নিশিদিন ভালোবাসা

সুলতানা শিরীন সাজি

কাল রাতে আফগানী এক মেহেদী সন্ধ্যা হচ্ছিলো পালকী রেষ্টুরেন্টে। নীলা আপা আর সূচি এসেছিল ,ওদের সঙ্গে বসে আফগানী পরীর মত সুন্দর মেয়েদের নাচ দেখছিলাম। পরী নিয়ে যে কল্পনা ছিল ছোটবেলা থেকে ,আফগানী মেয়েদের দেখার পর তা মিলে গেছে। এত সুন্দর চুল,এত সুন্দর গায়ের রং, এমন সরলতা ভরা হাসি। এমন কথা ভরা চোখ।

ওদের সংস্কৃতিতেও নাচ আছে। যে কোন আনন্দ অনুষ্ঠানে ওরা নাচে,নিজস্বতায়। অদ্ভুত শান্ত ছন্দ। কোন তাড়াহুড়া হুলুস্থুল নেই,উদ্দামতা নেই। ছেলে মেয়ে হাত ধরে নাচছিল যখন,মনে হচ্ছিল নাচ দেখছিনা, পাহাড়ের কোল বেয়ে ঝর্নাধারা নামছে, তা দেখছি। এত নিটোল সুন্দর। হাত দুলিয়ে ,চোখে চোখ রেখে নাচছে। মানব মানবীর চিরন্তন বোধ যে প্রেম ,তা যেনো শুধু ওদের। ওরা যেনো স্বর্গ থেকে নেমে আসা দেব দেবী।

আমাদের ছোটবেলায় যখন গ্রামে গেছি, যে কোন অনুষ্ঠানে ,গ্রাম্য গীত গেয়ে মহিলাদের নাচতে দেখেছি। দিনে দিনে সেইসব আনন্দঘন সময় থেকে দূরে এসেছি আমরা। এখন হিন্দী গানের সঙ্গে উদ্দাম নাচ হয়। কোনো গান ,কোনো সুরের সঙ্গে এখানে আমার কোন বৈরীতা নেই। কিন্তু নিজস্বতায় সব কিছু বেশি সুন্দর লাগে।প্রত্যেক দেশ এর জাতির আলাদা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য থাকে। সেটাতেই সে মানিয়ে যায়।

আমরা আলোচনা করছিলাম ,কেনো আমাদের কোন অনুষ্ঠানে আমরা এমন নিটোল আনন্দ করতে পারিনা। সবাই মিলে হাত ধরে ঘুরে ঘুরে নাচতে পারিনা? এমন তো না ,আমাদের দাদা ,নানা নানীরা এর সঙ্গে পরিচিত না।যে কোনো আনন্দ তো এমন নির্মল হওয়া উচিত।সবাই মিলে মিশে একাকার হয়ে যাওয়া বোধ। স্মৃতিতে জুড়ে যায় এই নির্মল আনন্দরাশি।

আমার মা

অনুষ্ঠান শেষ হয়ে সবাই চলে যাবার পর বসেছিলাম। যে মেয়েটির বিয়ে ,ওর মা আর নানী,দুজনের কেউ মাদার,ফাদার,ব্রাদার আর সিস্টার ছাড়া তেমন কোন ইংরেজী জানেনা। দাদী তো অনর্গল পশতু বলে যাচ্ছিলো। আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে কত কথা বললেন। একটা শব্দ জানিনা অথচ সব বুঝলাম। বুঝলাম উনি বলছেন, উনি ইরানের মেয়ে , বিয়ের পর আফগানিস্থান এ থেকেছেন। যুদ্ধে সব হারিয়েছেন,বাড়ি ঘর সব। পালিয়ে এসেছেন। গলার সুন্দর এক হার পরেছিলেন। দেখিয়ে বলছিলেন, পাথর কিছু হারিয়ে গেছে। একটা একটা করে দেখাচ্ছিলেন। পড়নের অদ্ভুত কালো এক নেটের কামিজ,সুন্দর বলতেই, বললেন, ইরান থেকে। এই ইরান শব্দটা বলার সময় বৃদ্ধা মহিলার চোখ ষোল বছরের কিশোরীর মত ঝলমল করছিল। মু্খের হাসিটাই অদ্ভুত এক ঝিলিক।

আহা দেশ। প্রিয় জন্মভূমি। একদিন আমার বয়স হবে যখন ,যদি বাঁচি, যদি এই বৃদ্ধার মত মুখে অজস্র বলিরেখা হয়! আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করলে ,আমিও হয়তো আমার পড়নের শাড়ির গল্প বলবো। আমার দেশের গল্প বলবো।আমার মায়ের কথা বলবো। বলবো রবীন্দ্রনাথের কথা। কে শুনবে তখন আমার কথা?

মহিলার সামনে দাঁড়িয়ে আমার খুব মায়ের কথা মনে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল একটু জড়িয়ে ধরি।কি আশ্চর্য্য, উনি মনে হয় মনের ভাষা বুঝে ফেললেন। আমাকে বুকে জড়িয়ে আদর করলেন, গালে চুমু দিলেন। আমার মনে হলো আমি যেনো মায়ের আদর পেলাম। চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো।

আর কোনদিন মায়ের সঙ্গে দেখা হবেনা। মাকে জড়িয়ে ধরা হবেনা। কি শূন্যতা বুকের ভিতর। মনে হলো মানুষ থাকেনা, ভালোবাসা থাকে। আদর থাকে। কোনো না কোনো ভাবে আমরা ভালোবাসা পাই।প্রিয় মানুষরা কত দূরেই বা যেতে পারে আমাদের ছেড়ে? ভালোবাসার শক্তি মানুষ থেকে মানুষে এভাবেই ছড়ায়। নাহলে এভাবে এত ফিলড লাগে কিভাবে অন্য একজন মায়ের মত মানুষের আদর পেয়ে।মানুষেরূ শরীর নাহয় চলে যায়। আত্মা তো থাকে। যে কোন ভাবেই প্রিয়জনদের ভালোবাসা এভাবেই শক্তি হয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। নাহলে যে শিশু জন্মের সময় মা কে হারায়,সেও তো বাঁচে। ভালোবাসা পেয়ে বাঁচে। ভালোবাসা হলো সেই  শক্তি যা শেষ হয়না। আবর্তিত হয়।

মা শাক বাচছেন।

আজ কেনো যেনো মনে হয়। যেসব তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারনে আমরা কষ্ট পাই,দুঃখ পাই। তা থেকে সরে এসে,যারা ভালোবাসে,যারা আনন্দ দেয়, তাদের কাছেই থাকা উচিত।যারা আমকে ভালোবাসতে চাইছেনা, বা আমার সঙ্গ চাইছেনা তার থেকে দুরেই নাহয় থাকি।

জীবনটা এত সুন্দর কিন্তু অনেক ছোট।এই ছোট্ট জীবনটাকে আমরাই পারি আনন্দময় করতে।

যেই ছবি দেখলে কষ্ট হয়। তা নাই দেখি।যে লেখা পড়লে মন খারাপ হয় , তা নাই পড়ি। শুধু কাউকে যেনো ছোট না করি।যে যার জায়গায় থেকে যতটুকু সম্ভব করি,মানুষের জন্য।

দিন শুরুতে যেমন আনন্দিত হই আর একটা দিন দেখার কথা ভেবে।এই বোধটা যেনো না ভুলি, একদিন একটা সূর্যোদয় তো হবেই যেদিন আমি থাকবোনা।

কিচ্ছু থেমে থাকবেনা।

কিছুই থেমে থাকেনা।

কে আমাকে কি বললো, কে কি বললোনা।এইসব না ভাবি।

আমাদের প্রতিটা দিন নাহয় এভাবেই শুরু হোক।কাউকে দুঃখ যেনো না দেই। বুঝে অথবা না বুঝে। আগামী কালের সূর্যোদয় জানে, কে থাকবো আর কে থাকবোনা !

ভালোবাসা বিলাই সবাই। একথা খুব বিশ্বাস করি, শুধু ভালোবাসাতেই সব সম্ভব।সব…।

ছবি: লেখক