কলি আমার সব পেয়েছির দেশ

সহেলী বন্দ্যোপাধ্যায়

সহেলী বন্দ্যোপাধ্যায়

সম্প্রতি এক বিশেষ মানুষের কাছে শুনলাম এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটি কলকাতা ।হেঁটে দেখতে শিখুন… ।কথাটি  কতটা গভীর এবং এই গভীরতার রেশ যে শেষ হওয়ার নয় তা প্রতিমুহুর্তে উপলব্ধি করি চারদেয়ালের গন্ডি পেরিয়ে দুপা হাটা  সারা শহর ঘুরে ।| হ্যা , আমর শহর। , আমার শহর কলকাতা । পূর্বে যাকে কলিকাতা বলা হত , যাকে আমরা শহরবাসীরা আদর করে কলিও বলি ।একজন লালিত্যপুর্ণ বাঙালি নারীর যৌবনের সাথে কলিকে তুলনা করা যায় | কলকাতার আকর্ষণ খুব বেশি বলা বাহুল্য । এ শহর আকর্ষনীয় অন্যমাত্রায় ,। এ শহরে নেশা আছে । মায়া আছে । আছে ভালবাসা । মনখারাপ এমনকি সবাইকে আপন করে এক মিলন্ সুত্রে বেঁধে দেওয়ার সঞ্জীবনী মন্ত্র জানে আমার এ শহর। |

kolkata (6)

বেলুরমঠ

 আমার বাড়ির পাশে বেলুড়মঠ ।এমন এক প্রতিষ্ঠান ,।এমন এক তীর্থস্থান,।ভ্রমণস্থান। যে তার সৌন্দর্য্য এক এবং অনবদ্য । অনন্যসাধারণ সারা শহর থেকে এমনকি পৃথিবীর বুকে এই  প্রতিষ্ঠাতা সেই তেজবান বীর্যবান মহাপুরুষ! হ্যা , আমি স্বামী বিবেকানন্দের কথা বলছি ।যিনি একদিন শিকাগোর মাটি কাঁপিয়েছিলেন আমার দেশকে শ্রেষ্ঠ করে । তার বাড়ি সিমলাস্ট্রিটে।  এ শহরের মধ্যেই ।আমার শহরে স্বামীজির শ্রীঠাকুরের বাস ছিল । তার কথায় মনে পড়ে বাগবাজারে রাস্তার মাঝে গিরিশ ঘোষের বাড়ি ।এরকম কত মহান ব্যাক্তিত্বে বাড়ি আছে এ শহরে উপরন্তু তাদের নাম আজও কলকাতার রাস্তা,  গলিগুলি  চিহ্নত হয়ে রয়েছে। – সত্যজিত রায় , উত্তমকুমার , বিনয় – বাদল – দিনেশ আরও কত কে | আমার শহরে কত ইতিহাস দানা বেঁধে আছে। সেই ইংরেজ আমল থেকে শুরু করলে, হিসেব করে শেষ করা  যাবে না । ভিক্টোরিয়া , রবীন্দ্রসদন , ঢাকুরিয়া লেক থেকে পার্কস্ট্রিটের রেস্তোরাগুলো , পার্কসার্কাসের কবরস্থান , উত্তর কলকাতার বনেদী বাড়ি , রাস্তাঘাট , নতুন করে কলকাতার মাঝে  রাজারহাট নিউটাউন , বড় বড় আই টি হাব , ওদিকে হাওড়া স্টেশন , শিয়ালদহ স্টেশন কোনটা  ছেড়ে কোনটা বলি বলুন তো? ?| জোঁড়াসাকো , রবীন্দ্রভারতী ছাড়া  রবিঠাকুর যেভাবে জন্মের দেড়শ বছর পরেও কলকাতা শহরের প্রতিটা রক্তস্রোতে জড়িয়ে আছেন তা  প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। আমার শহর রবিঠাকুরের ভাষায়  চির সাতাশ।  তার বার্ধক্য নেই ।, নেই মৃত্যু।

kolkata (1)

কলকাতা রাস্তা

এতো গেল আমার শহরে চরিত্র বিশ্লেষন | এবার কলির রূপ্ বর্ণনা | Mr. Dominique Tapierre – এর একটি কথা মনে পড়ে  , তিনি কলকাতাকে বলেছিলেন ” City of Joy ” – কথাটি খুব সত্য | মাঝে মাঝে ভাবি কি দিয়ে একথাটির বিশ্লেষন করবো ? তা কি  প্রথম বৃষ্টির পরে  ঝলমলে এক টুকরো রোদের হাসি না বৃষ্টির মাঝে মাঠে মাঠে ছেলেপিলেদের ফুটবল খেলা আর গোল দেওয়া | নাকি ভাবি মহালয়ার ভোর থেকে মোটামুটিভাবে দীপাবলী অবধি যে পুজোর আমেজ থাকে , আমোদ – প্রমোদ , আনন্দ – উল্লাস তার মধ্যে দিয়ে ? পুজোর কয়েক মাস আগে থেকে যে প্রস্তুতি শুরু হয় সঙ্গে মা দুর্গার মর্ত্যে আগমন মিলিয়ে তা বাঙালিকে যথার্থভাবে ‘ Madly Bengali ’ বলার দাবি রাখে | গনেশ পুজো , ঈদ , বড়দিন সমস্ত রকম আয়োজন সব ধর্ম  বর্ণের মানুষের উৎসবে মিলে মিশে একাকার হয়ে বাঙালিকে বিশ্বদরবারে  করে তুলে অনন্য এক জাতিতে | বৈশাখ – জৈষ্ঠ্যের চরম রোদে যখন আমরা বৃষ্টিকে প্রতিরাত্রে স্বপ্নে দেখি মনে পড়ে কোনো সদ্যবিবাহিতা মেয়ের কালরাত্রির অনুভুতির কথা | তারপর বৃষ্টির অদ্ভত সোদাগন্ধ , শরতের মিষ্টি রোদভরা আকাশ , শীতের নরম উষ্ণতা ,কাজের উদ্দ্যম , নবান্ন , পৌষের পিঠেপুলি থেকে সরস্বতী পুজো | এসব কিন্তু অন্য কোথাও মেলা ভার | জানেন , পৃথিবীর সমস্ত জায়গায় Valentine’s Day যেভাবে পালিত হয় তা কিন্তু কলকাতায় একটু অন্যভাবে হয় | কলকাতার Valentine’s Day মানেই সরস্বতী পুজোর দিন | এদিন শহরতলির ওলি গলি , স্কুলকলেজ থেকে শপিংমল এমনকি অফিস কাচারি  সব জায়গার মিষ্টি প্রেমিক প্রেমিকাদের পরস্পরকে নতুন করে ভালবাসার দিন | তারপর কলকাতা রঙিন হযে ওঠে প্রতিবছর কত নতুন রঙে – গলফগ্রীন , জোঁড়াসাকো থেকে রবীন্দ্রভারতী , দক্ষিন থেকে উত্তর , পশ্চিম থেকে পূর্ব সারা শহরে শুধুই রঙের খেলা – দোলউৎসব | এরপর গাজন , পয়লাবৈশাখ – সবাই বলে বাঙালির বারো মাসে তের পার্বণ তবে কলকাতায় বারো মাসে শত পার্বণ | এ শহর তাই দেখে শেষ যায় না

 

পার্কস্ট্রিট

পার্কস্ট্রিট

 এ শহরের পায়ে পা মিলিয়ে হাটলে , শহরের ভিতরই একটা  একটা ছোট্ট পৃথিবী পেয়ে যাই | কলকাতার প্রতিটা ইট পাথর যেন কথা বলে , প্রতিটা রাস্তা , গাছপালা , আকাশ বাতাস সবাই এক অনন্য ভাবে রূপের ডালি নিয়ে আমায় প্রেমে ফেলে দেয়  | তাই কলকাতা   সহজেই যেকোনো ভিনদেশীকে বারবার তার কাছে ফিরে আসার মায়াজালে জড়িয়ে ফেলতে পারে | কলকাতা সুন্দর বেলুড়মঠের শান্তিতে , দক্ষিনেশ্বরের পুজোমন্দিরে , কালিঘাটের মায়ের মধ্যে , উত্তর কলকাতার চপের দোকানগুলোতে , চায়ের দোকানের রাজনৈতিক তর্কবিতর্কে , মানিকতলার মাছের বাজারে , রবিবারের সকালে বাড়ি বাড়িতে লুচি আলুরদমে , হাওড়া স্টেশন এ মানুষের ভিড়ে , নতুন  নিউটাউন এ রাতের আলোকসজ্জায় , দক্ষিন কলকাতার শপিংমলগুলোতে , লেকের ধারে , পার্কে গাছের তলায় মিষ্টি প্রেমে , ভোরবেলায় বয়স্কদের প্রাতঃভ্রমণে , মত্ত ট্র্যাফিক জ্যামে , হঠাৎ অভিমানী  মেঘবৃষ্টিতে , বড় বড় ভোটের মিছিলে – সভায় , শ্রাস্ত্রীয় সঙ্গীতে, ঘোড়ার দৌড়ে, সাহিত্য সভায় এমনকি ভিড়ঠাসা কলকাতার বইমেলাতেও | আমার শহর নিয়ে বলা কোনদিন শেষ হবার নয় তাই গর্ববোধ থেকেও আমি নিজেকে আশীর্বাদ ধন্য মনে করি | কিন্তু প্রদীপের তলায় যেমন একটু হলেও কালি থাকে তেমন আমার শহরও হিংসা বিদ্বেষ এর শিকার হয় , এই কলকাতাতেই নারী সম্মানের প্রতিবাদী কন্ঠ ওঠে ,  হয় কলরব । আসে কিছু নিরীহ মানুষের মৃত্যু কিংবা অবিচার | তবুও রূপে , গুণে , চরিত্রে , বৈশিষ্ট্যে আমার কলকাতা অনন্যা , সে তিলোত্তমা | সারা পৃথিবী চোখে রইলে ও কলকাতা থাকে হৃদয়ে | আমি বলি এ কলকাতার মধ্যে আছে সারা পৃথিবী , এসে দেখতে হবে কারণ কলি আমার ” সব পেয়েছির দেশ ” ||