মনের নগর, প্রাণের শহর

হাসানুল বান্না, প্রকৌশলী

আমার মনের নগর,প্রানের শহর কুষ্টিয়া।যে কোনো দেশের ভাবমূর্তি অন্য কোনো দেশের কাছে প্রকাশ পায় তার কৃষ্টি, সংস্কৃতির মাধ্যমে। কুষ্টিয়া এমন একটি শহর ; যা বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনকে প্রভাবিত করেছে প্রমিত বাংলা ভাষা, সাহিত্য, যাত্রা, নাটক, ছায়াছবি সহ সকল শাখায়।  যার জল, হাওয়া, মাটি আর মানুষের সান্নিধ্য আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে, ভাবাতে শিখিয়েছে, এমনকি লিখতেও শিখিয়েছে। এখানে অনেক গুনী মানুষের আগমন ঘটেছে; যারা কুষ্টিয়ার সোঁদা মাটির কাছে ঋণী। শহর কেন্দ্রিক লেখার অন্য কোনো এপিসোডে  তাদের  অবদানের কথা লিখবো। যারা কুষ্টিয়ার অধিবাসী নন, তাদেরকে কুষ্টিয়া জেলার ভৌগলিকগত ধারণা দিতে চাই। কুষ্টিয়ার উত্তরে নাটোর, রাজশাহী, পাবনা; উত্তর-পূর্বে পাবনা; পূর্বে রাজবাড়ী,দক্ষিণে ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা; দক্ষিণ-পশ্চিমে চুয়াডাঙ্গা এবং পশ্চিমে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর। এক সময় বৃহত্তর কুষ্টিয়া মহকুমা ছিল কুষ্টিয়া সদর, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর অঞ্চল নিয়ে; যা পরবর্তীতে তিনটি জেলায় রূপান্তরিত হয়েছে যথাক্রমে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর নামে।

আমার নিজের জেলা বলে বাড়িয়ে বলছি না।অফিসের প্রয়োজনে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। কুষ্টিয়াকে ছিমছাম, পরিস্কার পরিছন্ন ও সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি আদর্শ জেলা শহর বলা যেতেই পারে। আপনারা যারা এই শহর এখনও দেখেন নি, তাদের প্রতি আমার উদাত্ত আহবান থাকবে। দেখুন, জানুন কুষ্টিয়াকে, কুষ্টিয়ার মানুষকে। গড়াই নদীর জলে সিক্ত এই শহর গৌরবময় ইতিহাস ও আবহমান সৌন্দর্যের নকশী কাঁথা শরীরে পরে এগিয়ে চলেছে। এই শহরের দুটি রূপ আমাকে মুগ্ধ করেছে। বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণরূপ। সময়ের পরিক্রমায়; যা মানুষের চাহিদা,রুচি,আচরণ ও লাইফ স্টাইলে প্রকাশ পায়।

কুষ্টিয়া শহর যেমন পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন, এখানকার মানুষও তেমনি রূপের কদরও করতে জানে। সেই সঙ্গে এখানকার মানুষ লালন করে ভাব গাম্ভীর্যের ঐতিহ্যকে, যা আমাদের সত্ত্বা বা আত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত। উল্লেখ্য যে, কুষ্টিয়া শহর লালন সাঁই এর  মত একজন মহাসাধককে পেয়েছে; যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ স্পর্শে এখানকার মানুষ আত্ম-শুদ্ধির কলা কৌশল সম্পর্কে জানার অবাধ সুযোগ পেয়েছে। দুর-দুরান্ত, দেশ-বিদেশ থেকেও অনেক মানুষ এখানে আসেন মনের জগতকে জানার এবং উপলব্ধি বোধকে সাধন প্রক্রিয়ায় আলোকিত করতে। এখানে লালন একাডেমীর সুব্যবস্থাও আছে। জানতে আসা মানুষদেরকে শিক্ষার মধ্য দিয়েও জানানো হয় – কিভাবে মনের সৌন্দর্যকে বাড়ানো যায়। এবং মনের সৌন্দর্যকে অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব- কেননা কুষ্টিয়া শহর সমৃদ্ধ হয়েছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, কৃষ্টি , আচরণ, রুচিশীলতার পরিচয়ের মাধ্যমে; যা প্রকাশিত হয় খেলা-ধূলা, ঈদ, পূজা সহ নানাবিধ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব আয়োজন এবং পালনের মধ্য দিয়ে।

কুষ্টিয়াতে ঘুরতে আসা ভ্রমণ পিপাসু কয়েকজন আমেরিকা প্রবাসী মানুষের কথা না বললেই নয়। ঘটনাটি  মজাদার, ২০০৮ সালের কথা।ঈদ উল আযহার চাঁদ রাতের আগের দিন ফোন এলো স্টিভ ভাইয়ের। বললেন শিউলী আপা (যিনি আমেরিকা থাকেন), ভাগ্নে জেসিয়া ও ইভানকে নিয়ে কুষ্টিয়া আসতেছি। গাইড হিসেবে আমার সাপোর্ট তাদের খুব দরকার।আমিও ভ্রমণ করতে ভালবাসি, রাজি হলাম। আপা এসেই বললেন, বান্না তোমাদের কুষ্টিয়ার এমন একটি খাবার খেতে চাই যেন আজীবন মনে থাকে। আমি একটু চিন্তা করলাম আর পাবলিক লাইব্রেরীর সামনে আসলাম। এখানে আমার অনেক পদচারণা রয়েছে। ছোলা মামাকে বললাম, আমাদের ছোলা দাও। আপু একটু বিস্মিত হলেন। এরপর কিছুক্ষণ পর টের পেলেন। অবাক করে দিয়ে সবাই আরও ছোলা চাইলেন। এতটা মজা পাবেন ভাবিনি। সেই থেকে এখনও আমেরিকা থেকে ফোন করে আপা বলেন, বান্না সত্যি তুমি মনে রাখার মত কিছু খাওয়াতে পেরেছ।সময় পেলে তোমার খোকন দুলা ভাই  যাবে কুষ্টিয়াতে। জানি না সেই ছোলা মামা বেঁচে আছেন কিনা। তবে তিনি বেঁচে থাকবেন রন্ধনশৈলীর মমতায় আর মানুষের ভালোবাসার হেঁসেলে।

যে কোন শহরকে সমৃদ্ধ করতে হলে  নবীন আর প্রবীন জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত হতে হয় একই ছাতার নীচে। কুষ্টিয়ার সন্তানেরা যেখানেই থাকুক না কেন; থাকুক ঐক্যে,হোক পরস্পর সহযোগিতা মনোভব সম্পন্ন, সত্যিকার শিক্ষায় শিক্ষিত এবং সততা আর নিষ্ঠার সঙ্গে পরিশ্রমী। আর আমি বাংলাদেশী হিসেবে চাই সকল শহর হোক দূষণ মুক্ত, শোষণ মুক্ত, মানবিক মূল্যবোধে আবদ্ধ, বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যে ভরপুর। তবেই শান্তির আলো ছড়িয়ে পড়বে সর্বত্রে; যা আমাদের কাম্য।

ছবি: লেখক