আত্ম জিজ্ঞাসা

তাজুল ইমাম

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আমার শৈশবে প্রথম কোরবানীর স্মৃতিটা মনের গভীরে চিরস্থায়ী হয়ে আছে। । আমার সরকারী চাকুরে বাবার মফস্বলের পোষ্টিংএ শব্জী বাগানের সখ মিটলেও গরু পালার গেরস্থালির সুযোগ ছিল না। কোরবানীর সময় তাঁকে গরু কিনে আনতে হত। আমার বয়েস সম্ভবতঃ তিন কি চার বছর; স্মৃতিগুলো তাই খুব স্পষ্ঠ নয়। টুকরো স্মৃতির ছেঁড়া মালা। কোন এক সকালে ঘুম ভাঙলো আপার ডাকে, ” ওঠ ওঠ আমাদের কোরবানীর গরু এসেছে, দেখবি চল”। খয়েরি রঙের চকচকে একটা গরু দাঁড়িয়ে আছে আঙিনায়। কালো কালো শিংগুলোও চকচক করছিল। পরে জেনেছিলাম কোরবানীর গরুকে গোসল করিয়ে তেল মাখিয়ে বাজারে তোলা হত। মা বাবা এবং প্রতিবেশীরা সপ্রশংস দৃষ্টিতে দেখছিলেন গরুটিকে। আপা (৩ বছরের বড়) বুঝিয়ে বল্ল কি হতে যাচ্ছে, কিন্তু তখনো বুঝতে বাকি ছিল বাস্তবতা। আপা গরুটির কাজলকালো চোখে অশ্রু দেখালো, ” জানিস্ ওরা পশু হলে কি হবে, ঠিক জানে কি হবে ওদের ভাগ্যে”। আমরা ভাই বোন দুজন ছুটলাম প্রতিবেশী ও বন্ধুদের খবর দিতে কিন্তু সেদিন তপু দিদি আর স্বপন কিছুতেই এল না। মাসীমা যেন কিছুটা বিরস গলায় বললেন ওরা যাবেনা। ওদের পড়া আছে। ইস্কুল তো ছুটি তবে আর পড়া কেন? কিন্তু আমার হাসিখুশি দিদি আর প্রানের বন্ধু স্বপন এলো না কিছুতেই। পরদিন ভোরবেলা বাবার আঙ্গুল ধরে ঈদের ময়দানে গেলাম।। সাদা চাদর দিয়ে পুরো মাঠ ঢেকে দেয়া হয়েছে। অভাবনীয় এক দৃশ্য। সেখানে সবাই সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়লাম। নামাজ শেষে বাবা হাঁটুগেড়ে বসে জীবনে প্রথম আলিঙ্গন করলেন আমাকে, একবার দু বার, তিন বার। মায়ের কাছে যা প্রতিদিনই পাওয়া যায়, বাবার কাছে তা বছরে দু বার। বাড়ী ফিরতেই মা পায়েশ পিঠা খেতে দিলেন। কিছুক্ষন পরেই বেঁটে খাটো টুপি পরা একজন লোক হাজির হল, সঙ্গে আরো দুজন। তাদের হাতে পাটের দড়ী। আমি আর আপা দাঁড়িয়ে ছিলাম বারান্দার এক কোনে। সেই তিন জন কি যেন আলোচনা করল বাবার সঙ্গে, কাগজে লিখেও নিল কিছু তারপর অদ্ভুত এক কায়দায় আমাদের চকচকে গরুটিকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে পাগুলো বেঁধে ফেল্ল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিশাল একটি ভাজালী দিয়ে কেটে ফেলা হল গরুটির গলা। ফিনকি দিয়ে ছুটল লাল রক্ত । ওরা তিনজন সরে গেল একটু দুরে। গরুটি ছটফট করছিল, বেঁধে রাখা পাগুলো ছোড়ার চেষ্টা করছিল, বিচিত্র একটা ঘড় ঘড় শব্দ হচ্ছিল। সন্ভবতঃ কেটে ফেলা শাঁসনালিতে নিঃশ্বাস নেবার চেষ্টা। এক সময় নিথর হয়ে গেল গরুটি। আপা আমাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদছিল। আমি শুধু দেখছিলাম আমাদের আঙ্গিনার কোনটি রক্তে লাল হয়ে গেছে। শৈশবের অনেক স্মৃতিই ম্লান হয়ে গেছে তবে এটুকু মনে আছে সেদিন এবং তার পরের আরো কিছুদিন আমরা দুবেলাই সুস্বাদু মাংস খেয়েছিলাম। এরপর যতবার কোরবানী হয়েছে মাংসের স্বাদ পেয়েছি প্রতিবার। ধীরে ধীরে আমার লোভী মনের মধ্যে মাংশলালসা চিরস্থায়ী বাসা বাঁধলো। এখন কোনো স্বাস্থ্যবান পশু দেখলে ত্যাগ তিতিক্ষা নয় বরং এক অদম্য মাংশলালসা জেগে ওঠে। আমি অভাজন অন্য সবার মত ধর্মের মহান শিক্ষা গ্রহন করতে পারিনি। ত্যাগের মহিমা স্পর্শ করেনি আমার হৃদয়। শুধুই নিজেরটা বুঝে নিয়েছি ষোল আনা। নিজের স্বার্থ বজায় থাকলে তবেই ধর্মের নির্দেশ পালন করেছি। লোক দেখানো দান করেছি প্রতিপত্তির লোভে। আজ জীবনের সায়াহ্নের আলোয় দাঁডিয়ে অকপটে সব স্বীকার করতে মন চায়।

ছবি: গুগল