পুড়ছে বই নিষেধের আগুনে

নিজের শহরেই এখন প্রাণসংশয় লেখক ইয়াহিয়া আবাদের। ‘ক্রাইম ইন রামাল্লা’ নামে তাঁর চতুর্থ উপন্যাস ক্ষেপিয়ে তুলেছে শাসক আর রাজনীতির লোকজনকে। তাঁর ফেসবুক-দেওয়ালে অকথ্য, অশ্রাব্য খিস্তিখেউড়। রাস্তায় পেলে সবাই মিলে পিটিয়ে মারার হুমকি। লেখা হয়েছে, যে হাত দিয়ে এই লেখা বেরোয়, কেটে নেব সেই হাত। শহরের যে বই-দোকান আর লাইব্রেরিই তোর বই রাখবে, জ্বালিয়ে দেব আগুনে। প্রশাসনের বক্তব্য, আরবি ভাষায় লেখা এই উপন্যাস অনৈতিক, অশ্লীল কথায় ভর্তি। অতএব, নিষিদ্ধ হলো এই বই। স্তম্ভিত লেখক দেখছেন, তাঁর চেনা শহর রামাল্লা বদলে যাচ্ছে।
জেরুজালেম থেকে মাত্র দশ কিমি দূরের এই জায়গাটা প্যালেস্তাইনের অন্যতম বাণিজ্যনগরী।

ইয়াহিয়া আবাদ

একুশ শতকে ক্রমশ সেখানে বাড়ছে ব্যবসায়িক পরিকাঠামো। ভারত, জাপান, জার্মানি, আর্জেন্টিনা— বহু দেশের দূতাবাস এই শহরেই। এক দিকে কনস্ট্রাকশন বুম, অন্য দিকে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পেও তুমুল বৃদ্ধির স্বপ্ন দেখে রামাল্লা। সেই শহর এবং পুরো পশ্চিম তীর জুড়েই সব বুকস্টোর্স থেকে উপন্যাসের কপি বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুনতে পেয়ে পথে নেমেছে ঝামেলাবাজরাও। দোকান থেকে বই তুলে, ছিঁড়ে কুটিকুটি করে জ্বালিয়ে দিচ্ছে আগুনে।
ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র-হামলার ভয়ঙ্কর দিনগুলিতেও লেখক, শিল্পীদের কণ্ঠরোধ করেনি এই শহর। প্যালেস্টাইনের গাজা স্ট্রিপ বা অন্যান্য জায়গা থেকে জেরুজালেম যেতে বিশেষ অনুমতিপত্র লাগে, রামাল্লায় লাগত না। ইজরায়েল মূল রাস্তাকে এড়িয়ে জেরুজালেমের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের একাধিক বাইপাস তৈরি করেছিল। জমি নেওয়া হয়েছিল রামাল্লার অধিবাসীদের কাছ থেকে। জমি চলে গেল, চাকরির সুযোগও প্যালেস্টাইনে তখন বিশেষ নেই। ২০০০ সাল থেকেই তাই রামাল্লার অধিবাসীরা ‘শুধুমাত্র ইজরায়েলিদের জন্য’ লেখা বাইপাসগুলিতে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখায়। এক দুপুরে ইজরায়েলি যুদ্ধবিমান ছেয়ে দিল রামাল্লার আকাশ। শহরে রোজ কারফিউ, সেখানকার টিভি স্টেশন ইজরায়েলি সেনার দখলে। তবু রামাল্লা শহরকে স্তব্ধ করা যায় নি। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) একচ্ছত্র নেতা ইয়াসের আরাফাত তখন সপরিবারে গাজা স্ট্রিপে থাকেন, তিনি অফিস খুললেন এই রামাল্লা শহরে। আজও তাঁর সমাধিসৌধ এই শহরের অন্যতম দ্রষ্টব্য। ২০০৫ সালে রামাল্লা আর একটা ব্যাপারে রেকর্ড গড়েছিল। এখানকার মেয়ে-স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা, রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মের জ্যানেট মিখাইল ভোটে জিতে শহরের মেয়র হয়েছিলেন।
এই শহরের আপাত-অদৃশ্য ভারী পাথরটাকেই সাহিত্যে তুলে আনতে চেয়েছিলেন ২৮ বছর বয়সি লেখক ইয়াহিয়া আবাদ। এরই মধ্যে বেরিয়ে গিয়েছে তাঁর চার-চারটি বই। নিষিদ্ধ উপন্যাস ‘ক্রাইম ইন রামাল্লা’ এই শহরের তিন তরুণ রউফ, নুর আর উইসাম-এর গল্প। ইজরায়েল-প্যালেস্টাইনের রক্তঝরা ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে ওদের জীবন। ২০০০ সালে এরা তিন জনই নেহাত শিশু। বড় হয়ে উঠতে উঠতে দেখেছে, দুই দেশের যুদ্ধে না চাইতেই, অজান্তেই ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে তারা, আপাত-স্বাধীনতার মধ্যেই কাটাতে হচ্ছে নির্বাসিত জীবন। এখানে মুখে জাতীয়তাবাদ আর স্বাধীনতার বুলি কপচায় সবাই, কিন্তু বাঁচার পরিবেশটা অনুপস্থিত। মানুষজন বাইরে দেখায় যেন কত না উদার প্রগতিপন্থী, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবাই রক্ষণশীলতার ঢিপি।
গ্রাম থেকে রামাল্লার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে রউফের দেখা হয় একটি মেয়ের সঙ্গে। দেখা হয়, কথা হয় না। ভাল লাগে, বলা হয় না। রউফ তার নামটাও জানে না, মনে মনে মেয়েটির নাম দেয় ‘দুনিয়া’। ভালবাসাহীন এই শহরে ও-ই তার স্বপ্নের দুনিয়া! নুর নামের তরুণটি শহরে এসেছে জীবন বদলাতে। সে সমকামী, ভালবাসার পুরুষটির সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে সদ্য, ভগ্নহৃদয় তাই। ‘অন্য রকম’ যৌনতাও এখানে বদ রগড় আর অত্যাচারের ইন্ধন। উইসাম নামের সদ্য-যুবাটির বরং ধোপদুরস্ত চাকরি, পয়সাওলা নিশ্চিন্ত জীবন ছিল। তারও মেয়েবন্ধুটি ঘটনাচক্রে খুন হয়ে যায়, জীবনটা হয়ে যায় তছনছ। প্রেমহীন এক শহরে পাথুরে বেঁচে-থাকার বোঝা টেনে চলে তিন তরুণ। তিন, নাকি তেত্রিশ? নাকি তিনশো তেত্রিশ? সংখ্যা তো নেহাত প্রতীকী। ইয়াহিয়ার উপন্যাস এঁকে চলে এই সময়কার তরুণ প্যালেস্টানীয়দের হতাশাচিত্র।
তা হলে বই নিয়ে এত তোলপাড় কেন? সমস্যাটা অন্যত্র। ইয়াহিয়া আবাদ তাঁর উপন্যাসে করুণ বেহালা বাজাননি। বলেননি দেখো আমার শহরটা খারাপ, আমার সরকার ওই করতে দিচ্ছে না। বরং রোজকার দমবন্ধ ক্লস্ট্রোফোবিয়াটাকেই তুলে এনেছেন উপন্যাসের কাহিনীতে। পাতায় পাতায় গোটা প্রজন্মের চাপা রাগ। সেই রাগ ফুটে বেরিয়েছে ব্যঙ্গ-উপমায়, ইমেজে। রামাল্লার রাস্তায় নুর দেখে ইয়াসের আরাফাতের ছবি, পোস্টারে তাঁর হাতে বিরাট মেশিনগান। নুরের মনে হয়, মহান জননেতার হাতে ওটা উদ্ধত আগ্নেয়াস্ত্র নয়, উদ্যত পুরুষাঙ্গ! এক সমকামী তরুণের অন্তরদাহ এ ভাবেই প্রতিরোধ গড়ে গণ-আইকনের হিস্টিরিয়ার সামনে।
এই সব ‘অন্য রকম’ উপাদানের মধ্যেই বোধ হয় বিষ খুঁজে পেয়েছে প্রশাসন। ইয়াহিয়াকে বলা হয়েছে, তোমার কলমে যৌনতা, স্বমেহন, আছে অপ্রিয় রাজনৈতিক মতামত। তাই বই নিষিদ্ধ। প্যালেস্টাইনের লেখক সঙ্ঘের প্রধানও সমালোচনা করেছেন বইটির, ক্ষিপ্ত হয়েছে হামাস। রামাল্লার বুক ক্লাবের সদস্যরা ইয়াহিয়ার বই নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু খুনের হুমকি পেয়ে সভা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। এমনকি বই হাতে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো যাচ্ছে না ওই শহরে।

সাহিত্য ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
ছবিঃ গুগল