শারদোৎসবের আগমন

কাকলি পৈত

(দিল্লি থেকে): শরতের সোনা ঝরা রোদ ,শিশির সিক্ত ঘাসে শিউলির স্নিগ্ধ পরশ, হাস্নাহেনা, শিউলির গন্ধমাখা বাতাস,আকাশে শুভ্র মেঘের আনাগোনা, নদীতীরে সাদা কাশফুলে পূজো পূজো গন্ধে মন্দ্রিত সুরলহরী, ‘রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহী’ আমাদের মনে আনে  শারদোৎসবের আগমন বার্তা।আকাশে বাতাসে জলে স্হলে সর্বত্র যেন তার ভূবনমোহিনী রূপ।মা আসছেন এটা ভেবেই মন ছুটে যায় এক অপার্থিব প্রফুল্লতার জগতে। চারিদিকে আলো ,সানাই আর ঢাকের বাদ্যিতে শিশু কিশোরদের প্রাণে দুর্গোৎসবের আনন্দ শিহরণ।  এই ক’টা দিন বই-খাতার সঙ্গে  আর বন্ধুত্ব থাকেনা। আজ শুভ মহালয়া। পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে দেবীপক্ষের শুভ সূচনা। কুমোরটুলিতে প্রতিমা গড়ার কাজ শেষের  ব্যস্ততা।মন্ডপ তৈরীর কাজ প্রায় শেষ। চারিদিক কোলাহলমুখর, আলোকোজ্জ্বল, কেনাকাটার ব্যস্ততা। আনন্দময়ীর আগমনে আনন্দে গিয়েছে দেশ ছেয়ে। আজকের দিনে আশ্বিনের শারদ প্রাতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জলদগম্ভীর কন্ঠের  চন্ডীপাঠে ঘুম ভাঙে বাঙালীর।মহালয়া অর্থাৎ মহান আলোয় দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে চন্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে আবাহন করা হয় পৃথিবীতে। সব অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা ও আরাধনা এই উৎসবের মূল মন্ত্র। আজ মহালয়ার পূণ্য তিথিতে দেবী দুর্গাকে চক্ষুদান করে  দেবীর মৃন্ময়ী রূপ থেকে চিন্ময়ী রূপে  বোধন হয় , দুর্গোৎসবের সূচনা হয়।  গঙ্গাতীরে মানুষ পিতৃপুরুষদের আত্মার মঙ্গল কামনায় তর্পণ ও করেন।প্রাচীনকাল থেকেই চৈত্র মাসে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হত। শ্রীরামচন্দ্র  রাক্ষসরাজ রাবণের হাত থেকে সীতাকে উদ্ধারের জন্য শরৎকালে অকাল বোধনের মধ্য দিয়ে মা দুর্গাকে আবাহন করেন।দেবী দুর্গা মহাশক্তির আধার।সব দেবতাদের সম্মিলিত তেজে তার সৃষ্টি। দানবীয় অত্যাচারে যখন স্বর্গ মর্ত্য বিপর্যস্ত  তখন সব দেবতাদের দেওয়া অস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে দেবী  সব অসুরদের পরাজিত করেন মহিষাসুরকে বধ করেন। দেবীর এই শক্তিরূপ, মাতৃরূপই আমাদের আরাধ্য।তবে তিনি  শুধু ‘মাতৃরূপেণ  সংস্হিতা’ নন।তিনি স্বভাবে আচরণে  আমাদের বাঙালি গৃহের আর পাঁচটা কন্যার মত স্বামী পুত্রকন্যা নিয়ে ঘোর সংসারী। গিরিরাজ হিমালয় মা মেনকার কন্যা উমা সারা বছর পরে পিতৃগৃহে আসেন চারদিনের জন্য। চারদিন পর সকলকে কাঁদিয়ে তিনি ফিরে যান  কৈলাসে শিবের আবাসে।তাকে ঘিরে এই ব্যতিক্রমী চিন্তাভাবনার জন্য বাঙালি জনমানসে কন্যারূপে ও  তিনি পূজিত হন।
শারদীয়া দুর্গোৎসব বাঙালীর প্রাণের উৎসব যা দেশ কাল সীমানার গণ্ডী ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী মানুষের আন্তরিক উৎসব।জাতি-ধর্ম ,ধনী -দরিদ্র নির্বিশেষে সকলেই এই উৎসবের আনন্দের শরিক হন।  দেবী দুর্গার আরাধনা  অন্তরে এক অদ্ভুত প্রাণশক্তির জাগরণ ঘটায় যা সব অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা যোগায়।মায়ের কাছে আমাদের আকুল প্রার্থনা দেশ, সমাজ ,পৃথিবী সবরকম আসুরিক অত্যাচার থেকে মুক্ত হোক।  মানুষের কল্যাণ, সুখ ,শান্তি সমৃদ্ধ হোক।অন্তর হোক নিষ্কলুষ,জাগুক শুভচেতনা,মানবিকতা।অন্তরের  বিরুদ্ধ শক্তিগুলো কাম, ক্রোধ,মোহ এসব কিছুর বিনাশ  হোক।   যেকোনো উৎসবের অন্তর্নিহিত ভাবনা যাই হোক না কেন উৎসব মানেই প্রাণের জোয়ার।মানুষে মানুষে মেলবন্ধন আর সম্প্রীতির সুর। কোন দেশের সমাজের ,সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, পরম্পরাকে  বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার সার্থক প্রয়াস উৎসবের মঞ্চ।অনেক নতুন সৃষ্টির সম্ভার নতুন লেখক, শিল্পীরা জনসমক্ষে পরিচিতি পান, সঙ্গীত ,সাহিত্য সবকিছুই সমৃদ্ধ হয় উৎসবকে কেন্দ্র করে। ছোটবেলায় এই উৎসবের আনন্দগুলো ক’টা জামাকাপড় হল , ক’টা ঠাকুর দর্শন করলাম পরিবারের সকলে মিলে ভালো খাওয়াদাওয়া এসবের মধ্যেই আটকে ছিল। আজ বড় হয়ে সেই আনন্দগুলো আর সেভাবে ফিরে আসে না ।
শুধু মনে হয় আজকের নাগরিক সভ্যতার আত্মকেন্দ্রিক একাকীত্বের জীবনে ‘উৎসব’ শব্দটা যেন
নতুন করে বেঁচে ওঠা। । সব  শেষে বলি’সব দেশে যে সবারই দেশ তফাত শুধু নামে,
এই  পৃথিবী একটাই দেশ ভ্রাতৃত্বের টানে।’
প্রতিবছর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে আমরা যেন উৎসব পালন করতে পারি।শান্তির অমৃতবাণী ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বমানবের দরবারে।
সব ভৌগলিকতার সীমা পার করে  শারদীয়া দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা ও আনন্দ হোক বিশ্বজনীন।

ছবি: গুগল