মানুষ বড় কাঁদছে…

মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও
মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও
মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।

কবি এই সন্তপ্ত সংসারের এমনই ভাষ্যকার। আমাদের সহস্রের সংজ্ঞাহীন উপলব্ধি মুহূর্তেই জীবন্ত হয়ে ওঠে তার শব্দের নিপুন বিন্যাসে। প্রয়াত কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘দাঁড়াও’ কবিতাটি পাঠ করতে গিয়ে এমনটাই মনে হলো।বহু বছর আগে ভবিষ্যতদ্রষ্টার মতো কবি লিখেছিলেন এই কবিতা। আজ সেই লাইনগুলোই যেন আমাদের লন্ডভন্ড বিশ্ব-সংসারে বিপন্ন মানুষের এক নিরন্তর ছবি।সত্যিই আজ মানুষ কাঁদছে। যন্ত্রণায়, হতাশায়, হননে, হিংসায় মানুষের জীবন ছিন্নভিন্ন, অশান্ত, অস্থির। পৃথিবীর মানচিত্র জুড়ে এখন উৎপীড়িত, উদ্বাস্তু, বিপর্যস্ত মানুষের কান্নার ধ্বনি শোনা যায়। দৃশ্যমান হয় রক্তস্রোত। একবিংশ শতাব্দী জুড়ে এই গ্রহের বাসিন্দাদের জীবন বাসিন্দারা এসে দাঁড়িয়েছে গভীর এক খাদের কিনারায়।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন বিপন্ন মানুষ আর মানবতা নিয়েই। পৃথিবীর মানুষেরই নানা অস্থিরতা আর সংঘাতে মানুষের জীবনই ছত্রখান হয়ে পড়েছে। সেই কথাগুলোই সাজিয়ে বলার চেষ্টা।

‘মানুষ’ কথাটা উচ্চারণ করবার সঙ্গে সঙ্গে ইথারের ভেতর দিয়ে কোনো অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে না।আমাদের ‘মানুষ’ ঐতিহাসিক, ধারাবাহিক। এই সভ্যতার প্রত্যেকটি পাঁজর তার নিজের হাতে তৈরী। এই মানুষ তার আশা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন আর আবেগে জোরে সভ্যতার এই কঙ্কালের কাঠামোতে রক্তমাংস যোগ করে তাকে অর্থপূর্ণ করে তুলেছে।দীর্ঘ এক যাত্রায় সে মানুষ পদার্পণ করেছে একবিংশ শতাব্দীতে। কিন্তু মানুষ কি মুক্তি পেয়েছে? পৃথিবীর দেশে দেশে তার জীবন কি নিরাপদ হয়েছে? এই যে মানুষের সুদীর্ঘ ইতিহাস, এর পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় লেখা আছে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ক্লেদ ও মালিন্য। সেই ইতিহাসের পাতার বাইরে যে আলোর জীবন, প্রাণের শক্তি সেখানে কি মানুষের মুক্তি ঘটেছে শেষ পর্যন্ত? এই এতোগুলো প্রশ্নের সম্মিলিত উত্তর একটি-ই-না। পৃথিবী নামক এই গ্রহের জীব মানুষ ও তার জীবন আজো ভাসছে অনিশ্চয়তার দোলাচলে। সংঘাতে হচ্ছে রক্তাক্ত।

কী ঘটছে আমাদের চারপাশে? শুধুমাত্র ধর্মের নামে পাশের দেশ মিয়ানমার থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছে একটি প্রজাতির মানুষ। বাংলাদেশে নারীরা নির্বিচারে শিকার হচ্ছে ধর্ষণের, বহুদূরে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে ঝরছে রক্ত। উদ্ভাস্তু মানুষের মিছিল কেবল দীর্ঘ হচ্ছে ।বাংলাদেশের কোনো ছোট্ট শহর থেকে ইউরোপের বিশাল শহর-কোথাও নিরাপদে নেই মানুষ।  আজ ফ্যাসিস্ট ও যুদ্ধোন্মাদ রাষ্ট্র কাঠামোর হুমকীতে যুদ্ধের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে এশিয়ায়। আর প্রকৃতি? সেও তো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে মানুষের দিক থেকে। আঘাত হানছে ঘূর্ণীঝড়, ভূমিকম্পে লুপ্ত হচ্ছে মানুষেরই সাজানো সংসার, দেশ ভাসছে বন্যায়, বদলে যাচ্ছে আবহাওয়ার রীতি। বিপন্ন মানুষের কান্না থামবে কবে আমাদের কারুরই জানা নেই। মানুষে মানুষে এই হিংসার মন্ত্র লুপ্ত হবার সম্ভাবনাও হয়তো এখন রূপকথার গল্পেই ভালো মানায়।

মানুষের ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সামষ্টিক জীবন, সর্বত্রই এই বিপন্ন সময় আমাদের গ্রাস করতে উদ্যত। কিছু মানুষের দুর্নীতি, লোভ আর আকাঙ্ক্ষার সীমাহীন বিস্তার বিশাল সংখ্যার সাধারণ মানুষের জীবনকে ঠেলে দিয়েছ বিপন্নতার দিকে। ভুল রাজনীতি মানুষের তৈরী সভ্যতাকে এনে দাঁড় করিয়েছে ফাঁসির মঞ্চে। তৈরী হয়েছে ধর্ষক মানসিকতা, লুন্ঠনের লোভ আর মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলবার অধিকার বোধ। সম্পদের সুষম বন্টনের লড়াইয়ের ইতিহাসকে মুছে দিয়ে সতর্কভাবে তৈরী করা হয়েছে ভোগবাদী সমাজব্যবস্থা, যেখানে আকাশ হচ্ছে শেষ সীমা। এই আগুনে পথের রেখা ধরে যেন নিজের গড়া সভ্যতাকেই ভাঙ্গতে মানুষের নতুন যাত্রা। যে মানুষ একদিন উজ্জ্বল ইতিহাস রচনা করেছিল পৃথিবীর বুকে সেই মানুষই আবার তার ইতিহাসের বই পুড়িয়ে দিতে তৈরী।

এমন সব প্রলয়ংকরী প্রবণতা কি একদিনে তৈরী হয়েছে? কখনোই নয়। নষ্ট হয়ে যাওয়া রাজনীতির কাঠামো পণবন্দী করে ফেলেছে পৃথিবীর বিশাল সংখ্যক মানুষকে এই নাগপাশে। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা, চিন্তার অসততা, সংস্কৃতির চর্চাকে প্রত্যাখান করাই মধ্যেই নিহিত আছে আজকে মানুষের বিপন্নতার মূল কারণ।আর তাই মানুষ অসংখ্য মানুষের মধ্যে থেকেও হয়ে পড়ছে একা, স্বার্থপর।তাই বিপদের দানব হানা দিচ্ছে দেশে দেশে মানুষের সমাজে।

মানুষের সভ্যতা ও সংস্কৃতির মূল সুর হচ্ছে প্রাণদ, প্রাণঘাতী নয়। কিন্তু মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার যাদের একচেটিয়া তারাই এই ধংসের নাটক সাজিয়েছে যত্নে। গোটা সভ্যতাকেই তারা ঠেলে দিয়েছে বিপদের দিকে। আর তাদের খেলার অসহায় শিকার আজ মানুষই। যে মানুষ একদিন বরফ যুগ অতিক্রম করেছিল, যারা আগুন আবিষ্কার করেছিলো, যারা বর্বরতার খোলস ছুঁড়ে ফেলে ফুল ভালোবেসেছিলো, যারা লড়াই করেছিলো দু দুটো বিশ্বযুদ্ধে, কেবল আরেকটি যুদ্ধের সম্ভাবনাকে কবর দিতে তারাই আজ বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

এই মানুষকে, তাদের গড়া সমাজকে তাই নিঃসঙ্গ হতে দেয়া যাবে না। মানুষই দাঁড়াবে মানুষের পাশে। আবার লড়াই করবে নিজেদের এই পরিণতিকে পাল্টে দিতে। লেনিন বলেছিলেন, `Life will assert itself’-জীবন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে।আমরা পৃথিবীর বাসিন্দারা সে আশায় পথ চেয়ে আছি।

আবিদা নাসরীন কলি

ছবি: গুগল