নস্টালজিকের গান নিয়ে গল্প…

শেখ রানা (এডিনবরা,স্কটল্যান্ড থেকে)

২০০৯ এ দেশে ফিরে একটু একটু করে গান বানানো শুরু হয় আমার। আমি তো গীতিকার। চারপাশে শব্দ খুঁজতাম আর নিবিড় চাষবাস করতাম। গান বানানোর প্রক্রিয়ায় আদতে সেভাবে ছিলাম না কখনোই। অনেক আগে, যখন আনকোরা হাতে তিনটে কর্ড ধরে গিটার বাজাতে শিখি তখন ভুলভাল সুর করতাম এক-আধটা, আর খালাতো ভাই হাসানকে নিয়ে গাইতাম। কিন্তু স্টুডিয়োতে বসে গান লেখা, সুর করা, কম্পোজিশন শেষে সাউন্ড মিক্সিং এর জন্য রেকোর্ডিস্ট এর দারস্থ হওয়া আর তারওপরে সব গান এর মাস্টারিং করার জন্য চৌকস শব্দ প্রকৌশলী খুঁজে বের করা- এ এক লম্বা পথ। তবুও কি পথ শেষ হয়! তারপর আছে রেকোর্ডিং কোম্পানীর সঙ্গে বসা, স্পন্সর খোঁজা…

লম্বা পথে সবচেয়ে দরকারী রসদ হলো ধৈর্য আর কাজটার প্রতি প্যাশন। এই দুইয়ে শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় বছর পর নস্টালজিক ব্যান্ড এর কাজ শেষ হয়।

আমার হাত ধরেই নস্টালজিকের শুরু। আমাদের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার সামির এর স্টুডিওতে। নস্টালজিকের প্রথম রেকর্ডিং করা গান-বর্ষা অনুভূতি। কিন্তু কাজ শেষ হয় প্রথম পোড়া শহর গানটার। অ্যালবামের প্রথম গানও এটি। ক্রমান্বয়ে রোদ হয়ে ছুঁই, ঘুমায় শহর, আমি যখন স্বপ্ন দেখি, স্যাটেলাইট…একের পর এক গান হতে থাকে নিয়মিত বিরতিতে। তখনও আসলে সে রকম বড় কোনো পরিকল্পনা ছিল না আমার। গানগুলো ভালোভাবে শেষ করাই ছিল মূল লক্ষ্য। 

কম্পোজিশনে প্রথমেই খুঁজে নেই বহুদিনের পরিচিত ছোট ভাই মেধাবী বনি আহমেদকে। ব্লগেই গান নিয়ে অমিত এর সঙ্গে কথা হতো। অমিত সুর করে দেয় ঘুমায় শহর আর আমি যখন স্বপ্ন দেখি। সামির এর ওখানে পরিচয় হয় গিটারিস্ট সামি আর ড্রামার রুবেল এর সঙ্গে। ধীরে ধীরে ব্যান্ড এর আদল পেতে শুরু করে গানগুলো। কিছুদিনের জন্য বেজিস্ট বাপ্পী আসে। ঘুমায় শহর, স্যাটেলাইট আর প্রহরীর মত রাত গানগুলো সামি আর বাপ্পীর যৌথ কম্পোজিশন। গানগুলো যখন প্রায় শেষ, ব্যান্ড এর একটা নাম তো লাগবে। মাথায় চলে এলো ব্লগের নাম। নস্টালজিক। বাহ, এটাই তো ব্যান্ডের স্বার্থক নাম হতে পারে। আমরা তো নস্টালজিয়ার কথাই বলছি সুরে সুরে।

নস্টালজিক ব্যান্ড এর সেলফ টাইটেল এ্যালবাম প্রকাশিত হয় ২০১৫ এর মে মাসে। জি সিরিজ অগ্নিবীণার ব্যানারে। এ্যালবাম এর কভার ডিজাইন মুরাদ এর। নস্টালজিকের গানগুলো আমি কাজ চলাকালী্‌ প্রিয় কিছু মানুষের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছিলাম। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আজ।

প্রাণের বাংলার পাঠকদের জন্য নস্টালজিকের গানগুলো শেয়ার করছি একে একে।

পোড়া শহর

নস্টালজিক ব্যান্ড এর সিডির প্রথম গান। ২০১০ এ নিমতলির সেই ভয়াবহ দূর্ঘটনাই শব্দে ধরি। এই গানটা আমার হৃদয়ের খুব কাছের। গানের কথা আর সুর আমার। বনি আহমেদ এর সঙ্গীত।
পোড়া শহর এর মিউজিক ভিডিও করা হয়েছিল। এক দিনের ভিতর রায় সাহেব এর বাজার এর একটা পরিত্যাক্ত ঘরে। পরে নিমতলিতে কিছু ফুটেজ নেয়া হয়। ভিডিওটাও সংযুক্ত করে দিলাম।

তোমার কি আর দুঃখ পেলে চলে

এই গানের কথাগুলো আমার খুব নিজস্ব। আমার প্রিয় একজন মানুষকে নিয়ে লিখেছিলাম। কিন্তু লেখা শেষ করতে করতে মনে হচ্ছিল আসলে নিজেকেই বলছি। অপূর্ব সুর আর সঙ্গীত করে দিয়েছে বনি।গানটার প্রথম সুর করেছিল আমার বন্ধু রিঙ্কি( ব্লগার অচন্দ্রচেতন)। সেই সুরটাও ভালো ছিল।

স্যাটেলাইট

পারফেক্ট ডেল্টা ব্লুজ কম্পোজিশন। চারপাশের নানা অসঙ্গতি শব্দে ধরার চেষ্টা করেছিলাম। সামি আর বাপ্পীর কম্পোজিশন চমৎকার সঙ্গত করেছে কথা আর সুরের সঙ্গে।

স্যাটেলাইট এর একটা মিউজিক ভিডিও শ্যুট করা হয়েছিল। এতে ব্লগার হাসান মাহবুব অভিনয়ও করেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো মিউজিক ভিডিও-র ডিরেক্টর আর কোনো যোগাযোগ করেনি আমার সঙ্গে।
ফুটেজগুলো আমার কাছে আছে। দেশে ফিরে আর একবার চেষ্টা করবো, কাজটা শেষ করার।

গুচ্ছ ঘাসের সবুজ

এই গানটা একটা মোবাইল কোম্পানির ইকো প্রজেক্ট এর জন্য করা হয়েছিল। থ্যাঙ্ক গড, কাজটা শেষ পর্যন্ত হয়নি। পরে আমি নস্টালজিকের জন্য গানটা নিয়ে নেই। আমার কথা, বনির সুর আর সঙ্গীত। অপূর্ব একটা ব্যালাড। আমার ধারণা গানটা ট্রেইন্ড কোনো ভোকাল গাইলে আরো ভালো হতো।

গেটলক সার্ভিস

আহ! মজার একটা গান গেটলক সার্ভিস। আমি সত্যি গেটলকে বসে লিখেছিলাম, আজিমপুর থেকে মিরপুর-১ এ যাওয়ার পথে। সে বড় মজার একটা রাত ছিল। পরে বাড়ি ফিরে লেখাটা শেষ করে বনিকে দেই সুর আর সঙ্গীতের জন্য। প্রথমে আমি চেয়েছিলাম বব ডিলান এর হ্যারিকেন গানটার আদলে সুর করবো। পরে বনি নিজের মতো করে একটা সুর ধরে আর কম্পোজিশন করে খানিক ব্লুজ আর জ্যাজ এর সংমিশ্রনে।

এই গানের শেষে সামির আর আমার যাত্রী-হেলপার এর একটা ঝগড়া আছে। যারা শুনেছে সবাই এই ঝগড়াটা শুনে বিমলানন্দ পেয়েছে।আইডিয়াটা একদম রেকর্ডিং এর সময় মাথায় আসে। আসতেই সামিরকে বলে রেকর্ড করে ফেলি।

ঘুমায় শহর

ব্লগার স্বদেশ হাসনায়েন এর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই এই চমৎকার লিরিকটার জন্য। সঙ্গে অমিত এর কাছে অসাধারণ বিষাদী সুর এর জন্যও। এই গানটা অপূর্ব ব্যালাড। সামী আর বাপ্পীর যুগল সঙ্গীতে বাঙময় হয়েছে গানটা। আমি আর একটু ভালো গাইতে পারতাম।

ওয়াহিদ ইবনে রেজার সঙ্গে এই গানের মিউজিক ভিডিওর ব্যাপারে সব চূড়ান্ত হয়েছিল। স্ক্রিপ্ট থেকে শুরু করে প্রপস কেনা, লোকেশন ঠিক করা-সব। যেদিন শ্যুট হবে আর যেখানে শ্যুট হবে আগের রাতে সেখানেই অভিজিৎ রায় মারা যায়। কাজটা আর হয়নি পরে।

আমি যখন স্বপ্ন দেখি

এই লিরিকটাও আমার খুব পছন্দের। সুর অমিতের করা। আমি পরে কিছু ইম্প্রোভাইজেশন করেছি। এই গানের কম্পোজিশন । নস্টালজিক যদি অনেক অনেক কাজ করে, তাহলে আমি আবার করাবো। বনিকে দিয়েই করাবো।

মনে আছে, ব্লগে এই লিরিকটা দিয়েছিলাম। ইন ফ্যাক্ট, ব্লগে নস্টালজিকের বেশিরভাগ লিরিকই শেয়ার করেছিলাম। লিরিকটা সবাই খুব পছন্দ করেছিল।

প্রহরীর মত

প্রহরীর মত গানটা আমি অনেক আগে লিখে সুর করে রেখেছিলাম। নস্টালজিকের অ্যালবামের একদম শেষের দিকে এই গানটা কম্পোজিশন করে সামি আর বাপ্পী। ভয়েস টেক নিয়েছিল ইমরুল কায়েস রনি। রনি বাপ্পা ভাই এর স্টুডিওতে অনেকদিন কাজ করেছে। খুব তাড়াহুড়োর ভিতর গানটার ভয়েস নেয়া। তবু ভালো লাগে গানটা। সামির গিটার ওয়ার্ক আর বাপ্পির স্ট্রিং এর কাজ সুন্দর এসেছে গানে।

রোদ হয়ে ছুঁই

রোদ হয়ে ছুঁই র‍্যাগে স্টাইলের গান। রাসেলের কম্পোজিশন। আমি খানিক দ্বিধান্বিত ছিলাম গানটা নস্টালজিকের প্রথম অ্যালবামে রাখবো কিনা। জানিনা কেনো, মনে হচ্ছিল অন্যান্য গানের মেজাজের সঙ্গে গানটা যাচ্ছে না। একটু চটুল মনে হয়। কিন্তু গানটা অনেকেই পছন্দ করেছিল প্রথম শুনে। এই গানটার মিক্সিং করেছে তামিম।

সামির এর স্টুডিওতে বসে পাঁচ মিনিটে সুরে করি রোদ হয়ে ছুই-এর। ডি-বি মাইনর-জি-এ সার্কেল ধরে বাজাতেই সুর পেয়ে গিয়েছিলাম।

বর্ষা অনুভূতি

সবার আগে সুর করা গান বর্ষা অনুভূতি নস্টালজিকের সব শেষ গান সিডিতে। পার্থ’দার স্টুডিওতে বসে লিরিকটা লিখেছিলাম। বৃষ্টি দেখতে দেখতে। পরে বাসায় এসে সুর করি গভীর রাতে। ওই সময় ব্লগে চমৎকার সময় কাটছিল আমার। ২০১০-১১ এর দিকে। রাত জেগে ব্লগিং করতাম আর লিরিক লিখতাম। সবার সঙ্গে চমৎকার মিম্থস্ক্রিয়া হতো। পুরানো সেই সব ব্লগারদের কথা মনে পড়ে। সবাই নিজস্ব পরিমন্ডলে ভালো আছেন আশা করি।

ইউটিউবে নস্টালজিকের প্লে লিস্ট-

https://www.youtube.com/watch?v=lnAjStVkF4c&t=285s

পোড়া শহর গানের মিউজিক ভিডিও

https://www.youtube.com/watch?v=YJRiwNlOcPM

সবাই ভালো থাকুন। নস্টালজিক হোন। নস্টালজিয়ায় আনন্দভ্রমণ হোক আপনাদের।