মনের ভ্রমণ রোমে

মাসকাওয়াথ আহসান

হাসিমুখ আর বিনয়ের দুর্ভিক্ষে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা দক্ষিণ এশিয়া থেকে বেরিয়ে ক’টাদিন মৌলিক মানুষদের সঙ্গে কাটাতে রোমের উড়োজাহাজে উঠে পড়তেই; হঠাৎ যেন ঢুকে পড়লাম দক্ষিণ এশিয় সমাজ বাস্তবতায় আজগুবি ইউটোপিয়ার মতো রোমান সমাজে। কারো চোখে চোখ পড়লেই সে হাসে; যে হাসিতে কোন কপটতা নেই; হীনমন্যতা নেই; সহজাত আন্তরিকতার শিশির মাখা সে হাসি। আর চারপাশে গল্পের ফোয়ারা। চুপ করে বসে থাকার উপায় নেই; আশেপাশে বসে থাকা লোক রামগোরুড়ের ছানাদেরও হাসিয়ে মারে।

কেউ কাউকে ব্যক্তিগত কোন প্রশ্ন না করে; বিশ্বরাজনীতির কচকচানিতে না গিয়ে নির্মল সব গল্প। রোমে গিয়ে ট্রাম-ট্যাক্সিতে না উঠে হেঁটে দেড়-দু’ঘন্টায় পুরো নগর ঘুরে ফেলার নানারকম টিপস সেধে দিয়ে দেবার মানুষের অভাব নেই। রোমের নারী-পুরুষের সঙ্গে গল্প শুরু করলে তা ম্যারাথন গল্প হয়ে দাঁড়ায়। গল্পের ইতিটানতে অপরাধবোধ কাজ করে। গপ্পোবাজ-আড্ডাবাজ মানুষের শহর রোম। আমাদের দেশে বাজার করে ফেরার পথে গপ্পো করে বাজারের ব্যাগে মাছ পচিয়ে ফেলার মতো যে কিছু রসিক মানুষ আছেন; তাদেরই জমজ ভাইয়েরা থাকেন ও-খন্ডের ইটালিতে তা বুঝতে বাকি রইলো না। বাঙালি ও ইটালিয়দের মাঝে এমন মিলের কারণ কী হতে পারে; তা ভাবছিলাম! উভয় দেশের প্রাচীন সভ্যতার মাঝে কোন মিল না থেকেই পারে না।

রোমের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশ একগাল হাসি দিয়ে বললেন, ইতালি ভ্রমণ আনন্দপ্রদ হোক। স্যুটকেস সংগ্রহের চক্রযান থেকে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে একজন ইটালিয় নারী যাত্রী যখন ভারি স্যুটকেস নামিয়ে হাতে দিলেন, বুঝতে বাকি রইলো না; এটা সুচিত্রা সেন কিংবা শাবানার দেশ; পুরুষদের কোন ভারি কাজ করতেই দেয়না। বিমান বন্দরের বাইরে বেরুতেই দেখি অতিথির নাম লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে এক সাদা শার্ট-কালো ট্রাউজার পরা চুলে জেল দেয়া আয়েশি যুবক। চেয়ারম্যান সাহেবের নাদুস-নুদুস ছেলেটির মতো। লাইটার আছে কীনা জিজ্ঞেস করতেই, খুশিমনে সে রোম ভ্রমণের মুখাগ্নি করে।

নিজেরই একটি কালো মার্সিডিজ গাড়ি সে ইচ্ছা হলে চালায়, ইচ্ছা না হলে চালায় না; একটা বেশ স্বাধীন জীবন যাপন করে বলেই মনে হলো। তবে সে স্যুটকেস টানাটানিতে হাত লাগাতে দিলোনা। নিজে থেকেই রোমের নানা জায়গা দেখালো; ছোট ছোট দালান-ছোট বাড়ি-ছোট গাড়ি আর পথে হেঁটে চলা মানুষের আনন্দময় মিছিলের শহর। মাঝে মাঝে ফোনে সে কথা বলছিলো রেস্ট হাউজের ব্যবস্থাপক আর নানান মহল্লার বন্ধুদের সঙ্গে। ইটালির পুলিশ বেশ বন্ধু ভাবাপন্ন; ঢিলেঢালা পদ্ধতিতে কীভাবে শহরের শৃংখলা ধরে রাখে তা বোধগম্য হলো না।

রেস্ট হাউজে পৌঁছাতেই এক বয়স্ক ভদ্রলোক হাসিমুখে অনেক কথা বার্তা বলে যেন অতিথি বরণ করলেন; গেস্ট হাউজের কেউ না হয়েও। কেবল তিনি ঐ দালানের একটা অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। ছুটে এলো গেস্ট হাউজের হোস্ট মারিও; স্যুটকেসটা নিয়ে নিলো; মৃদু আপত্তি জানাতেই বললো, তারই এটা করা উচিত; কারণ সে তরুণ। রিসেপশানে মারিওর বান্ধবি বসে ছিলো। রবিবার অতিথি বরণ থাকায়; তাদের ছুটিদিনের ঘোরাঘুরি বাতিল হয়ে গেছে। সুতরাং দুজনে একটু গল্প করে পুষিয়ে নিচ্ছিলো। ওদের ঘুরতে যাওয়ার তাড়া দিলাম। কিন্তু রোমের মানুষ গপ্পোবাজ। গল্প শেষ করতে ওরা রাজি নয়। মারিও সাংবাদিক। সাংবাদিকতার পাশাপাশি পারিবারিক গেস্ট হাউজের ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করে।

যেখানেই যাই; আমার কেবলই টকশো হয়ে যায়। মারিও ইটালির রাজনীতিবিদদের কঠোর সমালোচক; তরুণ সাংবাদিক ঠিক যতটা ক্রিটিক্যাল হওয়া উচিত। মারিওর বান্ধবীও দেখলাম কঠোর সুশীল সমাজ। দুজনে মিলে তথ্য উপাত্ত তুলে ধরে জানালো, ইটালি ইউরোপের সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের দেশ। তিনটি রাজনৈতিক দলের মতবিরোধে নিশ্চল আইন-প্রণয়ন। ঝুলন্ত সংসদে বাম-ডান ও প্রচলিত রাজনীতিবিরোধীদের পারস্পরিক টানাপোড়েনে বিরক্ত নাগরিক সমাজ। দীর্ঘদিন নির্বাচন হয়না। সাংসদরা ক্ষমতা কামড়ে পড়ে আছে।

৮০ শতাংশ শিক্ষিত আর বাকি ২০ শতাংশ স্বাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের দেশে রাজনীতিকদের ও তাদের সাইড কিকদের সমাজে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিন্দুমাত্র গ্রহণযোগ্যতা নেই। সাধারণ মানুষই সমাজটাকে চালায়। ইটালির মানুষ তাদের মাঝের অল্পসংখ্যক কট্টরপন্থীকে অত্যন্ত অপছন্দ করে। বিশ্বের নানাজায়গা থেকে আসা নানা ধর্মের-নানা বর্ণের মানুষকে ইটালির রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজ গ্রহণ করে; আর এই পরমতসহিষ্ণু উদার মনোভাবের সমাজই ইটালিতে পৃথিবীর নানাদেশ থেকে আসা পর্যটকদের জন্য এক মিলনতীর্থ রচনা করেছে। ফলে পর্যটন খাত বড় উপার্জনের উতস হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে। বিনয় আর হাসিমুখ থাকলে প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে সমসাময়িকতার যে অনুপম সৌন্দর্য ধরে রাখা যায়; রোম বোধ হয় তারই প্রমাণ।

মারিও যখন জানালো, বাংলাদেশের মানুষকে রোমানরা পছন্দ করে; তাদের পরিশ্রম আর সুন্দর আচরণের জন্য; তখন মনে হলো আমাদের সহজিয়া দার্শনিকরা তাদের গানের কথায়, মানুষ ধর মানুষ ভজ, মানুষের ভিতরে মানুষ করিতেছে বিরাজন; এরকম যে চিন্তার আলো রেখে গেছেন , অনুকূল পরিবেশ পেলে সে আলো ঠিকই আলো খুঁজে নিতে পারে।

ছবি: লেখক