একবার বড়দিনের আগে

নীনা হাসেল (ভ্যাঙ্কুভার থেকে)

বড়দিনের আগে মেঘাচ্ছন্ন সকাল। খুব তাড়াহুড়ো করে সাদামাটা নাস্তা খেলাম। ফায়ার প্লেসে আগুণ জ্বালিয়ে বসবার ঘরটা চটপট গুছিয়ে নিলাম। সুজান ঘুমিয়েছে ফুটনে। ওটা জুরে নিয়েছে আমর স্বল্প পরিসর বসবার ঘরটি যাকে এখানে বলা হয় লিভিং রুম। দেশে ড্রয়িং রুম বলতে যা বোঝায় ঠিক তা নয়।যথারীতি ফুটন ভাজ করতেই ওটা সোফা হয়ে গেলো আবার। আর তক্ষুনি আমার প্রথম আপয়নটমেনট দরজায় টোকা দিল। পিয়ের আমার কটেজের ঝড়ে ভেঙে যাওয়া ছাদের কোণাটা ঠিক করেছে।ওর ইনভয়েস আমাকে বুঝিয়ে দিল। আমি ওর পাওনা মিটিয়ে দেবার পর আর কিছুক্ষণ বসে বসে সুজানের সাথে গল্প করল। ও উঠবার সংগে সংগে আমরাও বেরিয়ে পড়লাম। ঝড়ে বিশাল ডগলাস ফার গাছটা ভেঙে পড়েছে ইলেকট্রিক ও টেলিফোনের কেবল ছিন্ন করেছে। রিভার জাড মেরামত করে দিয়েছে বাড়ীর ভিতরের ও বাইরের ছিন্ন বিদ্যুতের যোগাযোগ ব্যাবস্থা। সুযোগ্য ইলেকট্রিসিয়ান। বাইরের টেলিফোন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দায়িত্ব যথাযথ কর্তৃপক্ষের এবং তা অনতিবিলম্বে সম্পন্ন করেছে তারা। হাইড্রো আমাকে নির্দেশ দিয়েছে কেবলের কাছাকাছি যত বড় বড় গাছ আছে নিজের খরচে কেটে ফেলতে হবে অচিরেই। তারপর এখনতো ড্রাইভওয়ে জুড়ে পড়ে আছে ঝড়ে পড়া পরিপক্ক ফার গাছটা। ঝড়ে গাছ ভেঙে পড়েছে তাতেই আমার মন অনেক খারপ ছিলো। পরিণত মেপলটা কাটাতে হয়েছে আমার নিজের নিরাপত্তার জন্য। ঝাঁকড়া পল্লবিত সুদর্শন মেপল গাছটি ঝুঁকে পরেছিল বাড়ীর উপর। বাতাসের ধাক্কায় গাছটা ভেঙে পড়লে ওটা পড়ত সরাসরি বাড়ীর ওপর। মাঝে ঝড় উঠলে কিছুটা শঙ্কিত হইন যে তা নয়। আর এই ছোট্ট দ্বীপে শীতকালের প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাতাসের আগ্রাসনে গাছপালা ভেঙে পড়াটা নিত্যকার ঘটনা। কাজেই মন না চাইলেও নিরাপত্তার জন্য সুন্দর চোখ জুড়ানো কর্তিত গাছের খণ্ডিত লগগুলি দেখে আমার চোখে পানি এসে গেল। পথ জুড়ে উঠোন জুড়ে পড়ে থাকা গাছের কোন ব্যবস্থা এ যাত্রায় সম্ভব হবেনা। ক্রিসমাসের আগেরদিন কোন বান্দাকে পাওয়া যাবেনা কাঠ কাটার জন্যে। জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে কেউ কল ব্যাক করবেনা।

এখানে কাঠের দাম সোনার দাম। এক কর্ড কাঠের দাম ৪০০ ডলার। আর শীত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম আরও বেড়ে যায়। যাই হোক কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে হরিণগুলো কিন্তু এতো লংকাকান্ডের পরেও নিবিষ্ট চিত্তে ফারের পাতা চিবোতে ব্যস্ত। আমরা দরজা খুলে ঘর থেকে বেরুতেই লাফিয়ে বনের ভিতর হারিয়ে গেল। শীতকালের ঘুমন্ত সকালের পথ ধরে আমাদের গাড়ীর শব্দ নিতান্ত বেহায়ার মত নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে স্টুয়ার্ড ড্রাইভ থেকে বেরিয়ে গেল। হরিণেরা বিরক্ত হয়ে পালিয়ে গেল পথ ছেড়ে। ক্রিসমাসের আগের দিন একমাত্র গ্রসারি স্টোর ট্রু ভ্যালু বন্ধ হয়ে যাবে একটার মধ্যে। দেরীতে গেলে কিছুই হয়তো থাকবে না।স্টোর থেকে ক্রিসমাসের সন্ধ্যার জন্য বাজার করলাম। সালাদের জন্য অরগানিক কচি সবুজ পাতা, ফ্রেঞ্চ টাড়াগন, সব্জি, মুর্গী, ডিম, মিষ্টি আলু পারস্নিপ ও আনুষঙ্গিক উপকরণ কিনে বাড়ি ফিরলাম। সুজান বারবার জিজ্ঞেস করছিল কি রাধব এত কিছু লাগবে কেন ইত্যাদি। ওকে কি করে বোঝাই যে বাঙালী রান্নাতে অনেক কিছু লাগে। তাছাড়া আমি রাঁধতে যাচ্ছি ফিউশন ডিনার।বাঙালী আর কেনেডিয়ান মিলিয়ে।যাতে ও খেয়ে শান্তি পারে। ওর আবার খুব শখ রান্না দেখার। রাতে খেলাম ভাত, ডাল, সব্জি, মাছ (মাছটীর নাম হচ্ছে রেড স্ন্যাপার)।

বন ফায়ার সন্ধ্যায় বনফায়ার দেখতে গেলাম। মেইন আইল্যন্ডের ক্রিসমাস উদযাপনের অন্যতম আকর্ষণ এই বনফায়ার। ওখানে বিক্রি হচ্ছিল উষ্ণ আপেল সাইডার ওয়াইন ও কফি। সবাই খুব উপভোগ করছিল সন্ধ্যেটা। সবাই আপাদমস্তক গরম কোট ইত্যাদি পড়ে তৈরি হয়ে এসেছে। বনফায়ারের আলোয় চারিদিক আলকিত। আমরা একটু দেরী করে ফেলেছিলাম তাই সাড়ম্বর শুরুটা মিস করেছি। আকাশছোঁয়া আগুণ তখন স্তিমিত হয়ে গেছে। সুজান বেশ হতাশ হয়েছিল। আগেই বলেছি ও আগুণ খুব ভালবাসে। এই যে দুদিন ধরে ও এসেছে সারাক্ষণ আগুনের পাশে বসে গান শুনেছে আর গল্প করেছে। আর একটা জিনিস আদায় করে নিয়েছে আমার কাছ থেকে তা হচ্ছে ইনফরমাল কাউন্সিলিং। যাতে আমি কিছুটা জড়িত হয়ে পড়েছি অন্যমনষ্ক ভাবেই। ক্রিসমাসের সকালে নাস্তা বানাল সুজান, আমি আগুন জ্বালালাম। মেইনে আসার এই কাজটা আমাকে শিখতে হয়েছে । প্রথমদিকে কিছুতেই আগুণ ধরাতে পারতাম না। রীতিমত হতাশা আর উৎকণ্ঠায় ভুগেছি ২০০৭ এর দিকে যখন শুরু করেছিলাম আমার ফ্রনটিয়ার জীবন। এখন মোটামুটি সিদ্ধহস্ত।

বড়দিনের ভোজ রান্না শেষ করে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে উঠোনের ঘাসের উপর হাঁটছিলাম। সরেজমিনে তদন্ত করছিলাম ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি। রীতিমত আতঙ্কিত বোধ করলাম ঝড়ের পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখে। বিশাল গাছের ডালপালা নড়াতে পর্যন্ত পারলাম না। প্রতিবেশী ম্যাগী এসে হঠাৎ উদয় হল । ও গল্প করলো আমার অবর্তমানে কিভাবে বিসি ট্রি কম্পানি তাঁদের উঁচু ক্রেইনে সু উচ্চ গাছের শীর্ষে গিয়ে খণ্ড খণ্ড করে দুটো গাছ সময় নিয়ে কেটে নামাল । পাড়া প্রতিবেশীরা সবাই এসে জড়ো হয়েছিল আমার উঠোনে । এখানে কেউ খুব সহজে গাছ কাটে না। ওরা সবাই গাছ কাঁটার মহোৎসব পর্যবেক্ষণ করেছে। আমি ছিলাম না ভাগ্যিস। থাকলে খুব মন খারাপ হত। প্রতিবেশী ম্যাগী ও টমের সঙ্গ আমি ভালবাসি। ম্যাগি এনথ্রপলজির ছাত্রী, টম ইঞ্জিনিয়ার। দুজনেই বেশ অতিথিপরায়ণ । ও ভেবেছে ক্রিসমাসের সন্ধ্যেটা আমি হয়ত একা কাটাব তাই সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ওদের সাথে ডিনারে যোগ দেবার আমন্ত্রণ জানাল। আমি ওকে বিনয়ের সংগে ধন্যবাদ দিয়ে অপারগতা জানালম। বললাম আমার গেস্ট আছে। ও নাছোড়বান্দা বলল তোমার গেস্টকে নিয়ে এসো। অগত্যা বললাম ঠিক আছে যদি সুজান আসতে রাজী হয় তাহলে অবশ্যই আসব।। সুজান ক্ষীণ আপত্তি জানিয়ে রাজী হয়ে গেল। খুশী হয়ে বলল বাহ তোমার খাবারগুলি পরদিন খাওয়া যাবে। ও হতাশ হয়ে গেল যখন জানালাম আমরা যা রান্না করেছি তা ওদের সাথে শেয়ার করব ।

নিসন্দেহে ক্রিসমাস ডিনার জমেছিল। সব্জির কেসেরোল ডিশ, আনারস-হ্যাম রোস্ট, অরুগুলা সালাদ, চিকেন রোস্ট, পোলাও মাখনে চটকানো আলু সেই সাথে পর্যাপ্ত দ্রাক্ষারস। ক্রিসমাস পার্টি দারুণ জমেছিল। ডিনারের মাঝামাঝিতে সুজান প্রায় মাতাল। এমনকি স্বল্পবাক টমও হঠাৎ করে উচ্ছল হয়ে যোগ দিল তিন রমণীর আলোচনায়। রাত বারটা অব্দি পার্টি চললো। এবার ভাঙার পালা। বাইরে নিশ্ছিদ্র ঘুটঘুটে অন্ধকার। টম ওর টর্চ লাইট দিলা। সুজান ভয়ে অস্থির। মাঝরাতে ওর চেঁচামেচি রাতের শান্তি ছিন্ন করছিল। ওকে একটা ধমক দিলাম। বাড়ি ফিরে আগুণ জ্বালিয়ে দিলাম ওর জন্যে । ও আবার খুশী হয়ে গেলো । আমি আমার ঘরে গিয়ে রেডিও চালিয়ে নিজস্ব নির্জনতায় আবৃত হলাম কোলাহলমুখর রাতের শেষে। (চলবে)

ছবি: গুগল