বৃষ্টি ভেজা মিষ্টি বুড়ি

আশিকুজ্জামান টুলু

বেশ ক’বছর আগের কথা । ক্যানাডার গ্রেটার টরোণ্টো এরিয়াতে রিয়েল এস্টেট ব্যাবসা কেবল শুরু করেছি । ভালো লাগছে নতুন প্রফেশনটা । ঘুরে ঘুরে ডোর নক করি যদি কেউ বাড়ি বিক্রি করতে চায়, জানার জন্য । এভাবেই সেলার ক্লায়েন্ট জোগাড় করতে হয় । অনেক সময় পরিচিতরাও বাড়ি বিক্রি করতে চায় । কেউ কেউ বাড়ি কিনতে চায়, ওরা বায়ার ক্লায়েন্ট । ওদের নিয়ে বিভিন্ন বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাই, যেটা পছন্দ হয় ওরা অফার করে। সেলারের দাম পছন্দ হলে বিক্রি হয়ে যায় বাড়িটা । সেলার ছেড়ে চলে যায় তার পঞ্চাশ বছরের স্মৃতি জড়ানো বাড়িটা ৬০ দিনের মধ্যেই।
***
আমার ভীষন নেশা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ওদের ছোট্ট ছোট্ট জিনিসগুলিকে খেয়াল করা । যেসব বাড়ির মালিকরা বুড়ো বুড়ী, ওদের আসবাবপত্র, জিনিষপত্র, কাপড় চোপড়, সব কিছু আমার নেশা ধরিয়ে দেয় । ওদের প্রতিটা জিনিষ খুব পুরোনো হয়, ভীষণ পুরোনো । ওদের দেয়ালে টাঙ্গানো ছবিগুলোও আমাকে নিয়ে যায় ওদের ১৯৫০ সালের ঐ সেটআপে, ঐ সময়ের গন্ধ আমি পাই । ওদের বাড়িগুলোতেও অনেক পুরোনো গন্ধ থাকে, মোটেই বাজে গন্ধ নয়, তবে ভীষণ পুরোনো একটা গন্ধ । ওরা ওদের বাড়িতে রেখে দেয় সেই ১৯৫০ সালের কেনা চেয়ার, সোফা, রেকর্ড প্লেয়ার, রেডিও, কাপ, পিরিচ, বাসন, শো পিস, বিছানা, চাদর, খাট, ড্রেসিং টেবিল ইত্যাদি । এই বুড়ো বুড়ী গুলো এতো ভদ্র আর মাই ডিয়ার হয়, যা বলে বোঝানো সম্ভব নয় । যখন আমি আমার বায়ার ক্লায়েন্ট নিয়ে বাসা দেখাই, সাধারণত বাসার মালিক বাসায় থাকেনা যাতে করে ক্রেতা মন খুলে বাসাটা দেখতে পারে । অনেক সময় মালিক অর্থাৎ মিষ্টি বুড়ো বুড়ী উপস্থিত থাকে এবং আমি ওই সময়টা বেশী উপভোগ করি । আমার ক্লায়েন্ট বাসা দেখতে থাকে আর আমি ওদের সঙ্গে গল্প করতে থাকি । হয়তো গল্পের বিষয় থাকে – ওদের ১৯৫০ সালের ছবি তোলার স্থান কাল পাত্র কারন, কোন সময় ওদের অতীত স্মৃতি । ওরা কিন্তু ভীষণ আলাপী হয় । ওরা তীর্থের কাকের মতো বসে থাকে কারো সঙ্গে একটু গল্প করার জন্য । এদের কারো সঙ্গে এদের ছেলেমেয়েরা থাকেনা বলে এদের জীবন ভীষণ একাকী । সাধারণত কেউ একটু সময় দেয়না এদের, এজন্যে কেউ একটু গল্প ধরলেই ওরা পাগল হয়ে কথা বলার জন্য ।
***
প্রতিটা বাসার নিজস্ব একটা ভাইব আছে । আমি এই ব্যবসায় আসার আগে জীবনেও এই বিষয়টা জানতাম না । আমি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারবো না এই ভাইব বলতে আমি কি বুঝাচ্ছি তবে কিছুটা বর্ণনা দিতে পারি । কিছু বাসায় ঢুকে খুব ডার্ক লাগে, কেমন যেন একটা ভারী অন্ধকার । লাইট জালানোর পরেও সরতে চায়না অন্ধকার টা । কেমন যেন স্যাঁত স্যাঁতে একটা পরিবেশ । কিছু বাসায় ঢুকে মনে হয় নষ্ট হয়ে যাওয়া জীবন, এখানে বিয়ারের কৌটা পড়ে আছে তো ওইখানে খোলা মদের বোতল । সিঙ্কে হয়তো একগাদা আধোয়া ময়লা বাসন কোসন, ডাইনিং টেবিলের ওপর পড়ে আছে গতকালের খাওয়া পিজার টুকরো, কিচেনে হয়তোবা ৩/৪ টা গারবেজের কালো ব্যাগ মুখ খোলা অবস্থায় পড়ে আছে । বাথরুমের ফ্লোরে হয়তোবা একগাদা আধোয়া কাপড় । আজগুবি একটা গন্ধ সারা বাসা জুড়ে । কিছু বাসায় ঢুকে বাসাটাকে খুব ভারী লাগে, কেমন যেন হাত পা চলতে চায় না । বেজমেণ্টটা একটু বেশী অন্ধকার আর ভীষণ ঠাণ্ডা হয় । দিনের বেলাতেও এসব বাড়ির ভিতর মনে হবে অমাবশ্যার রাত । এই বাসাগুলিতে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে আমার । কিছু বাসায় ঢুকে মনে হয় বাসার প্রতিটা কোনায় সুখের জোয়ার বইছে । প্রতিটা জায়গায় ভালোলাগার ছোঁয়া, ভালোবাসার আবেশ, সবকিছুতে যত্নের বন্যা । সারাবাড়ী আলোর বন্যায় মনটা হাল্কা হয়ে যায় ।
***
একবার আমার বায়ার ক্লায়েন্টকে নিয়ে একটা বাড়ি দেখতে গিয়েছি । সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে, এমন একটা সময় । ওই এলাকার বাসা গুলো বেশ বড় বড় । বাড়ির লট গুলোও বড় । ম্যাচিওরড ও সেটেল্ড নেইবারহুড অর্থাৎ পাড়াটা বেশ পুরোনো, বাড়ি গুলোর বয়স কমসে কম ৭০/৮০ বছর । পাড়ার গাছগুলোও অনেক বয়সী । অধিবাসীরাও বেশ পুরোনো যার কারনে প্রতিটা বাসায় বুড়ো বুড়ির বসবাস । ওরা বেবি বুমারস । কোন ভাড়াটিয়া নাই, সবাই মালিক । যে কারনে খুব সুন্দর করে মেইনটেইন করা প্রত্যেকটা বাসার ফ্রন্ট ইয়ার্ড, ব্যাক ইয়ার্ড এবং বাসার ভিতর । এধরনের নেইবারহুডকে সেটেল্ড নেইবারহুড বলা হয়ে থাকে ।
***
সন্ধ্যাটা আরও গাঢ় হয়ে এসেছে । হঠাৎ করে কাউকে কিছু না জানিয়ে ঝম ঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো । আমি হেড লাইট জালিয়ে ওয়াইপার টা ফুল স্পীডে চালিয়ে দিলাম । এতো জোরে ওয়াইপার চলেও বৃষ্টিকে সরাতে পারছেনা সামনের গ্লাস থেকে, যে কারনে কিছু দেখা যাচ্ছেনা সামনে । রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলছে গাড়ি, রাস্তার দুপাশে বিশাল বিশাল গাছ ওদের বয়সের ভার বইতে না পেরে নুয়ে পড়েছে রাস্তার দিকে । লাইটপোস্টের আলো গুলোকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছেনা বৃষ্টির তোড়ে । এদেশের বৃষ্টি কেমন যেন ভারী, যখন হয়, অতিরিক্ত হয় । রাস্তা ধুয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির পানিতে । প্রতিটা বাড়ির জানালার পর্দা ভেদ করে দেখা যাচ্ছে সন্ধ্যা বাতি । তবে কোন বাসায় দেখা যাচ্ছেনা কোন মানুষ । রাস্তাটা বেশী চওড়া না, আমি যাচ্ছি তো যাচ্ছি, পথ ফুরায় না । একসময় দেখলাম রাস্তাটা শেষ হয়ে গিয়েছে । রাস্তা শেষের ওই জায়গাটাকে বলে কুলডেসাক । রাস্তার একেবারে শেষে একটা বাড়ি দেখতে পেলাম । ভীষণ ঝোপ ঝাড়ে ভরা বাসাটা । পুরো বাসাটাকে একনজরে দেখা যাচ্ছেনা, ৩ ভাগের ২ ভাগ গাছ গাছালিতে ঢেকে আছে । ওই বাড়ির আশেপাশে আর কোন বাড়ি নেই । কোন লাইট জ্বালানো নাই বাসার ড্রাইভওয়েতে অথবা জানালায় । আমার গাড়ীর হেডলাইট গিয়ে পড়লো গ্যারেজের ওপর, ওখানেই দেখতে পেলাম বাসার নম্বরটা, হ্যা এই বাসাই খুঁজছি ।
***
গাড়ি বন্ধ করলাম । মুষলধারে বৃষ্টি সঙ্গে মেঘের গর্জন । চারিদিকে কুচকুচে কালো অন্ধকার, নিজের হাতও নিজে দেখা যাচ্ছে না । প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়া । মাঝে মাঝে বিজলি চমকাচ্ছে আর সেই আলোয় দেখা যাচ্ছে বাড়িটা । বাড়িটা একটা Ranch Bungalow, অনেকটা এখানে দেয়া কাভার ছবিটার মতো । আমার ক্লায়েন্ট এবং আমি কেমন যেন কিছুক্ষনের জন্য একেবারে নীরব হয়ে বসে রইলাম গাড়ীর ভিতর । গাড়ীর ভিতরটা কালো অন্ধকারে ডুবে গিয়েছে । উনার মুখটাও আমি দেখতে পাচ্ছিনা । এতো ঘনো অন্ধকার, মনে হচ্ছে হাত দিয়ে ধরা যাবে ওই গাঁঢ় অন্ধকারকে । বেশ ক’বছর হয় সিগারেট ছেড়েছি, তা না হলে হয়তো একটা সিগারেট ধরাতাম । সিগারেটের আগুনটাকেও অনেক আপন লাগতো ওই

 অন্ধকারের মধ্যে, কেমন যেন একটা সাহস দেয় সিগারেটের আগুন । বিজলি চমকালে দেখা যাচ্ছে আমাদের চেহারা । কেমন যেন লাগছে । মনে মনে ভাবছি যে ফিরে যাবো কিনা । ভীষণ বৃষ্টির কারনে বের হতে পারছি না গাড়ি থেকে । বের হলেই ভিজে যাবো । তার মধ্যে ঘুট ঘুটে কালো অন্ধকার । উনি নীরবতা ভেঙ্গে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ
কি করবেন?
আমিঃ কি, দেখবেন? না চলে যেতে চান?
ক্লায়েন্টঃ আজ আর কোন বাড়ি দেখার জন্য আছে??
আমিঃ না, এটাই শেষ বাড়ি ।
ক্লায়েন্টঃ তাহলে একটু কষ্ট করে দেখেই যাই, ভিজে গেলেও অসুবিধা নাই, এখনতো বাসায়ই চলে যাবো । 
আমিঃ ঠিক আছে চলেন ।
গাড়ীর দরজাটা খুলে দুজনেই দৌড় দিলাম বাড়ির গেটের কাছে । গেটের ওপরে বড় একটা কার্নিশ থাকায় বৃষ্টি থেকে বেঁচে গেলাম দুজনেই । আমার ফোনে ইমেইল শোইং কনর্ফারমেশন থেকে লক বক্সের এর কোড টা বের করলাম । লকবক্স একটা ছোট্ট লোহার বক্স যেখানে ওই বাড়ির চাবিটা সংরক্ষিত থাকে এবং ওই লকবক্সে একটা কোড পাঞ্চ করলে বক্সটা খুলে যায় এবং আমরা তখন ওই চাবিটা ব্যবহার করে বাড়ির দরজা খুলি । আমরা ওই কোড টা পাই সেলারের এজেন্টের Brokerage থেকে । বাড়ি দেখানো হয়ে গেলে আমরা চাবিটা আবার ঐ লকবক্সে রেখে বন্ধ করে দিয়ে কোডগুলি  নর্মালি ঘুরিয়ে দেই ।
***
অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না বিধায় আমি লকবক্সের কোড দেখতে পাচ্ছিলাম না । আমার ক্লায়েন্টকে বললাম ফোনের লাইট টা জ্বালাতে, উনি লাইট জ্বালিয়ে ধরলেন । লকবক্সটা দরজার কড়াতে লাগানো ছিলো । আমি লকবক্সটায় হাত দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে দরজার ভিতর থেকে একটা আওয়াজ হলো । আমি ভীষণ আশ্চর্য হলাম কারন আমি সেলারের Brokerage থেকে জানতে পেরেছিলাম যে বাসা খালি এবং কেউ থাকবেনা, আমাকে লকবক্সের চাবি দিয়ে খুলতে হবে । ভিতর থেকে আওয়াজ পেয়ে একারনেই আশ্চর্য হয়েছি । এবার কচ কচ আওয়াজ করে দরজাটা খুলে গেলো । দুজনেই দরজা থেকে একটু সরে দাঁড়ালাম । দরজা খোলা মাত্র ঘরের ভিতর থেকে এক চিলতে আলোর ছটা আমাদের গায়ে এসে পড়লো । চোখের সামনে দেখলাম একজন ভীষণ বয়স্ক মহিলা দরজা খুলে এক পাশে দাড়িয়ে আছেন, ওই অল্প আলোয়ও উনার সৌন্দর্য আমাদের চোখ এড়ালো না । একজন ৮০/৮৫ বছরের মহিলা এতো সুন্দরী কিভাবে হয় মাথায় ঢুকলো না । যদিও মুখের চামড়ায় ছিলো শত শত রিংকেলস, ঢিলা হয়ে গিয়েছিলো চেহারা । উনি হাত দিয়ে ইশারা করলেন ভিতরে ঢোকার জন্য তবে কোন কথা বললেন না । আমি যথারীতি আমার বিজনেস কার্ড এগিয়ে দিলাম ওনার দিকে । উনি কার্ডের দিকে খেয়াল না করে আবারও ভিতরে যেতে ইশারা করলেন । আমরা ভিতরে ঢুকে গেলাম । ওই বুড়ি মহিলা ভিতর থেকে দরজটা বন্ধ করে দিলেন ।(চলবে)

ছবি: গুগল