান। যাই হোক, আমি বুঝে যাই এই বোঝা না বোঝা আমার কাজ না আমার কাজ গান গাওয়া।অনেক দিন পার হয়েছে, আমি মাঝ বয়স পার করছি। অনেক গান গেয়ে ফেলেছি। অনেক পথ হেঁটেছি।

আমার মা-বাবা

আমার জীবনের দুই চাবিকাঠি আব্বা, ওস্তাদজী ওস্তাদমা কে পর পর হারিয়েছি। এখনো নিজেকে কাদামাটি ভাবার জন্য কোন পথ খুঁজে পাইনা পাইনা কোন কুল কিনারা। ক’মাস আগের কথা। জর্জিয়ায় অনুষ্ঠান করে নিউজার্সি এয়ারপোর্ট এ নেমেছি। নিউইয়র্কে ফিরবো। আয়োজকদের একজন এয়ারপোর্ট এ নিতে এসেছেন। গাড়িতে উঠে বসেছি। মনটা খুব তরল হয়ে আছে কি কারনে। গাড়ি চলছে। খুব দ্রুত আশেপাশের ছবি বদলে যাচ্ছে। স্ট্যাচু অফ লিবার্টি চোখের সামনে বই বুকে করে লাইট হাতে দাঁড়িয়ে। গাড়িতে গান বাজছে। একসময় বেজে উঠল যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে জীবনে অমর হয়ে রয়। খুব অস্থির লাগছিল, গান গুলোর প্রতি কি সঠিক বিচার করেছি? যা গেয়েছি সারাজীবন? গাড়িতে আয়োজকদের আরও একজন ছিলেন। অনেক জ্ঞানগর্ভ কথা হচ্ছিল তাদের মধ্যে আমার গান নিয়ে। আমি লজ্জা পাচ্ছিলাম। তাদের একজন বললেন আপা আপনি লজ্জা পেলে বিনয় করে এভাবেই বলবেন। কিন্তু আমরা জানি আপনার গানের প্রতি আপনি শতভাগ সঠিক বিচার করতে পেরেছেন। এখনকার গান গুলো ব্লা ব্লা ব্লা। আমি বললাম বাদ দেন। লোকটি বললেন একটা কথা আমাকে বলতেই হবে। আপনার কন্ঠ কি জানেন? আপনার কন্ঠ আপনার গায়কী আপনার উপস্থিতি হল কাদা! আমি চমকে উঠে বললাম, মানে? উনি বললেন নরম ঘন পলি মাটি দেখেছেন? তাতে হাত ঢুকালে হাত চুবালে খুব নিবিড় ভাবে সেই কাদা হাতে খুব কঠিন ভাবে মেখে যায়। তাকে ছাড়ানো যায়না। আপনার গান হল তাই। কাদামাটির মত তা লেপটে মেখে যায়, আপনার গানকে মন থেকে সরানো যায়না। সোজা কথা আপনি আমাদের পলিমাটি! আমি পেছনে বসে নিরবে কেঁদে ফেললাম। কেঁদে কেঁদেই শ্রষ্টা কে বলছিলাম আল্লাহ, ও আল্লাহ! তুমি আমার বাবা আর ওস্তাদজী কে জানিয়ে দাও আমি কাদা হয়ে গেছি। তাদের হুকুম মত সারাজীবনের কঠোর সাধনায় আজ আমি কাদামাটি পলিমাটি হয়ে গেছি।আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি: লেখক