শিশুরা মানুষ হোক আলোর ঝর্ণাধারায়

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী
লেখক

শ্রাবন্তীর মনটা সারাদিন ভার হয়ে আছে। মায়ের বুকে লেপ্টে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট শ্রুতি। শ্রাবন্তীর পৃথিবী জুড়ে এখন শুধু তার মেয়ে। মাতৃত্বকালীন ছুটির আজই শেষদিন। কাল থেকে মেয়েকে সারাদিনের জন্য রেখে কাজে ফিরতে হবে। শ্রাবন্তীর শাশুড়ি কিছুদিনের জন্য থাকবেন বাচ্চার দায়িত্বে। তারপরে হয়তো সাপোর্ট স্টাফের কাছে রেখেই অফিস করতে হবে। বাচ্চাকে অভ্যস্ত করতে তাই বেশিদিন ব্রেস্টফিড করায়নি শ্রাবন্তী। টিনের দুধ আর সিরিয়ালই ভরসা। সঙ্গে বাড়ির খাবার একটু একটু করে খাওয়া শিখাতে হবে। বুকে এখনো প্রচুর দুধ এলেও ফেলে দিতে হয় শ্রাবন্তীর তখন একটু খারাপই লাগে। রীতা, শ্রাবন্তীর ছেলেবেলার বন্ধু। রীতা যখন মা হলো বাড়িতে বাচ্চা দেখার কেউ ছিলো না। ছোট বাচ্চা ছেড়ে কাজে কীভাবে কাজে যাবে – পুরো ছুটিটাই এই দুশ্চিন্তায় কেটেছিলো। বুকে দুধ আসতোনা। ডাক্তার বলেছিলো অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা থেকেই এমন হচ্ছে। বাধ্য হয়ে ফিডার ধরাতে হলো বাচ্চাকে। সহকর্মী নাতাশার কাছে শ্রাবন্তী শুনেছিলো, সন্তান জন্মের দশ / বারোদিন পর ওর নাকি নিপলে বা স্তনের বোঁটায় ইনফেকশন হয়ে গেছিলো। সেই থেকে আর বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ায়নি ভয়ে। মোটাসোটা, গোলগাল বাচ্চা। কিন্তু অল্প জ্বরজারিতেই দুর্বল হয়ে পড়ে। আজকের যুগে প্রতিদিন বাড়ছে কর্মজীবী মায়েদের সংখ্যা। আগেকার দিনের মায়েদের মতো একান্নবর্তী পরিবারে বাচ্চা মানুষ করার সুবিধাটুকু এখন নেই বলা চলে। শ্রাবন্তী, নাতাশা বা রীতার মতো কর্মব্যস্ত শহুরে মেয়েদের প্রায় সবারই সন্তান জন্মের পর ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির পর শুরু হয় এক নতুন যুদ্ধ। নিউক্লিয়ার পরিবারে বাচ্চা দেখভালের জন্য বিশ্বস্ত কাউকে পাওয়া যে কী মুশকিল তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। যারা সৌভাগ্যবান তারা হয়তো মা, শাশুড়ি বা কাছের কোনো আত্মীয়কে পেয়ে কিছুটা নিশ্চিন্তে কাজে যেতে পারেন। তারপরও কী মায়ের চিন্তা দূর হয়? শিশুকে “ব্রেস্ট ফিড” বা বুকের দুধ পান করানো নিয়েও পড়তে হয় সমস্যার মধ্যে। কর্মক্ষেত্রে দিবাযত্ন কেন্দ্রের সুবিধা থাকলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানে তো আর ক্রেশ বা ডে – কেয়ার ব্যবস্থা থাকেনা। ফলে ঝামেলা এড়াতে অনেক মা-ই শিশুকে টিনের দুধ, টিনের সিরিয়াল খাওয়াতে শুরু করেন। প্রথমত, প্রত্যেক মায়ের অবশ্যই জানা জরুরী যে, বুকের দুধ শিশুর জন্মগত অধিকার। সে অধিকার থেকে কোনো শিশুই যেন বঞ্চিত না হয়। দ্বিতীয়ত, বুকের দুধ খাওয়ানোর উপকারিতা সম্বন্ধে মায়েদের সম্যক ধারণা থাকা দরকার। বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত যে, মায়ের দুধ নবজাতকের জন্য আদর্শ পুষ্টিকর খাবার। এর কোনো বিকল্প নেই। শিশুর জন্মের পর মায়ের বুকে যে ঘন, হলুদাভ দুধ আসে, সেই শালদুধ বা কোলাস্ট্রাম জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে খাওয়ানো হলে নবজাতক মৃত্যুর হার ২২ শতাংশ কমানো সম্ভব। শালদুধে অনেক বেশি রোগপ্রতিরোধক উপাদান থাকে যা শিশুর রোগ প্রতিরোধে বিশেষভাবে সহায়ক। পরিমাণ যতটুকুই হোক, এটি নবজাতকের জন্য যথেষ্ট। শিশুর পরিপূর্ণ দৈহিক ও মানসিক বিকাশে মাতৃদুগ্ধের কোনো বিকল্প নেই। বুকের দুধপানে শিশুর পেটের পীড়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বহুলাংশে কমে যায়। ওজন ও উচ্চতা ব্রেস্টফিড করানো মায়েদের স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস পায়। মা ও শিশুর চিরন্তন বন্ধন পূর্ণতা পায় বুকের দুধ খাওয়ানোর মধ্যে দিয়ে। টিনের দুধ ও সিরিয়াল একদিকে যেমন শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয় অন্যদিকে খরচসাপেক্ষও। বুকের দুধ খাওয়ানো মায়ের পক্ষে সবচেয়ে সহজ এবং বলা বাহুল্য এতে কোনো খরচ নেই। শিশুর জন্মের পর থেকে ছয়মাস পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধই যথেষ্ট। অন্য কোনো খাবার বা পানির প্রয়োজন নেই। ছয়মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর খাদ্য ও পানির চাহিদা পূরণের সমস্ত উপাদান বুকের দুধ থেকেই পাওয়া যায়। শিশুর বয়স ছয় মাস পূর্ণ হলে মায়ের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি অন্যান্য খাবার দেয়া শুরু করতে হবে। কর্মব্যস্ত মায়েরা কাজে যাবার আগে বুকের দুধ চেপে বের করে পরিষ্কার কাঁচের বাটিতে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ঢেকে রেখে যেতে পারেন। ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত তা ভালো থাকবে। এক্ষেত্রে ফিডার না ব্যবহার করে বাটি – চামচে খাওয়াতে হবে। শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, মিক্সড ফিড করালে অর্থাৎ বুকের দুধ ও ফিডার দুটোই চললে শিশু কনফিউজড হয়ে যায়। ফলে,পেট ভরে খায় না। ফিডারের নিপল থেকে শিশুর জিহ্বার সংক্রমণ এবং ফিডার থেকে ঘন ঘন পেটের সমস্যা হতে পারে ।

শারীরিক বা মানসিক বিভিন্ন কারণে মায়েরা অনেক সময় ব্রেস্টফিড করাতে পারেন না। আবার অনেক মা এটাকে ঝামেলাপূর্ণ ভেবে এড়িয়ে যান। সাধারণভাবে কারণগুলো হচ্ছে – বুকে দুধ না আসা বা কম আসা, স্তনের বোঁটায় আকৃতিগত কোনো সমস্যা থাকা বা ক্ষত হওয়া, দুধের বন্ধ নালী, স্তনে আগে কোনো অপারেশন থাকলে, দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপ, শারীরিক গঠন পরিবর্তনের আশংকা করা, সচেতনতার অভাব, ক্ষেত্র বিশেষে সদিচ্ছার অভাব। কারণ যাই হোক, এ সমস্যা দূর করার প্রথম শর্ত মায়ের প্রতি মানবিক ও সদয় আচরণ করা। কোনোভাবেই নেতিবাচক মন্তব্য করা যাবে না। মায়ের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে হবে। দুধ আসার জন্য এসময় মাকে প্রচুর পানি ও তরল পান করতে হবে। দুধ পান করানোর সময় শিশুকে যথাযথভাবে মায়ের কোলে নিতে হবে যাতে সে আরামে ও নির্বিঘ্নে দুধ পান করতে পারে। মাকে যথাসম্ভব মানসিক সহায়তা দিতে হবে, উৎসাহ দিতে হবে। এছাড়া মায়ের বুকের নিপলে সমস্যা থাকলে “ওকেতানি” বলে বিশেষ পদ্ধতিতে ম্যাসাজ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ঘরোয়া পদ্ধতিতে গরম সেঁক  দেয়া, ম্যাসাজ করার মাধ্যমে সুফল পাওয়া যায়। ইনফেকশন থাকলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। যে কোনো সহায়তার জন্য যোগাযোগ করা যেতে পারে বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের মাতৃদুগ্ধ দান ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রে। প্রতি বছরের মতো এবছরও ১ আগস্ট বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস উপলক্ষে বিশ্বের ১৭০ টি দেশে পালিত হয়েছে মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ (১- ৭ আগস্ট)। শ্রেণী – পেশা – বয়স নির্বিশেষে প্রত্যেক মাকে তার সন্তানকে বুকের দুধ দিতে আগ্রহী ও সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশেও পালিত হয় মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ। আবারো বলতে চাই, মায়ের বুকের দুধ শিশুর জন্মগত অধিকার। প্রতিটি শিশু জন্মের পর শালদুধ থেকে শুরু করে দুই বছর বয়স পর্যন্ত এ অধিকার পূর্ণ ভাবে ভোগ করুক। একজন আধুনিক, সচেতন মা হিসেবে আপনার সদিচ্ছা ও মনোবলই যথেষ্ট। প্রত্যেক মা ও শিশু সুস্থ থাকুক। ” প্রতিটি শিশু মানুষ হোক আলোর ঝর্ণাধারায়। “

তথ্যসূত্র : বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশন। আইসিডিডিআরবি।

ছবি:গুগল