গুলজারিশ…

লিখেছেন অনন্য সব কবিতা, গজল আর গান। পরিচালনা করেছেন সিনেমা, লিখেছেন চিত্রনাট্য ও সংলাপ-তিনি এক অনন্য মানুষ গুলজার। জন্মেছিলেন তৎকালীন বৃটিশ শাসিত ভারতের পাকিস্তান অংশে ১৯৩৪ সালের ১৮ আগস্ট। পুরো নাম সম্পুরন সিং কালরা। ভাগ্যের অন্বেষণে চলে এসেছিলেন মুম্বাই। সেখানেই শুরু হয় তাঁর ভিন্ন যাত্রা। সেই সূচনা পর্বে চলচ্চিত্র পরিচালক বিমল রায়ের কথা তিনি নিজের বইতে উল্লেখ করেছেন গভীর শ্রদ্ধায়। বিমল রায়কে গুলজার তাঁর গুরু বলে উল্লেখ করেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘পান্তাভাত’ বইতে। লিখেছেন, বিমল রায়ের ছায়ায় থেকেই তাঁর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বোধ সমৃদ্ধ হয়েছিলো।  তিনি রাহু দেব বর্মনের বন্ধুত্বের কথাও উল্লেখ করেছেন। এই সূচনা-পথ ধরেই  তাঁর জীবন যেন হয়ে উঠে ইতিহাসের অংশ।
কয়েকদিন আগে গুলজার এসেছিলেন কলকাতায় তাঁরই লেখা দুটো বই প্রকাশনা উৎসবে।বই দুটো হলো ‘পান্তাভাতে’ ও ‘প্লুটো’। অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন রিনি। দিনরাত্রি মিলিয়ে বেশ অনেকটা সময় তার কেটেছে গুলজারের সঙ্গে। সেই অভিজ্ঞতাটাই লিখতে চায় রিনি প্রাণের বাংলার জন্য। প্রাণের বাংলাও সাগ্রহে রাজি সে লেখা ছাপতে।
পাঠকদের জন্য রিনি বিশ্বাসের সেই রচনাটি নিয়ে এবার আমাদের প্রচ্ছদ আয়োজন। এখানে রিনি বিশ্বাসের ‘গুলজারিশ’ অথবা বাংলায় বললে গুলজারময় সময়ের সেই অভিজ্ঞতা।

আমাকে দেয়া বইয়ে অটোগ্রাফ

‘হ্যাঁ, বলো অপু’
‘কথা বলা যাবে এখন?’
‘বলো না’
‘গুলজারজীর দুটো বাংলা বই আমরা বের করছি’
‘তাই? বাহ্ দারুণ ব্যাপার তো!’
অল্প হেসে অপু বলে, ‘হ্যাঁ মানে…
২৬ তারিখ, নন্দনে হবে অনুষ্ঠানটা। শঙ্খ ঘোষ আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বই প্রকাশ করবেন। তারপর শান্তনু মৈত্র আর শ্রীজাতর সঙ্গে গুলজারজীর কথোপকথন’।
‘আহা! সে তো অসাধারণ হবে! কি কি বই বেরোবে, অপু?’
‘পান্তাভাতে, আর প্লুটো। পান্তাভাতে ধারাবাহিকভাবে আনন্দবাজার পত্রিকায় বেরোতো্। গুলজারজীর সঙ্গে নানা বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের সম্পর্ক নিয়ে লেখা। কিভাবে তাঁদের দেখেছেন গুলজারজী, কেমন ছিল তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সেসব’।
‘ইস্! পড়িনি গো ধারাবাহিক লেখাটা! পান্তাভাতে পড়বো! ‘
‘আর প্লুটো হল ওঁর কবিতার অনুবাদ’।
‘সেও তো দারুণ ব্যাপার! নামটাও ভারী ইন্টেরেস্টিং!’
‘বইয়ের ভূমিকাতে লিখেছেন কেন এই নাম’।
ফোনের এপ্রান্তে আমি তখনও জানিনা এরপরে কি শুনতে চলেছি।
অপু বললো, ‘তোমাকে ওই অনুষ্ঠানে অ্যাঙ্করিং করতে হবে’
পড়ে যাই আর কি, বলে কি অপু! গুলজারজী কলকাতায় আসবেন। তাঁর দুটো বাংলা বই প্রকাশ হবে। উনি ছাড়াও সেখানে থাকবেন শঙ্খ ঘোষ-সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মত ব্যক্তিত্ব। সেখানে আমি অ্যাঙ্করিং করবো! গলা দিয়ে কি তখন কোন শব্দ বেরোবে আদৌ!!!
আমতা আমতা করে বলি, ‘আমি তো বড়ই ভেতো বাঙালী, অপু! অনুষ্ঠানটিতে নিশ্চয় কেবল বাংলায় কথা বললে চলবেনা! আমি কি পারবো???’
অপু উড়িয়ে দেয় আমার ছেঁদো যুক্তি, ‘অনুষ্ঠানটা পুরোপুরো বাঙালী; তাই তুমিই থাকবে।’
ফোনটা রেখে ঠিক করে উঠতে পারিনা, কি করবো!!! এটা কি সত্যি সত্যিই হতে চলেছে?! যে মঞ্চে থাকবেন স্বয়ং গুলজার। সেখানে এক কোণে আমিও দাঁড়ানোর সুযোগ পাবো! উফ্! এ তো স্বপ্নপূরণ!
বহুদিন যে সব শব্দ নিয়ে একা একা নাড়াচাড়া করেছি, যেসব নরম আদুরে শব্দবন্ধ আমার ‘একলা-একা’র সময়কে সুন্দর করেছে, তা বেশিরভাগই এই মানুষটির দেওয়া। তাঁর সঙ্গে চেনাশোনা তো সেই কবে থেকে! সেই একতরফা পরিচয়ের সবটুকু জুড়েই আছে কেবল মুগ্ধতা। তিনি বহুদিন আগেই অনায়াসে সম্ভ্রম আদায় করে নিয়েছেন। ঠিক কবে থেকে তাঁর ভক্ত হয়েছি, মনে নেই। তবে তাঁর লেখা গান, তাঁর তৈরি সিনেমা, তাঁর কবিতা-শায়েরী, অডিয়ো অ্যালবামে তাঁর কন্ঠস্বর, ইউটিউবে তাঁর দেওয়া কোন সাক্ষাৎকারের টুকরো, তাঁর শ্বেতশুভ্র ব্যক্তিত্ব, সমস্তটাই অসম্ভব সম্মোহক। সমস্তটার মধ্যেই কেমন যেন শুচিতা মাখামাখি হয়ে থাকে…।
তাঁর লেখার ভাষায় সে লেখা পড়ার যোগ্যতা আমার আজও হয়নি। বরাবরই দুধের স্বাদ ঘোলেই মিটিয়েছি। পড়েছিও যে অনেক লেখা, মোটেই তা নয়। চিরকালই আমি মূর্খের সারিতে থাকি। তবে কেন যেন মনে হয়, যাঁরা বিশাল মাপের-মানের শিল্পী-সাহিত্যিক-স্রষ্টা হন, তাঁদের ভক্ত হতে গেলে সেই ‘স-ব’ জানার তেমন প্রয়োজন পড়েনা। হতেই পারে এ নেহাতই গন্ড মূর্খের অজুহাত। এসব বাদ দিয়ে মুগ্ধতার জবানবন্দীতে ফিরে গিয়ে বলি, এ অধম গুলজারজীর একনিষ্ঠ ভক্তদের একজন…।

আমাকে দেয়া বইয়ে অটোগ্রাফ

এহেন ভক্তের স্বপ্নপূরণ ঘটলো এই সেদিন..
প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল অবশ্য তারও ক’দিন আগে্। এক বৃষ্টির সকালে অপুর কাছ থেকে পেলাম ‘পান্তাভাতে’ আর ‘প্লুটো’; মলাট তখনও ছাপা হয়নি। সাদা, খানিকটা গুলজারজীর সফেদ পোশাকের মত। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে বই খুলেই নাক ডোবালাম, আহ্! অপুর ফিক্ করে হাসি চোখ এড়ালোনা।
সেদিনই মোটামুটি একটা খসড়া তৈরি হল, কি কি হতে চলেছে অনুষ্ঠানে আর আমার কি কি করণীয়। আমি যারপরনাই খুশী, তেমন বিশেষ কাজ নেই আমার, কিন্তু প্রাপ্তির ভাগে যে কিচ্ছু কম পড়বেনা, তা নিয়ে আমি ২০০ শতাংশ নিশ্চিত!
অনুষ্ঠান শনিবার। সন্ধ্যে ছ’টায় শুরু। পাঁচটায় নন্দন পৌঁছনোর কথা।ভেতরে একটা অস্থিরতা। একমুহূর্তও কেন যেন স্বস্তি নেই! উত্তেজনায় হাত পা ঘেমে যাচ্ছে। কোনরকমে কিছু একটা রান্না করতে পারলেই গেরস্থালির কাজে ছুটি মিলবে। পুত্রকে পরীক্ষার পড়া করতে দিয়ে রান্নাঘরে হাত চালাচ্ছি।
অধিকাংশ দিন যা ঘটে থাকে্।মোবাইল ফোন অন্য কোথাও নিজের মত বাজতে বাজতে চুপ করে যায়। আমি শুনতেও পাইনা। পরে রিং ব্যাক করি। সেদিনও সেই দশা। অপুর ৯ টা মিসড্ কল। কি হলো রে বাবা! ফোনের ওপ্রান্তে অপুর করুণ গলা-‘উনি চাইছেন তোমার সঙ্গে একবার কথা বলতে… একবার হায়াতে আসবে? গাড়ি যাচ্ছে, ৩টে নাগাদ চলে এসো’…
আমার মাথায় হাত। ছেলেকে খালি বাড়িতে রেখে কি করে যাই!!! বরকে ফোন। জরুরি তলব। এক্ষুণি এসো। আমি ‘গুলজারজী’র সঙ্গে দেখা করতে হায়াতে যাবো’। ছেলে পাশে বলেই চলেছে ‘বাপি না আসতে পারলে, আমি তোমার সঙ্গেই চলে যাবোখন’..। সেটা আদৌ ঠিক হবে কিনা, বুঝতে না পেরে হ্যাঁ-না-এর মাঝামাঝি ঘাড় নাড়ি। হাতে ঘন্টাখানেক সময়।
কাজ শেষ করে, তৈরি হয়ে কিভাবে যে হায়াতে গিয়ে পৌঁছলাম। তারপর রুম নম্বর জেনে কিভাবে যে ৭৩০ নম্বর ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, তা আমিই জানি। বুকের ধুকপুক বাড়তে বাড়তে ড্রামের শব্দ করছে। মনে হচ্ছে, পা দুটোয় কোন জোর অবশিষ্ট নেই। সামান্য নার্ভাসনেসেও হাত পায়ের তেলো চুপচুপে হয়ে ঘেমে ওঠে। সেদিন কি হয়েছিল , তা সহজেই অনুমেয়। এত সব সত্ত্বেও আমি সেই ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারলাম। আমার সঙ্গে সঙ্গেই ঢুকলো দুপুরের খাবার।
ঘরে তখন গুলজারজী, শান্তনু মৈত্র (যিনি তার একটু পরেই বহুদিনের চেনা বন্ধু ‘শান্তনুদা হয়ে যাবেন) বড্ড প্রিয় কবিবন্ধু-শ্রীজাত (বিখ্যাত মানুষদের বন্ধু বললে এক আলাদা ভালোলাগা তৈরি হয়, হলোই বা একতরফা বন্ধুত্ব) , আরেক শান্তনুদা -যিনি গুলজারজীর বইয়ের প্রকাশনার সঙ্গে অনেকাংশে জড়িয়ে থাকেন। আর দে’জ পাবলিশিং-এর নবীন কর্ণধার-অপু। প্রেসিডেন্সিয়াল সুইটের ডাইনিং টেবিলে খেতে বসার তোড়জোড়ের মাঝেই আমি তাঁকে প্রথম দেখলাম। সেই শান্ত-সৌম্য-স্নিগ্ধ-শ্বেতশুভ্র গুলজারজী, যাঁকে এতদিন দূর থেকে দেখেছি। তিনি আমার সামনে। অপু আমার পরিচয় দেওয়া মাত্রই ঢিপ করে পা ছুঁয়ে তাঁকে প্রণাম করলাম। দুহাত জোড় করে প্রতি নমস্কার জানালেন তিনি। বললেন ‘জিতে রহো বেটা’…
বললাম, ‘অপু, আমি বরং অপেক্ষা করি, লাঞ্চের পরে কথা হবে’..
রাজী হলেন না গুলজারজী, ‘আপ ভি আইয়ে হামারে সাথ, কুছ তো খালিজিয়ে’।
হই হই করে শান্তনুদা, শ্রীজাতও ডাক দিলো,
‘ বসে পড়ো রিনি’..
এমন সুযোগ এজীবনে আর আসবে কিনা সন্দেহ। পেট ভরা থাকা সত্ত্বেও বসে গেলাম ওঁদের সঙ্গে..
ভাত, সরষের তেল দিয়ে মাখা আলু সেদ্ধ, ডিম সেদ্ধ, ডাল, আলু পোস্ত, সরষে ইলিশ সাজানো সামনে। গুলজারজী কাঁচালঙ্কার খোঁজ করলেন, ‘ইতনে বাঙ্গালী বৈঠে হ্যায়, স্যালাড মে সির্ফ এক হরি মির্চ কিঁউ?’
শান্তনুদা কাঁচা সরষের তেল আনতে পাঠালেন পরিবেশনের দায়িত্বে থাকা মেয়েটিকে দিয়ে।
টুকটাক গল্প সহযোগে শুরু হল মধ্যাহ্নভোজ।
গুলজারজী বলছেন তাঁর বাংলা প্রীতির কথা। বাঙালী খাবার যে তাঁর বড় ভালোবাসার তা বলে দিচ্ছে তাঁর পরিপাটি খাওয়া। সরষের তেল কতদূর থেকে আসছে তা নিয়ে হাসিঠাট্টা চলতে চলতেই আমি খাচ্ছিনা দেখে আবার বললেন কিছু অন্তত খাই যেন। ইলিশমাছ খেলাম, ওটি আমার দুর্বলতা। তবে সেদিন খেলাম বেশ হেলাফেলা করে। আসলে সেই মুহূর্তে আমি সব পার্থিব মোহ-র ঊর্ধ্বে। দুচোখ ভরে শুধু দেখছি গুলজারজীকে। শুনছি তাঁর কথা। মনে মনে ভাবছি, কত পুণ্য করলে এমন সুযোগ আসে জীবনে। শিহরিত হচ্ছি বারংবার। শেষ পাতে মিষ্টি দই, সন্দেশ এলো;
মুখে স্মিত হাসি, গুলজারজী বলে উঠলেন, ‘পোয়েট্রি কেয়া আজই পঢ়না হ্যায়?’
অপুর চোখ গোলগোল।
আবার বললেন ‘প্রোগ্র্যাম আজই হ্যায় কেয়া?!’
হো হো করে হেসে উঠলো সবাই। এমন ভরপেট খাবারের পর অনুষ্ঠানের চিন্তা কি সত্যিই করা যায়?!
‘পেট কে লিয়েই তো করতে হ্যায় সব কুছ। আব পেট তো ভর্ গ্যায়া, প্রোগ্র্যাম কা কিঁউ সোচে ফির!!!’
বসা হল প্রোগ্রাম ফ্লো নিয়ে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আসছেন না। ‘প্লুটো’ প্রকাশ করবেন সন্দীপ রায়। আগের ভাবনায় সামান্য রদবদল্। আগে পরে হয়েছে দু একটা বিষয়। শঙ্খ ঘোষ সাধারণত বলতে চাননা কিছু। অপু জানলো তিনি রাজী হয়েছেন সেদিন দু এক কথা বলতে… আর যা অদলবদল। শান্তনুদা (মৈত্র) বুঝিয়ে দিলেন সবটা।

আমি ও গুলজারজী

অপুর কাছে এরমধ্যেই অনর্গল ফোন আসছে, কার্ডের জন্য। কিভাবে কোথায় বসবেন সবাই, ভেবে সদা হাসিমুখের অপুও নার্ভাস। শ্রীজাতর কাছে শুনলাম বহু মেসেজ এসেছে অনুরোধ নিয়ে ‘একটিবার পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে চাই’…
গুলজারজী জানালেন মুম্বইতে তাঁর কাছেও ফোন গেছে কিভাবে কার্ড পাওয়া যাবে, তা জানতে চেয়ে…
কলকাতা উন্মুখ হয়ে আছে এই অনুষ্ঠানের জন্য।
কাজের কথা সেরে এবার ওঠার পালা। ৪:১৫ এ বেরোনো হবে নন্দনের উদ্দেশ্যে; ঘড়ি বলছে হাতে মিনিট কুড়ি সময় আছে। গুলজারজী অল্প বিশ্রাম নেবেন। উসখুশ্ করে শেষমেশ বলেই ফেললাম একটা ছবির কথা। গুলজারজী তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালেন। ক্যামেরাবন্দী হল আমার জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত! সবাই মিলে একটা ছবি হোক? হল। এমনও হয়, এক ফ্রেমে গুলজারজীর পাশে শ্রীজাত, শান্তনু মৈত্র আর এই অধম!
ব্যাগে করে নিয়ে গেছি ‘পান্তাভাতে আর প্লুটো’.. সইয়ের আব্দার জানাতেই লিখে দিলেন নিজের নামটি… শ্রীজাত সঙ্গে নিয়ে গেছে গোটা পাঁচেক বই্। কোনটিতে ওর নাম লিখে, কোনটিতে দূর্বা (শ্রীজাতর জীবনসঙ্গী)র নাম লিখে সই করে দিলেন, গুলজারজী..
আগের গাড়িতে গুলজারজী, সঙ্গে অপু আর শান্তনুদা।
পরের গাড়িতে শ্রীজাত, শান্তনুদা (মৈত্র) আর আমি।
নন্দন পৌঁছনোর আগেই খবর পেলাম, বিশাল লাইন সেখানে। সর্পিল সে লাইন ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। পাবলোকে সঙ্গে নিয়ে বাবাই মা এবং তাদের জামাতা সেই লাইনে দাঁড়ানো।
গাড়ি গিয়ে থামতে যতটুকু দেরি, গুলজারজীকে ঘিরে ধরলেন অগণিত ভক্ত। তাঁদের অনুরোধ করে রাস্তা ফাঁকা করা হল। ঋজু মানুষটি নন্দনে প্রবেশ করলেন। পিছু পিছু আমরা ক’জন। অনুষ্ঠান শুরুর আগে,নন্দন চারে উদ্বোধন হল গুলজারজীকে নিয়ে এক চিত্র প্রদর্শনী। হলভর্তি দর্শকের মাঝখান দিয়ে হেঁটে এলেন গুলজারজী।
অনুষ্ঠান শুরু হল। সবাই বসতে জায়গা পাননি। চাপা অসন্তোষ ভেসে আসছে ব্যালকনি থেকে। ধীরে ধীরে তা চিৎকারের রূপ নিলো। উপর থেকে শুনতে কিছু সমস্যা হচ্ছিলো। ফটোগ্রাফার বন্ধুদের জন্য দেখতেও সামান্য অসুবিধে হচ্ছে বলে জানা গেল। মনে মনে সাজিয়ে রাখা কথা ভুলে গিয়ে বারবার বলতে হল সহনশীল হবার কথা্। বলতে হল শান্ত না হলে এমন একটা সন্ধ্যে মিথ্যে হয়ে যাবে। অতিথিবরণের পর বক্তব্য রাখতে উঠে শঙ্খবাবু তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ কথা বলতে বাধ্য হলেন। মনে করিয়ে দিলেন কলকাতাকে সংস্কৃতির পীঠস্থান বলা হয়। আরো একটু সংযম বোধহয় আমরা দেখাতে পারি।
সব ভালো যার শেষ ভালো। এরপরে সকলের জন্য অপেক্ষায় ছিল শুধুই ভালো। কারণ তখন মঞ্চে ‘গুলজার’…
‘Guftgu with Gulzar’
প্রথম ভাগে ‘পান্তাভাতে’ নিয়ে আড্ডা-তারপর ‘প্লুটো’ র কবিতা পাঠ.. মঞ্চে তখন গুলজারজী ছাড়াও শ্রীজাত, সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়।
( গুলজারজীর স্মৃতিচারণ যিনি সুন্দর করে শব্দে সাজিয়েছেন। পান্তাভাতে-র নির্মাতা) এবং ‘প্লুটো’ কবিতাগুলোর অনুবাদক শেখ সদর নইম…।
পরের ভাগে মঞ্চে এলেন শান্তনু মৈত্র।
এই হল সেদিনের অনুষ্ঠানের মোটামুটি একটা বিবরণ। বাকিটুকু অনুভব, যা শব্দে ধরা আমার মত অর্বাচীনের কম্মো নয়। যাঁরা ছিলেন সেদিন নন্দনে, শুধু তাঁরাই বুঝবেন সেদিনের সন্ধ্যের বাকি সময়টুকু কি ঘটলো। বেশ কিছু কবিতা পাঠের পরেও সেদিন মনে হচ্ছিল, আরো যদি খানিক সময় পাওয়া যেত… বাদ থেকে গেল অনেক কিছুই। বলা ভালো কিছুই প্রায় ধরা গেলনা সেই সন্ধ্যেয়.. যে সন্ধ্যে ছিল আমাদের মত অনেকের জন্যই সৌভাগ্যের সন্ধ্যে। এমন কিছু শব্দের সন্ধ্যে যা একবার ছুঁয়ে গেলেও রেশ রেখে যায় আজীবন…তাই হলও… রেশ রেখে গেলেন তিনি-গুলজারজী।
প্রাপ্তির ভান্ডার পূর্ণ হতে তখনও আমার বাকি ছিল। একটু.. অনুষ্ঠানের পরে একান্ত ঘরোয়া আড্ডায় আরো একবার তাঁকে সামনে পাওয়ার সৌভাগ্য হল। এটাসেটা গল্পে বেশ কাটলো সন্ধ্যের শেষটুকু। তাঁর সঙ্গেই নৈশাহার সারলাম আমরা ক’জন। শ্রীজাত ডিনার করবেনা বলেও খাবার নিলো শেষ অবধি । শান্তনুদা গুলজারজীর সঙ্গে গল্প করার ফাঁকেই ডিনার করলেন। আমি যথারীতি খেলাম কম, দেখলাম বেশি…।

বাঁ থেকে শান্তনু মৈত্র কবি শ্রীজাত গুলজারজী ও আমি

গুলজারজী আর শান্তনুদাকে নিয়ে বেঙ্গল ক্লাব থেকে গাড়ি রওনা দিলো হায়াত রিজেন্সির দিকে…। গাড়িতে ওঠার আগে এই অধমের কাজের প্রশংসা করে গেলেন তিনি। আশীর্বাদ করে, গালে হাত দিয়ে বললেন ‘জিতে রহো বেটা’.. নিশ্বাস বন্ধ করে চেষ্টা করলাম নিজেকে বিশ্বাস করাতে যা যা ঘটলো পুরো দিনটায়, স ব সত্যি… স্বপ্ন নয়…

আরো একটা কথা না বললে এ লেখা কিছুতেই শেষ হতে পারেনা। দুপুরে বলামাত্রই ‘পান্তাভাতে’ আর ‘প্লুটো’তে সই করে দিলেন গুলজারজী। শ্রীজাত পাশে দাঁড়ানো, বললো ‘উপরের সাদা মলাটে সই করিয়ে নাও, এমন প্রচ্ছদ তো আর কারুর কাছে থাকবেনা।’ তাই তো! আবার আব্দার করলাম। প্রচ্ছদহীন ‘পান্তাভাতে’ আর ‘প্লুটো’তে এখন মহামূল্যবান প্রচ্ছদ জ্বলজ্বল করছে, যা শুধুই আমার… একে সৌভাগ্য বলবো, না প্রাপ্তি?!

শ্রীজাত, তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসা… ধন্যবাদ..আর অপু, সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো ভাই, এমন সুযোগ আমাকে দেওয়ার জন্য…।

ছবি: লেখক