দ্বিজেন শর্মাঃ একজন নিসর্গের মানুষ

ফারহানা মিলি

সিদ্ধেশরীর খন্দকার গলিতে সদ্যপ্রয়াত দ্বিজেন শর্মার বাসায় বেশ ক’বার গিয়েছি, প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে লেখা আনতে… ২০১২ ও ২০১৩এর সময়টায়… তখন উনার শরীর খুব বেশি ভালো থাকত না… আমাকে অনেক গল্প বলে যেতেন, সেসব দিয়ে আমি একটা মালা গাঁথতাম.. কিন্তু উনার ভাষার যে মাধুরী, প্রকৃতিপ্রেমের যে রস তা কি আর ফুটত আমার লেখায়? তবু থেকে যেত উনার ভাবনাগুলো…

পৃথিবীর ভবিষ্যত নিয়ে খুব ইতিবাচক ছিল না সে চিন্তাগুলো… সভ্যতাই যে মানুষকে প্রকৃতি থেকে আলাদা করেছে বেদনা নিয়ে বলতেন সেসব কথা… মানুষের সভ্যতার বিনির্মাণ প্রকৃতিকে ভালোবেসেই হতে হবে, নইলে যে মানুষ নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবে, সে ভাবনাও ছিল তাঁর বেদনার কারণ.. কেবল আমাদের দেশে নয়, উন্নত দেশগুলোতেও প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্মমতার কথা অনর্গল বলে যেতেন… যে ক’বার গিয়েছি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যেতাম.. রেকর্ডার চালিয়ে দিয়ে রেকর্ড হতে থাকত… এই ফাঁকে উনার স্ত্রী দেবী শর্মা আমাকে মাতৃস্নেহে আপ্যায়ন করতেন…

দ্বিজেন শর্মার প্রতি মুগ্ধতার একটা কারণ যেমন ছিল ওই নিখাঁদ প্রকৃতিপ্রেম, আরেকটা ছিল মস্কোর প্রগতি প্রকাশন…! আমাদের কৈশোরে ও যৌবনের শুরুতে ওই প্রকাশনী থেকে বাংলায় অনুবাদ করা রুশি বইপত্র ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রিয় প্রিয় সব বই.. দ্বিজেন শর্মা দু’দশক ওই প্রকাশনীতেই কাজ করেছেন… তিনিই সহ-অনুবাদক ছিলেন “ভারতবর্ষের ইতিহাস” বইটির… রুশ লেখকদের লেখা বিশালাকারের ওই বইয়ের বাংলা অনুবাদটির প্রচ্ছদ ছিল বাসন্তী রঙের… এখনও চোখে ভাসে… এখন নেই আর আমার কাছে সেটি, কেউ পড়তে নিয়ে ফেরত দেয়নি এভাবে অনেক বই হারিয়েছি…

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে, ১৯৯০ সালে, একজন উপহার দিয়েছিলেন মিখাইল নেস্তুর্থের ‘প্রজাতি জাতি প্রগতি” বইটির বাংলা অনুবাদ, প্রগতি প্রকাশনের… সেটিরও অনুবাদক দ্বিজেন শর্মা… বইটি এখনও আছে আমার কাছে… জাতিসমূহের উদ্ভব ও নৃতত্বের ওপর খুবই সমৃদ্ধ বই… সোভিয়েতের লাল জমানার একটি লাল বই, বাইরের ওই পাতলা লাল কভার ছিঁড়ে গেছে এত বছরে, কিন্তু মূল শক্ত সবুজাভ কভারটি অটুট… রুশিদের বইয়ের কাগজ এত দারুণ যে, অনেক বছরেও কিছু হয় না.. সেসব বই যাদের কাছে এখনও কিছু কিছু আছে তারা বিষয়টা ভালোই জানেন…

আমার এত এত স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই মানুষটি, যিনি বাংলাদেশে বৃক্ষ নিয়ে, পরিবেশ নিয়ে, প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা গুটিকয়েক মানুষদেরও অগ্রগণ্য, তাঁর সঙ্গে কয়েক বারের সাক্ষাৎ তাই আমার কাছে অমূল্য স্মৃতি…

খুবই সহজ মানুষ ছিলেন… জীবনে কখনও কোথাও সুবিধা নেবার চেষ্টা করেননি…. বামপন্থী চিন্তার আদর্শবাদী জায়গাটা ধরে রেখেছিলেন বরাবরই… প্রকৃতি-পরিবেশ নিয়ে নিজের ভাবনাগুলো বলতে গিয়ে বা কাজ করতে গিয়ে কণ্ঠ কখনও তাঁর উচ্চকিত ছিল না, ছিল প্রকৃতির মতোই কোমল, তাঁর লেখার মতোই স্বচ্ছন্দ…. মোট কথা, অ্যাকটিভিজম তাঁর ধাতে সইবার মতো ছিল না… তিনি নিসর্গের মানুষ, নিসর্গে মিশে গেলেন…

আমাকে তাঁর লেখা একটি বই উপহার দিয়েছিলেন, “কুরচি তোমার লাগি”– কুরচি নামের বনকুসুমটিকে ভালোবেসে রবীন্দ্রনাথও কবিতা লিখেছিলেন…. সেটির উল্লেখ করে দ্বিজেন শর্মা লিখেছেন, “কুরচি হোক আমাদের প্রকৃতিপ্রেমের প্রতীক”…

এমন করে মানবাজাতির অস্তিত্বের স্বার্থে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে আর কজনই-বা পারবে? বিনম্র শ্রদ্ধা এই মহান নিসর্গপ্রেমীকে…।

ছবি:গুগল