বৃষ্টি ভেজা মিষ্টি বুড়ি -২

আশিকুজ্জামান টুলু

ড্রইং রুমটায় তেমন কোন আসবাবপত্র নাই বললেই চলে । দুটো পুরোনো আমলের সোফাসেট, একটা অনেক বড় রেডিও, ওটার আবার চারটা পা আছে । একটা বড় মাইক লাগানো গ্রামোফোন যেটায় চাবি দেয়ার জন্য একটা বড় চাবি লাগানো । ঘরের এককোণে একটা পুরোনো দিনের টেবিলল্যাম্প জালানো, খুব কম পাওয়ারের লাইট মনে হলো । আমি বড় লাইট খুজলাম জালানোর জন্য কিন্তু পেলাম না । ভিতরে চলে গেলাম বাকি রুমগুলো দেখার জন্য । প্রতিটা রুমে আলোর খুবই সল্পতা । ঐ অল্প আলোর মাঝেই দেখতে থাকলাম ১৯৫০ সালের সভ্যতা, কালাচার, শিল্প, ছবি । মাস্টার বেডরুমের পেছনের দেয়ালে একজন যুবতীর ছবি, কেন যেন খুব মিল লাগলো দরজায় দেখা ঐ মিষ্টি বুড়ির চেহারার সাথে । হয়তো যৌবনের ঐ বুড়ি । বাড়িটায় ঢোকার দরজা একটাই, পিছনের দিকের রুমগুলি থেকে ব্যাকইয়ার্ডে যাওয়ার কোন দরজা বা ওয়াক আউট নাই । জানালা দিয়ে বিজলীর আলোতে পরিষ্কার দেখতে পেলাম ব্যাকইয়ার্ডের পিছনে বিশাল রাভিন (জঙ্গল) । বেশী দূর দেখা গেলো না, বেশ ঘন রাভিন ।

***
ওপরে দেখার পর বেজমেণ্টে গেলাম । বাড়িটার ভাইব আমার কাছে কেমন যেনো ভারী লাগছিলো, মনে হচ্ছিলো কোন একটা নষ্ট অতীত আছে বাড়িটার । ভালো ঠেকছিলো না । বেজমেণ্টে বেশ ঠাণ্ডা অনুভব করলাম । ফিনিশড বেজমেণ্ট, কার্পেটে মোড়া পুরো ফ্লোরটা, তবে বেশ পুরোনো কার্পেট । কোনরুমেই মানুষ বসবাসের চিহ্ন দেখলাম না । বিছানাগুলো পরিপাটি করে গোছানো । কিচেন একেবারেই পরিষ্কার ছিল ওপরে । নিচের ও ওপরের, দুটো বাথরুমই পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখা, দেখলে মনে হবে ওগুলি বাথরুম না, ছোট দুটো সাজানো ঘর । আমাদের দেখা শেষ হয়ে গেলো, ওপরে উঠে আসলাম ।

***
ঝম ঝম করে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে । ঝড়ের গতিবেগ আরও বেড়ে গিয়েছে । মেঘের গর্জন মাঝে মাঝেই কাপিয়ে দিচ্ছে সব কিছুকে । বাইরের অন্ধকারটা এতোই কুচকুচে কালো আজ যে জানালা দিয়ে অন্ধকারকে মোটেই দেখা যাচ্ছে না । এবার বিদায়ের পালা । আমরা মেইন গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম যেখান দিয়ে ঢুকেছিলাম, ভাবলাম ঐ মিষ্টি বুড়িকে বলে চলে যাবো । কয়েকবার হ্যালো হ্যালো কোরলাম যাতে বুড়ি শুনে গেটের কাছে চলে আসেন ভেতর থেকে । উনি আসলেন না । আমি আমার ক্লায়েন্টকে বললাম গাড়িতে গিয়ে বসতে । উনি চলে গেলেন গাড়িতে । আমি আরও দুয়েকবার ডাকলাম । উনি মনে হয় শুনতে পেলেন না এবং এলেন না । আমি হ্যালো হ্যালো করতে করতে বাড়ির ভিতরে গেলাম । প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ, একে একে চারটা ঘর খুজলাম মিষ্টি বুড়িকে, পেলাম না । হয়তো বাথরুমে গিয়েছেন, বাথরুমের কাছে এসে দেখি বাথরুম খোলা, কেউ নেই । বাসায় এই চারটা বেড রুম, একটা বাথরুম, একটা লিভিং কাম ড্রইং রুম, একটা কিচেন এবং কয়েকটা কাপড় রাখার ক্লজেট ছাড়া আর কিছুই নাই ওপরের তলায় । কেনো যেনো মনে হলো, বুড়ি মনে হয় বেজমেণ্টে গিয়েছে । চলে গেলাম বেজমেণ্টে । একে একে সব গুলো রুম খুজলাম, ফারনেস রুম, সেলারস, ক্রলিং স্পেস, বাথরুম, কিছুই বাদ দিলাম না । কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কোথাও ঐ ৮০/৮৫ বছরের বুড়িকে দেখতে পেলাম না । আমি খানিকটা স্তব্ধ হয়ে গেলাম, ঠিক কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না । মাথার ভিতর চিন্তাটা ঠিকমতো কাজ করছিলো না, একধরনের অবশ অনুভুতির সৃষ্টি হচ্ছিলো সারা শরীরে । কপালে চিক চিক ঘাম হচ্ছিলো । হটাৎ বুকের ভিতরে হৃদস্পস্দন বেড়ে গিয়েছিলো, নিঃশ্বাস নিচ্ছিলাম জোরে জোরে । আমার চিন্তাটা কয়েক ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যে বিদ্যুতের গতিতে অনেক কিছু চিন্তা করে ফেললেও আমার শরীর ততোধিক স্থবিরতায় ভুগছিলো, পা দুটো যেন আইকা আঠা দিয়ে ফ্লোরের সঙ্গে লাগিয়ে দেয়া হয়েছিলো । নড়তে পারছিলাম না । বেজমেণ্টে বুড়িকে না দেখে আমার মনে হচ্ছিলো কতক্ষণে আমি এই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবো । প্রায় দৌড়ে উপরে উঠে এলাম । কোথাও কোন সাড়া শব্দও নাই শুধু বৃষ্টির ঝম ঝম আওয়াজ সাথে মেঘের গর্জন ।

***
আমি অতিপ্রাকৃত কোন জিনিস সেভাবে বিশ্বাস করিনা অথবা নিজে কোনদিনও কোন আকারের কিছুই দেখি নাই । বন্ধুদের কাছে গল্প শুনেছি । ওরা বিভিন্ন আকারের জিনিস দেখেছে । শেলি চা বাগানে চাকরী করার সময় গভীর রাতে বাগানের ভিতর দিয়ে দাওয়াত সেরে নিজের বাংলোতে ফেরার সময় একজন ওর বাইক আটকিয়ে দাঁড়িয়েছিলো, তবে সে ছিল মানুষের আকারের । হায়দার একবার গল্প করলো ও জিন দেখেছে, লম্বায় ১২ ফিট, লিকলিকে সরু পা । আমার ও আমার স্ত্রীর ভীষণ হাসি পেয়েছিল ওর ঐ ১২ ফিট লম্বা জিনের কথা শুনে । ও চলে যাওয়ার পর অনেক হেসেছিলাম, যদিও ওর সামনে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলাম । ইচ্ছা করেনি ওর আবেগে বলা গল্পটাকে নষ্ট করে দিতে । ***
আমি এসে মেইন দরজার কাছে দাড়িয়ে আবার হ্যালো হ্যালো বললাম তবে এবারের হ্যালোর আওয়াজটা কেমন যেনো কিচির মিচির মনে হলো, অর্থাৎ গলা দিয়ে কোন আওয়াজই বের হলোনা । ভীষণ কাঁপা কাঁপা হাতে দরজায় লাগানো লকবক্স থেকে চাবিটা বের করলাম দ্রুততার সঙ্গে, দরজার বাইরে এসে, দরজাটা টেনে ধরে বন্ধ করে চাবি লাগিয়ে দিলাম এবং চাবিটা লকবক্সে রেখে বন্ধ করে দিলাম লকবক্সটা । ঐ কালো অন্ধকারের মধ্যে আন্দাজে পড়ি মরি করে কোনরকমে গাড়ীর দিকে দৌড় দিলাম এবং গাড়ীর কাছে এসে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে বসলাম । একবারের জন্যেও ঐ দরজার দিকে আর তাকাচ্ছিলাম না ভয়ে । সারা শরীর থর থর করে ইতিমধ্যে কাপতে শুরু করে দিয়েছে । চাবিটা কিছুইতেই ইগ্নিশন কি হোলে ঢুকাতে পারছিলাম না, খুজেই পাচ্ছি না কি হোল । যখন পেলাম কি হোল, তড়িঘড়ি করে স্টার্ট দিতে গিয়ে দেখি স্টার্ট হচ্ছেনা গাড়ি । আমার কাঁপা আরও বেড়ে গিয়েছে । আমার ঐ অবস্থা দেখে আমার ক্লায়েন্ট জিজ্ঞাসা করলেন আমাকে যে কি হয়েছে । পুরো ব্যাপারটা উনি মোটেই লক্ষ করেন নাই তাই ওনার মধ্যে কোন ধরনের পরিবর্তন বা ভয় পাওয়ার কোন আলামতই দেখা যায় নাই, উনি একেবারেই নর্মাল । আমি ওনাকে কিছুই বলতে পারলাম না, গলা ভীষণ কাঁপছে, থুঁতনি কাঁপছে ।

***
গাড়ি হটাত স্টার্ট হয়ে গেলো, ব্যাক গিয়ারে দিয়ে চেপে ধরলাম এক্সেলেটারটা, প্রচণ্ড জোরে গাড়িটা ড্রাইভ ওয়ে থেকে বেরিয়ে Curb এর কাছে গাছের সঙ্গে বাড়ি খেলো । আমরা প্রচণ্ড ঝাকি খেলাম । বুঝলাম পিছের বাম্পার খতিগ্রস্থ হয়ে গিয়েছে । আমার কোন হুশ নাই, বের হয়ে ঐ অন্ধকারের মধ্যে দেখার সাহস নাই কি হলো বাম্পারে । গাড়িটা আবার একটু সামনে নিয়ে গাছটাকে কাটিয়ে হুশ করে বের করে টান দিলাম ভীষণ জোরে । আমার ক্লায়েন্ট আমার কার্যকলাপ দেখে ভীষণ আশ্চর্য হয়ে কয়েকবার জিজ্ঞাসা করলেন কি হয়েছে আমার । আমার গলা দিয়ে একটা আওয়াজও বের হচ্ছিলনা বলে আমি কিছুই বলতে পারি নাই । প্রচণ্ড জোরে গাড়ি চালাতে থাকলাম ।

***
চারিদিকের নিকষ কালো অন্ধকার আর বিরামহীন বৃষ্টির ঝকঝমানি আমার অনুভুতিকে একেবারেই প্যারালাইজড করে দিয়েছিলো । বার বার একটা কথাই মনে হচ্ছিলো, ঐ মিষ্টি চেহারার বুড়ি কোথায় উধাও হয়ে গেলো । অতো বৃষ্টির মধ্যে আমাদের বাড়ি দেখতে দিয়ে ও কোথায় যাবে?? ঐ রকম বয়স্ক একজন মানুষ প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টির মধ্যে বের কিভাবে হবে অথবা বাসার কোন জায়গায় লুকাবে যে আমি খুজে পাবোনা?? কেনই বা লুকাবে?? ঐ বাড়িতে ঢোকার দরজাও তো একটাই ছিলো । আমি তাহলে কি ভুল দেখেছি? কোনভাবেই হিসাব মিলাতে পারছিলাম না ।

***
ঐ বাড়িটা মার্কেটে আরও প্রায় ১০ মাস ছিল কিন্তু বিক্রি হয় নাই । বছর দুয়েক পরে একবার যাওয়া পড়েছিলো ঐ দিকটায়, দেখেছিলাম বাড়িটা পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে ছিলো, জানালা গুলো বড় বড় কাঠের টুকরা দিয়ে সিল করে দেয়া হয়েছিলো । কত বছর পর এই মাস তিনেক আগে আবারও আরেকবার গিয়েছিলাম ঐ পাড়াটায়, ঐ বাসাটা আর নেই, ওখানে এখন বিরাট একটা নতুন অট্টালিকা হয়ে গিয়েছে । হয়তো আমি না লিখলে কেউ জানতেই পারতো না যে সেদিনের মিষ্টি বুড়ি এক নিমেষেই শুধু মাত্র আমার চোখকে ফাকি দিয়ে মিলিয়ে গিয়েছিলো আঁধারে।

ছবি: গুগল