আমার তিনটি হারমোনিয়াম, যেন তিনটি দিগন্ত!

কনকচাঁপা শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

শিশু বয়সে যখন নিজের কন্ঠস্বর চিনেছি তখন বুঝেছি কি অনায়াসেই মা ডাকতে পারি! তাতে একটি মধুর স্বর বেজে ওঠে, একটি সুরের সেতু গড়ে ওঠে, একটি অনাবিল ভাবনা বিস্তৃত হয়, তাতে প্রাণ বিস্তার লাভ করে! আমি জেনে যাই মা ডাকলেই আমি আমার ডেরায় খুব আস্থার সঙ্গে বসত করতে পারি! ঠিক তখনই জানতে পারি বা আমাকে জানানো হয় যে এই মা শব্দটি আরও একটু উপর দিকে ছড়িয়ে দিতে পারি যাতে মা যদি মাচার উপরে কাজ করতে ওঠেন তখন তার কাছে আমার কন্ঠস্বর ঠিক মত পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু আকাশে এই স্বর খুব উজ্জীবিত, উজ্জ্বল করে পৌঁছে দিতে গেলে আমাকে একটি মাধ্যম অবলম্বন করলে কন্ঠস্বরের জন্য তা আরও সহজ হয় সেই মাধ্যম হল হারমোনিয়াম! নানাভাইয়ের বাড়ি একটি সিংগল রীডের হারমোনিয়াম ছিল, তা ছুঁয়ে দিতে সাহস হতোনা। সাদাকালো রীডের কালো বার্নিশ করা হারমোনিয়াম, অপূর্ব সুরে টিউন করা সে হারমোনিয়াম থাকতো নানীবুজির ছাপবাক্সের উপর। ছাপবাক্সো হল কাঠের বড় সিন্দুক, যার ঢাকনা বা ঝাঁপি বিছানা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ছাপ শব্দটি সাব এর বিকৃত শব্দ বোধহয়। সেই হারমোনিয়াম নীচে নামিয়ে মিন্টুমামা ক্ষিপ্ত গতিতে গর্বিত হাতে পরিচিত কিছু বাজনা বাজাতেন, লুকিয়ে লুকিয়ে জগন্ময় মিত্রের গান গাইতেন। মুড খুব ভালো থাকলে নানাভাই কখনো সখনো গান ও বাজনা শুনতেন। বাকি সময় ওটা আবদ্ধ থাকতো। নানাভাইয়ের ভয়ে ওটা ছুঁতাম না। কিন্তু যখন আব্বা আমাকে মুখে মুখে গান শেখানো শুরু করলেন তখন আব্বা একটি হারমোনিয়াম এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। কিন্তু অনুভব করলেই তো আর হয় না। একটি হারমোনিয়াম এর অনেক দাম! মধ্যবিত্ত পরিবারের সব প্রয়োজনীয়তা মিটিয়ে একটি শখের হারমোনিয়াম কে দরকারী আখ্যায়িত করা একজন বাবার জন্য অনেক কঠিন। এই নিদারুণ সময়ে আম্মার চাচীমা সংগীত অনুরাগী জেসমিন নানীবুজি আমার জন্য তাঁর হারমোনিয়াম কিছুদিনের জন্য দিয়ে দিলেন। আমি একটি হারমোনিয়াম পেয়ে যেন আকাশের চাদঁ পেলাম। আমি এবং পরিবারের সবাই দেখলাম কোন রকম শিক্ষা ছাড়াই তা বাজাতে পারছি! অসুবিধা একটাই শিশু কনকচাঁপার আঙ্গুল ছোট ছোট বিধায় যথাযথ ভাবে যথাস্থানে গিয়ে পৌঁছায় না। সুরের প্রয়োজনে আঙ্গুল কে জাম্প করে জায়গায় পৌঁছুতে হয়। তবুও আমরা পুরো পরিবার আনন্দে আত্মহারা। সারাদিন সারাক্ষণ এই চলছে, এভাবে প্রায় বছর খানেক পর নানীবুজি তার হারমোনিয়াম ফিরিয়ে নিয়ে আমাকে চারশত টাকা দিয়ে একটি হারমোনিয়াম কিনে দিলেন। জীবনে আব্বা এতো খুশি হননি বোধহয়, আমার গান বিদ্যুৎ বেগে ভেসে বেড়াতে লাগলো। গান আর হারমোনিয়াম আমার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হল। ওই হারমোনিয়াম দিয়েই আমি আমার পুরো শৈশব কৈশোর পার করে বিয়ে করে যখন শশুর বাড়ি আসলাম তখন খুব কষ্টে পড়লাম। শশুর বাড়িতে হারমোনিয়াম আছে কিন্তু তা আমার বড় ভাশুরের এবং তা খুবই যত্নের জিনিস। যখন তখন নিয়ে সাধনায় বসা যায়না। এক সময়ে আমার নিজের সামর্থ্য হল চার হাজার টাকায় একটি হারমোনিয়াম কেনার। বিস্কিট রং এর বার্নিশ করা ডাবল রীডের জার্মান জুবলী বাঁশীর হারমোনিয়াম। খুব সুন্দর টিউন তার। সেই হারমোনিয়াম এ আমার মোটামুটি পুরু ক্যারিয়ার এর প্রধান সময়টাই চলে গেছে। কত সাধনা, কত সুর, কত ক্রাইসিস, কত ভাবনা, কত সৃষ্টি হয়েছে ওই হারমোনিয়াম এ। ক্যারিয়ার এর প্রায় পঁচিশ বছর পার করে এসে হঠাৎ একদিন মনে হয়েছে একটা স্কেল চেঞ্জার হারমোনিয়াম আমি কিনতেই পারি! হাহাহাহাহা। সারাজীবন মোটামুটি হিসেব কষে কষে আমি ভুলেই গেছিলাম আমি একজন সচ্ছল মানুষ।তারপর একদিন আমাদের তবলচি নেওয়াজ চন্দন দত্ত কে সঙ্গে নিয়ে আমার জীবন সঙ্গী আমাকে অনেক দাম দিয়ে একটি হারমোনিয়াম কিনে দিলেন। কি অপূর্ব তার ধরন কি অপূর্ব তার রূপ বার্নিশ এর গন্ধ! আমি মাতোয়ারা হয়ে যেই সুরে ডুবে যাই তখনই আব্বা সামনে এসে দাঁড়ান! বলেন মাগো, এই যে দুয়ারে একজন ভিক্ষুক এসেছে তাকে একটি গান শুনাও। সে যদি বলে এই মেয়ে ভালো গেয়েছে তাহলে বুঝবো তুমি আসলেই ভালো গেয়েছো! আমি ইতস্তত করতেই আববা ভিক্ষুক কে অভয় দেন তুমি আমার মেয়ের গান শোনো, আমি অবশ্যই তোমাকে ভিক্ষা দেবো। আব্বা আমার গান গাইবার আগেই চোখ বন্ধ করেন। আমি গাইতে থাকি ‘মুছাফির মোছ এ আঁখিজল ফিরে চল আপনারে নিয়া ‘ ভিক্ষুক দানসামগ্রী নিয়ে চলে যায়, আব্বার অস্রুজল নিয়ে আব্বা বসে থাকেন। আম্মার ধমকে আব্বা হুঁশ ফিরে পান। আমার এই হারমোনিয়াম হয়তো আমার তৃতীয় ও শেষ হারমোনিয়াম, কিন্তু এটা খুলে নিয়ে বসলেই আব্বা আমার ভাবনার অগোচরে এসে দাঁড়ান, আমার আর নিরেট সাধনায় ডুব দেয়া হয়না। হারমোনিয়াম ও অশ্রু একসঙ্গে জায়গা মত তুলে রাখি। ছোট বয়সে নানাভাইয়ের হারমোনিয়াম ভয়ে ধরতে পারতাম না, যৌবন এর হারমোনিয়াম সংসারের কাজ ও ক্যারিয়ার এর চাপে যথাযথ ভাবে ধরতেই পারিনি, এখনকার হারমোনিয়াম যিনি আমায় ধরতে শেখালেন তার স্মৃতিচারণ এ বাজানোই দায়, আমি আসলে এই হিসাব গুলোই মেলাতে পারিনা। আর যে কিনা সাহায্যকারী হারমোনিয়ামই ধরতে পারেনি সে কিভাবে সুর ধরবে! আমি আসলে নিজের কাছেই এই জবাব দিতে পারিনা। আমি আসলে কিছুই পারিনা। আপাতত আমি আবার কাঁদছি!

ছবি: লেখক