আমি এক যাযাবর…

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

কনকচাঁপা

নানা বাড়ি থেকে দাদাবাড়ি যাবো। কয়দিন ধরে নানীবুজি নানারকম খাবার বাঁধাছাধা করছেন। আম্মাকে ঘিরে তার ভাইবোনেরা, তাদের সবার চোখেমুখেই বিদায়ের সুর। নানীবুজি হাসিমুখেই সব গোছাচ্ছেন। হাসি ছাড়া তাকে কখনোই দেখা যায়না। কেন? অনেক বেশী দুঃখ ঢাকবার প্রয়াস? হয়তো হ্যাঁ হয়তো না। নানাভাই একটার পর একটা বাজার সদাই আনছেন তার বড় মেয়ের জন্য। হঠাৎ সেই বিদায়ের ক্ষন উপস্থিত। বাড়ির বাইরে গরুর গাড়ি এসেছে। নানীবুজি গাড়োয়ান এর খাবার গুছিয়ে দিচ্ছেন। আমরা গরু দুটোকে দেখছি। আমার ভাবনাগুলো সবসময়ই অন্যরকম। আমি দেখছি এই জীর্ণ শীর্ণকায় গরু এই পাঁচ মাইল রাস্তা গাড়ি কাঁধে নিয়ে যাবে? আহা।

আমার মা

বাড়ির ভিতরনীরব কান্নার আভাস, সবাই চোখ মুচছে। শেষ মুহূর্তে মিন্টুমামা তার প্রিয় ডায়েরি টা দিয়ে দিলেন যা এতদিন কব্জা করা অবিশ্বাস্য ব্যাপার ছিলো। তাতেই এতক্ষণে আমার কান্না পেল। কারণ আমি আসলে দাদাবাড়ি যাওয়ার জন্যই অস্থির। তার ও কারন হল সারাবছর পড়াশোনা করেও ছুটির সময় নানাবাড়ি এসে আবারও পড়াশোনা করতে হয় বাধ্যতামূলক। কারন নানাভাই পড়াশোনা ছাড়া আর কিছুই বোঝেননা। গরুর গাড়িতে নানীবুজির শাড়ি জড়িয়ে দেয়া হল। আম্মা গাড়িতে উঠে বসলেন। বড়বোন পারুলাপা নানাবাড়ি থেকেই পড়াশোনা করেন। আমরা যখনই নানাবাড়ি থেকে দাদাবাড়ি বা ঢাকায় চলে আসি তখনই আপা বিদায়ক্ষনে কোথায় যেন লুকান। তাকে খোঁজার বৃথা চেষ্টা বাদ দেয় সবাই। আম্মা গাড়িতে উঠলে নানীবুজি গাড়ির কিনার ধরে শক্ত করে দাঁড়িয়ে অশ্রু পাত করতে থাকেন, আম্মাও। সবাই নিশ্চুপ। একসময় গাড়োয়ান হাঁক ছাড়েন, বাপুরে —–এহন যাত্রা না করলে রাইত হয়া যাবো বাপু আম্মাজান, গাড়ির থিন সয়রা দাড়ান লাগবি গো! নানাভাইয়ের ধমক খাওয়ার আগেই নানীবুজি গাড়ির গা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেন। শুরু হয় গাড়ির চাকার ক্যাচক্যাচ ঘোড়া। গাড়ি গোসাইবাড়ি স্কুল মাঠ পেরিয়ে মাঠের মোচড় পার হলে হয়তো নানীবুজি ঘরে যান। আমি গাড়ির সঙ্গে হেঁটে রওনা দেই। গাড়ির ভেতর দম বন্ধ হয়ে আসে। আর গাড়ির যে গতি তাতে তার পাশে পাশে হেঁটে যাওয়া কোন ব্যাপার না। গাড়ির বিশাল বিশাল চাকা, তাতে আলকাতরার প্রলেপ। সেই গন্ধটা বড়ই মাদকতায় ভরা। কোন সময় আম্মা গাড়ির ভেতর থেকে হাঁক ছাড়েন। কনা রতনা তোরা ভেতরে আয়। মায়ের ডাক উপেক্ষা করার রীতি আমাদের ছিলো না। অগত্যা গাড়িতে উঠে বসি, এবং হয়তো সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ি। দুপুরে রওনা করলে সন্ধ্যা নাগাদ দাদাবাড়ি পৌঁছে যেতাম। দেখা গেল আমরা পৌছনোর আধাঘন্টা পর মিন্টুমামা আম্মার একটা শাড়ি প্যাকেট করে নিয়ে হাজির! আম্মা নাকি ফেলে এসেছিলেন! হাহাহাহাহা। এগুলো সব বাহানা সবাই বুঝি এবং আনন্দিত হই। এই যে গড়ুর গাড়ির যাত্রা! তা কে অতিক্রম করা, ভুলে যাওয়া একজীবনে সম্ভব? কখনোই না। এজীবনে কত জায়গাতেই দরকারে অ-দরকারে যাত্রা করলাম। যেন ভ্রমনই জীবন। ব্যাপারটা এমন যে রাতে চিটাগং ক্লাব এ গান গেয়েই বাসে ঢাকা রওনা হয়ে ঢাকা বুড়িছোঁয়া ছুঁয়ে গাজীপুর অনুষ্ঠান করে কোন এয়ারপোর্ট এ কাপড় বদলে রওনা দিলাম আমেরিকা। বাচ্চারা তার দাদীনানীর কাছে। আমি মেকআপ ও অশ্রু মুছে প্লেনে চড়ে অঝোরে কাঁদছি কিন্তু মন পড়ে আছে গরুর গাড়িতে। অনেক বছর হল এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে আসা যাওয়া করি, সেটা অদ্ভুত বড় একটি প্লেন। দোতলা প্লেন, মনে হবে চারতলা একটি দালান। অতি আধুনিক একটি উড়োজাহাজ। তার ফার্সট ক্লাস দোতলায়। ওয়াইফাই সংযুক্ত উড়োজাহাজটিতে চড়লেই আমার মনে যাবতীয় দুঃখ এসে ভর করে। পাইলট, ক্রু, সব কিছু দেখেই মনের অজান্তে ভেসে ওঠে অতি দরিদ্র গাড়োয়ান নানাকে, তার ছেড়া গামছা, তার কোটরাগত চোখ, ক্ষুধা পেটে তার গপগপ ভাতের লোকমা তার চিরাচরিত খালি গোড়াফাটা থ্যাবড়া পা, তার তেলতেলে হাতের লাঠি, তার সীটের পাশে রাখা হুক্কা! আমি হয়তো একটু পাগলই আছি! নাহলে এইসব ভাবনা এভাবে এসে জোড় বাঁধে? একজীবনে যাযাবর এর মত ঘুরে ঘুরে কত কিছুই না দেখলাম! আলহামদুলিল্লাহ।