সেইসব দিনগুলি!

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

কনকচাঁপা ছোট বেলায় কোরবানীর ঈদ আমাকে কখনোই টানেনি। ধর্মীয় ভাব তো তখন বুঝিনা, সামাজিক ভাব ও বুঝিনা উপরন্তু গরু জবাই করা ব্যাপারটি ও আমার কাছে হৃদয় বিদারক ছিল আর ছিল ঈদ হয়েও জামা না পাওয়ার জ্বালা। রোজার ঈদেই কেঁদেকেঁদে জামা নিতাম কোরবানীর ঈদে আম্মা আগে থেকেই হালকা ঝাড়ির উপর রাখতেন যেন জামা শব্দটাই না উচ্চারণ করি। তবুও আব্বা শেষ বেলা সামান্য পয়সা দিতেন কিছু কিনতে। সম্ভবত লুকিয়ে। বেশিরভাগ সময়ই বাগানের ওদিকে গাছ গাছালীতে পানি দিতে ডেকে বলতেন দোকানে যাবা মা? আমি রত্নাপা বুঝে যেতাম। খুব বেশী না হয়তো পাঁচ টাকা করে বরাদ্দ হত দু’বোনের। দু’বোনই বলছি কারন বড় বোন পারুল আপা নানা বাড়ি থেকে পড়তেন! আমরা ওই টাকায় হয়তো একটা নেইলপলিশ একজোড়া কানের দুল কিনতাম। আম্মা দেখেও না দেখার ভান করতেন। যেন এগুলো কোথা থেকে এলো এটা তাঁর জিজ্ঞাস্য না। রান্নাবাড়া রোজার ঈদের মতোই রাঁধতেন আম্মা। ঈদের দিন কোরবানীর সময় এলে কানে আঙ্গুল দিয়ে বালিশ চাপা দিয়ে পড়ে থাকতাম। এই কষ্টকর আওয়াজ আমার পক্ষে শোনা অসম্ভব। আম্মা বুঝাতেন ওদের আসলে কষ্ট হয়না, আল্লাহ কষ্টটা তুলে নেন। কিন্তু আমার পক্ষে তা মেনে নেয়া সম্ভব হয়না। একসময় গোবরের গন্ধে আকাশ বাতাস ভাসিয়ে বিবমিষা চলে আসে। কিন্তু বাড়িতে গোস্ত এলে আম্মার চটজলদি হাতের কারিশমাতে বাসা আবার মৌ মৌ হয়ে যায়। তখন আব্বার সেই চিরাচরিত বাক্য —– ক্য গো মোমেনা! গোস্ত তো আরো আনি, আরো তো রাঁধো কিন্তু কোরবানীর গোস্ত এমন স্বাদ গন্ধ, ঘটনা কি? আম্মা বলেন বুঝছি, এখান থেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মিল্কিওয়ে তে চলে যাবা, আমার এতো সময় নাই। হাহাহাহাহা একবার দাদীর বাড়ি গেলাম ঈদ করতে। সেখানে অন্য নিয়ম। সবার গরু গাওয়ালীরা বুঝে নিতেন! তারপর জবাই হলে সব গোস্ত তিন ভাগ করে বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন। অসম্ভব একতা না হলে এমন কান্ড ভাবাই যায় না। কিন্ত গোস্ত আসতে আসতে সন্ধ্যা রাত। ঈদই কাবাড়। কিন্তু গ্রামের ভিক্ষুক থেকে শুরু করে বড়লোক সবারই এক ওজনের গোস্ত। কি সুন্দর নিয়ম! আমি খুবই আশ্চর্যান্বিত হয়েছি এই ঘটনায়। আমার মনে দাগ কেটে রয়েছে ব্যাপার টি। সে অন্য কথা, আমাদের ছোটদের আনন্দ ছিল, গরুর পেটের পাতলা পর্দা শুকিয়ে দুষ্ট চাচার দল মজার ঢোল বানাতেন সবার জন্য। কোন ফুপুমা হয়তো ঢোলের কাঠি বানিয়ে দিতেন। আমরা ঢোল বাজিয়ে তা ফাটিয়ে ফেলতাম মাঝেমধ্যে আম্মার দাবার খেতাম। উফফফ আম্মা ছোটবেলায় যা জ্বালাতেন! সব কিছুতেই তাঁর আপত্তি! আব্বা ক্ষেপে যেতেন মাঝেমধ্যে। বলতেন বাচ্চাদের এতো পিছনে লেগে থাকো কেন তুমি? তুমি না ওদের মা? তখন আব্বার কথাই সত্যি মনে হয়েছে। এখন ভাবি আম্মা মা দেখেই নিজের মায়াবতী ভাবমুর্তি নিয়ে কখনোই ভাবেননি ভেবেছেন আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। যাইহোক যা বলছিলাম, কোরবানীর ঈদের উন্মাদনা এই ঢোল বাজানোতেই ছিল বোধহয়। আমাদের গ্রামের ওসমান চাচা অন্য কয়েকজন মানুষ দিয়ে গরুর হাড় গুলো কুড়িয়ে নিয়ে যেতেন। আমার খুব কৌতুহল হলো। গিয়ে হাজির হলাম সই হাস্নাকে নিয়ে। দেখি ওসমান চাচী শুকনো হাড় ঢেকি তে গুড়া করছেন। আমার কৌতুহলি চোখ দেখে চাচীমাই জানালেন ওগুলো সার হচ্ছে। ক্ষেতে দেবেন। বাড়তি থাকলে বিক্রি করবেন ছাইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে। আর ওসমান চাচা বললেন গরু এতো উপকার করে দেখেই হিন্দুরা শ্রদ্ধাভরে গরুকে পুজা করে। আমার যা জানার জেনে গেলাম। এখনকার ঈদগুলো আর আনন্দের হয়না। কারণ আমার গ্রামে আর কেউ থাকেনা কারন গ্রামটাই নদীতে খেয়ে নিয়েছে। আনন্দিত জীবন এখন নিরানন্দপুর বন্দরে জীবননৌকা ভিড়িয়েছে। সেখানে আব্বা নেই, দাদীমা, নানীবুজি নেই, আমার সেই মাইজবাড়ি গ্রাম নেই। নেই সেই জগৎগঞ্জ হাট! আম্মা সেখানে একলা ভীষণ অসহায় পড়ে আছেন। আর আমি? আছি, সবাইকে গান গেয়ে আনন্দ দেই, নাতী-নাতনী পরিবেষ্টিত একটি আনন্দিত ভূবন আমার আছে বটে, কিন্তু এই শৈশব আমাকে বড়ই জ্বালাচ্ছে।

অলংকরণ: লেখক