সাগর পাহাড় দ্বীপে…. শেষ পর্ব

আন্জুমান রোজী,(কানাডা থেকে)

কোনো এক সকালে মেঈন আইল্যান্ড থেকে খুব ভোরে আমরা  ভ্যাঙ্কুভারের উদ্দেশ্যে  যাত্রা শুরু  করি। ভ্যাঙ্কুভার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার আরেকটি শহর। ব্যস্তসমস্ত এই শহরটিকে দেখার জন্যেই আমাদের এই যাত্রা। পথিমধ্যে অর্গানিক কফিশপ থেকে কফি নেই। চমৎকার এক কফিশপ;  যেনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা প্রতিটি কর্ণার। আলোছায়ায় ফুটে উঠেছে মোহময় এক বিমূর্ত ভাব। গরমগরম কফিহাতে সেখান থেকে ফেরীঘাট ভিলেজ বে’তে চলে যাই। দিনের শুরুতে নরম সকালের আবেশ নিয়ে ফেরীতে উঠে বসি। সুবিশাল ফেরী। সাতসকালে  মানুষের ঢল আর গাড়ির বহর দেখে মনে হলো;  এ যেনো  ভ্রমণপিয়াসীদের সমুদ্রযাত্রার প্রস্তুতি। প্রায় দু’ঘন্টার ফেরীপথ। রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। রোদের কণা জলে পড়ে মুক্তোর মতো জ্বলছে। আকাশ থেকে সমস্ত নীল ঝরে পড়ছে সমদ্রের বুকে। চারদিক সেই নীলের ছোঁয়ায় নীলাভ হয়ে উঠেছে। আমরা সবাই ফেরীর ছাদে  বসে মৃদুমন্দ বাতাসের দোল খেয়ে প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য দেখতে থাকি। দেখতে থাকি সমুদ্রের বুকে জেগে ওঠা পর্বতসমান উঁচুউঁচু সবুজ ক্যানভাস। সাগরের জলচিরে আর পাহাড়ের কোল ঘেষে জর্জিয়া উপসাগরের ওপর দিয়ে আমাদের ফেরী ছুটছে। ভ্যাঙ্কুভারের টওয়াসন ফেরীঘাটে এসে আমদের ফেরী পৌঁছে; তখন মধ্যদুপুর। সেখান থেকে বাসে করে ভ্যাঙ্কুভার ডাউনটাউনে চলে যাই। 

ভ্যাঙ্কুভার শহর ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার নিম্নমুখী অঞ্চলে অবস্থিত এবং কানাডার একটি উপকূলীয় সমুদ্র বন্দর। প্রদেশের সবচেয়ে জনবহুল শহর। ভ্যাঙ্কুভার এলাকায় জনসংখ্যা  ২৪৬৩,৪৩১ জন, যা কানাডায় তৃতীয় বৃহত্তম জনবহুল শহর। এই শহর বাসযোগ্যতায় এবং জীবনের গুণমানে শীর্ষ পাঁচটি বিশ্বব্যাপী শহরগুলির মধ্যে অন্যতম একটি এবং পরপর পাঁচ বছর ধরে   বিশ্বের বৃহত্তম সুখী শহরগুলোর শীর্ষ দশের মধ্যে প্রথম সুখী শহর হিসেবে  স্বীকৃতি পেয়েছে। ভ্যাঙ্কুভার ১৯৫৪ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অর্থাৎ  কমনওয়েলথ গেমস, বিশ্ব পুলিশ ও ফায়ার গেমস ১৯৮৯ এবং  ২০০৯ সালের আয়োজক। এছাড়াও এই শহর অনেক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও ইভেন্টের হোস্ট  হয়েছে। ২০১০ সালে শীতকালীন অলিম্পিক এবং প্যারলাইপিক্স; যা ভ্যাঙ্কুভার এবং হুইসলার শহরে অনুষ্ঠিত হয়।

ব্যস্তশহর ভ্যাঙ্কুভার। ডাউনটাউনে পৌঁছে দুপুরের খাবার খেয়ে সোজা চলে যাই ওয়াটার ফ্রন্ট স্টেশনে। মানুষের ভিড় ঠেলে আমরা সি-বাস ( বাসের মতো দেখতে, কিন্তু জলযান) করে নর্থ ভ্যাঙ্কুভার আইল্যান্ডে যাই। সেখান থেকে বাসে করে গ্রাউস মাউন্টেনের কাছে চলে যাই। যে মাউন্টেইনকে বলা হয় ‘দ্যা পিক অফ ভ্যাঙ্কুভার’, অর্থাৎ এর চূড়াতে দাঁড়ালে পুরো ভ্যাঙ্কুভার শহর দেখা যায়। গ্রাউস মাউন্টেন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উত্তর শোর পর্বতমালাগুলির একটি; যা কানাডা, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উত্তর ভ্যাঙ্কুভার জেলা পৌরসভা নামে পরিচিত।  তার চূড়া ১২০০ মিটার ( ৪,০০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত। এটি একটি আল্পাইন স্কি এলাকা। ১৮৯৪ সালে প্রথম যে হাইকার চূড়ায় উঠে রেকর্ড করে তারই নামে এই পর্বতমালার নামকরণ করা হয়। আমরা গ্রাউস মাউন্টেনের চূড়ায় উঠে যাই ক্যাবল কার দিয়ে, তবে স্থানীয়রা ক্যাবল কারকে গন্ডোলা বলে। সূর্যের ডুবন্ত অবস্থায় চূড়ায় উঠে বেশীক্ষণ সেখানে দাঁড়াতে পারিনি। চারদিক ছুটাছুটি করে এদিকসেদিক দৌড়ের উপর চোখ বুলিয়ে আবার গন্ডোলার কাছে চলে আসি। কারণ, পাহাড়ের ওপর জংলীমশার আক্রমণে সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে ছুটাছুটি করছিল। আমরাও পাগলপ্রায় হয়ে নীচে নেমে আসি। আবারও সি-বাস করে রাতে ভ্যাঙ্কুভার শহরে চলে আসি। রাতে থাকবো কোথায় এই বিড়ম্বনায় ভুগতে-ভুগতে শেষ পর্যন্ত রাত বারোটার পর ডাবল বেডের এক হোটেলে রুম পেয়ে যাই। ক্লান্তিতে গা এলিয়ে দেই রাতের কোলে। পরেরদিন ঘুম থেকে উঠে আবার  ভ্যাঙ্কুভার ডাউনটাউনে রেনডোম ঘুরাঘুরি। শুধু ভ্যাঙ্কুভার শহরের আবহ এবং ভাবগতি বুঝার জন্যেই আমাদের সেখানে যাওয়া। 

ব্যস্ততম রাস্তায় পা ফেলেফেলে ঘুরছিলাম। ভিক্টোরিয়া আইল্যান্ডের নির্জনতা ভেদ করে এখানে জনকোলাহল পরিবেশে বেশীক্ষণ থাকতে আমাদের ইচ্ছে করছিলো না। বিকেলের ফেরী ধরে মেঈন আইল্যান্ডে ফিরে আসি। ফিরেই নীনা আপার অমৃত প্রসাদ! সেই বাঙালির সাতজনমের ভাতভর্তা, ডাল সবজি আরো কতোকিছু যে রান্না করলেন! তা খেয়েখেয়ে তৃপ্তি যেনো আর ফুরায় না। জীবনচাকার অদৃশ্য ঘূর্ণনে সেই তৃপ্তির আবেশ নিয়ে আমাদের বিদায়ের ঘন্টা বেজে উঠলো। খুব সকালে মেঈন আইল্যান্ড থেকে শেষবারের মতো চলে আসি ভিক্টোরিয়া শহরে। ইচ্ছে হলো, ভিক্টোরিয়ার ডাউনটাউন দেখবো। ভিক্টোরিয়া, ব্রিটিশ কলোম্বিয়ার রাজধানী শহর। যা কানাডা প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল অতিক্রম  করে  ভ্যাঙ্কুভার আইল্যান্ডের অন্তর্গত হয়। ওয়েস্টার্ন কানাডার দক্ষিণাংশের বৃহত্তম শহর। শহরটির বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক ভবন রয়েছে. বিশেষ করে তার দুটি সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য স্থান যেমন, আইনসভা ভবন ( ১৮৯৭ সালে সমাপ্ত ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়া লেজিসলেটিভ এম্বাসেডারের বাড়ি) এবং সম্রাট হোটেল, ( ১৯০৮ সালে ওপেন করা হয়)। ‘দ্য গার্ডেন সিটি’ নামে পরিচিত ভিক্টোরিয়া একটি আকর্ষণীয় শহর এবং জনপ্রিয় ট্যুরিজম গন্তব্য; যেখানে সমৃদ্ধ প্রযুক্তি খাত রয়েছে যা তার সর্বনিম্ন রাজস্ব উৎপাদিত বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে আসে। ভিক্টোরিয়া শহর  অবসরপ্রাপ্তদের জন্য খুবই জনপ্রিয়। এলাকাটিতে শীতকালীন  বরফমুক্ত জলবায়ু বিরাজ করে।

আমরা শহরের হার্ভার ফ্রন্টে ঘোরাঘুরি করে পার্লামেন্ট ভবন হয়ে ডাউনটাউনের এক কর্ণারে সিডনি নামের জায়গাটিতে চলে যাই। সিডনী সিটিটি বেশ পরিচ্ছন্ন গোছালো। সাগরের গা-ঘেষে গড়ে ওঠা এই শহর বেশ মনোমুগ্ধকর। দুপুরে বুশার্ট গার্ডেন নামে এক বিখ্যাত গার্ডেন দেখতে যাই। যে গার্ডেনটি ভিক্টোরিয়া, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার শীর্ষ পর্যটক আকর্ষণের একটি এবং আমেরিকা টুডে, সিএনএন ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক হিসেবে এই গার্ডেন শীর্ষে অবস্থান করছে। ১৯০৬ এবং ১৯২৯এর মাঝামাঝি সময়ে বৈচিত্র্যেপূর্ণ এই গার্ডেনটি তৈরি করা হয়।  জনাব বুশার্ট  ও তার স্ত্রী এক অসাধারণ  কাজ করে গেছেন। তিনি সারা বিশ্বের অলঙ্কৃত পাখি সংগ্রহ করেন। স্টার পুকুরে রাজহাঁস রেখেছেন, কচ্ছপের জন্য পুকুর, সামনে লনে ধ্বনিত হয় ময়ূরের কেকাধ্বনি এবং সমস্ত বাগানজুড়ে রয়েছে চেনা-অচেনা অজস্র পাখি।সমুদ্রতীরবর্তী এই বাগানে মনোহর রোজ গার্ডেন আছে । জনাব বুশার্টের নাতি; আইয়ান রোস  তার ২১তম জন্মদিনে গার্ডেনটি  উপহার হি্সেবে পান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে্র পর চাকরি ছেড়ে তিনি তার পিতামহের বাগানকে আত্মনির্ভরশীল করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। বেশিরভাগ অবহেলিত বাড়ি এবং বাগানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত পরিদর্শক গন্তব্যস্থলে পরিণত করেছেন। ৫০ বছরের মতো সময় তিনি সম্পূর্ণরূপে বুশার্ট গার্ডেনের উন্নয়ন ও বাগান সাজানোর কাজে নিয়োজিত ছিলেন।  

রঙ বেরঙের বর্নীল বুশার্ট গার্ডেন দেখে  বিকেলে্র দিকে সূর্য ঢোলে পড়ার সময় সোজা চলে যাই ভিক্টোরিয়া এয়ারপোর্টে। নীনা আপা আমাদের সারাদিন ড্রাইভ করে সমস্ত শহর ঘুরিয়েঘুরিয়ে নিয়ে আসেন। অতঃপর ঘনিয়ে আসে বিদায়ক্ষণ। ছোট্ট এক দীর্ঘনিঃশ্বাস , যেনো কোনোকিছুই দেখা হয়নি। সময় কতো দ্রুত চলে গেলো! ভিক্টোরিয়া আইল্যান্ডের ভালোলাগা আর নীনা আপার ভালোবাসা নিয়ে আমরা ফিরে আসি আমাদের গন্তব্যস্থলে।

ছবি: লেখক