চকিুনগুনয়িা হলে কি কি করবনে…

ডা. ওয়ানাইজা রহমান

চিকুনগুনিয়া শব্দটি এসেছে আফ্রিকান মাকন্ডি ভাষা থেকে, এর অর্থ ভেঙে যাওয়া বা বাঁকা হওয়া। চিকুনগুনিয়া জ্বরে আর্থ্রাইটিসের মতো হাত-পা ব্যথা হওয়ার উপসর্গ থেকেই এই নামটি এসেছে। ১৯৫২-৫৩ সালে তানজানিয়াতে এই রোগের আবির্ভাব হয়। পরে ১৯৬০ এবং ১৯৮২ সালে দক্ষিণ এশিয়াতে চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যায়। ১৯৬০ সালে ব্যাংককে এই ভাইরাস শনাক্ত করা যায়। ভারতের কলকাতা, ভেলোর, মহারাষ্ট্রে ১৯৬৪ সালে, শ্রীলঙ্কাতে ১৯৬৯ সালে, ভিয়েতনামে ১৯৭৫ সালে এবং ১৯৮২ সালে ইন্দোনেশিয়াতে এই রোগ দেখা দেয়। এরপর দক্ষিণ এশিয়াতে প্রায় ২০ বছর চিকুনগুনিয়া রোগ দেখা দেয়নি। ২০০৫-২০০৬ সালে ভারতে আবার চিকুনগুনিয়া রোগ দেখা দেয়। ১.২৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ এতে আক্রান্ত হয়।
২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের রাজশাহীতে চিকুনগুনিয়া দেখা দেয়। এ ছাড়া ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী জেলা দোহারেও এই রোগ দেখা দেয়। ২০১১ সালের নভেম্বরে চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব আবার বাংলাদেশে দেখা দেয়।
চিকুনগুনিয়া একটি ভাইরাসের কারণে হয়। এটি একটি মশাবাহিত ভাইরাস। এডিস মশা এর বাহক। এডিস এজেপ্টি এবং এডিস এলবেপিকটাস মশা এর বাহক। মানুষের দেহে এই দুই প্রকার মশার মাধ্যমেই এই ভাইরাস ছড়ায়। আরেকটি কথা আমরা অনেকেই জানি যে, এডিস মশা দিনের বেলায় কামড়ায়।
চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত হলে জ্বর হয়। জ্বর ১০৪ ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। সেই সঙ্গে জয়েন্টে ব্যথা, হাত-পা ব্যথা, মাথাব্যথা, বমিভাব এবং র‌্যাশ হয়। এ ছাড়া কনজাংকটিভাইটিসের মতো উপসর্গও দেখা যায়। এই জ্বর ২-১২ দিন থাকতে পারে। তবে সাধারণত ৩-৭ দিন থাকে। জয়েন্টের ব্যথা মাসাধিককাল স্থায়ী হতে পারে।
চিকুনগুনিয়া হয়েছে কিনা সেটি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। এলাইজা পরীক্ষার মাধ্যমে আইজি এম এবং আইজি জি অ্যান্টি চিকেনগুনিয়া অ্যান্টি বডির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। এ ছাড়া RT-PCR-এর মাধ্যমেও ভাইরাস শনাক্ত করা যায়।
এখন পর্যন্ত চিকুনগুনিয়ার কোনো ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। তাই চিকুনগুনিয়া জ্বর হলে জ্বরের যে চিকিৎসা দেয়া হয় সে রকম চিকিৎসাই নেয়া প্রয়োজন। উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়া হয়। বিশ্রাম, প্রচুর তরল খাবার ও প্যারাসিটামল ওষুধ দিয়ে এই জ্বরের চিকিৎসা করা হয়। আর্থ্রাইটিসের জন্য ক্লোরোকুইন দিয়ে চিকিৎসা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন নেয়া যাবে না। ঠিক যেমনটি ডেঙ্গু জ্বরে নেয়া যায় না।
চিকুনগুনিয়া জ্বর প্রতিরোধ করতে হলে এডিস মশার প্রজনন বন্ধ করতে হবে। জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা এবং মশারির ব্যবহার এ রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। দিনের বেলায় শিশুদের মশারির নিচে ঘুমাতে দেয়া এবং হাত-পা ঢাকা জামা পরানো যেতে পারে। এ ছাড়া অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার সময় মশারি ব্যবহার করা যেতে পারে।
সুতরাং চিকুনগুনিয়া জ্বর প্রতিরোধ করতে হলে এডিস মশার প্রজনন প্রতিরোধ করতে হবে। জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে। প্রতি মাসে দুই থেকে তিনবার জমে থাকা পানি, ড্রেন ইত্যাদি পরিষ্কার করা প্রয়োজন। অযথা আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন, জনসচেতনতা সৃষ্টি করুন। সিটি করপোরেশন, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং আমাদের সব নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব।

লেখিকা : সহযোগী অধ্যাপিকা, ফার্মাকোলজি অ্যান্ড থেরাপিউটিক্স, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ।
চেম্বার : দি বেস্ট কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ২০৯/২, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা।