এ কাপ অফ কফি…

ছাগল প্রথম আবিষ্কার করেছিল কফি! চমকে উঠলেন তো? কিন্তু ঘটনাটা সত্যি। কফি আবিষ্কারের ইতিহাসে অন্তত সেরকমটাই কথিত আছে। নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটনের কোনো এক ‘স্টারবাক’ কফি চেইন শপের দোকানে বসে যে কফি পান করা হয় আর এই আমাদের ঢাকা শহরের কফির দোকানে যে কফি সার্ভ করা হয় তার পেছনেও আছে ইথিওপিয়া‘র সেই ছাগল। একটু সহজ করে বললে ঘটনাটা এরকম, বহু যুগ আগে ইথিওপিয়ার এক ব্যক্তির পোষা ছাগল জঙ্গলে কিছু একটা খেয়ে বাড়ি ফিরে উল্টোপাল্টা আচরণ করতে শুরু করে। সেই ব্যক্তি ছাগলের এমন আচরণ দেখে সন্দেহ হয়। পরদিন ছাগলের পেছন পেছন জঙ্গলে গিয়ে সেই ব্যক্তি দেখে ছাগল একটি বিশেষ ফল খাচ্ছে।পরে তিনি তার এলাকার একটি মঠে গিয়ে মঠের অধ্যক্ষকে বিষয়টি খুলে বলেন। অধ্যক্ষ ওই ফল তুলে এনে ফলটি গরম করে পানিতে ভিজিয়ে রেখে ‘বেভারেজ’ বানিয়ে শিষ্যদের নিয়ে পান করেন। সেই তরল পানের পর তারাও এক ধরণের শারীরিক উত্তেজনা অনুভব করে। ধীরে ধীরে এটি পান করা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল। মঠের সন্নাসীরা দেখতে পেলো এই পানীয় গ্রহণ করার পর তাদের ঘুম ঘুম ভাব চলে যাচ্ছে। মনে আসছে তেজি ভাব। ঘন্টার পর ঘন্টা প্রার্থনা করার পরেও ক্লান্তি আসছে না। এরপর এই ফলটির কথা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। এ মহাদেশ থেকে ও মহাদেশ ভ্রমণ করল। বিশ্ববাসীও পেয়ে গেল প্রথম কফি।

কথিত আছে ষোড়শ শতাব্দিতে পারস্য, মিসর, সিরিয়া এবং তুরস্কে কফির প্রচলন ছিল। তবে সেখানেও কফি ইথিওপিয়া থেকে গিয়েছিল বলে কফি নিয়ে গবেষকারীরা মনে করেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বলকান অঞ্চল হয়ে ইতালি এবং পরে অবশিষ্ট ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে কফি। ধীরে ধীরে পৌছে যায় আমেরিকায়।
এখানে কিন্তু কফির ইতিহাস বয়ান করতে বসিনি। ইতিহাস বলার উদ্দেশ্য, এই কফি কতদূর পথ ভ্রমণ করে এই একবিংশ শতাব্দীর অনিবার্য্ পাণীয় হয়ে উঠেছে সেটাই আরেকবার মনে করে নেয়া। ‘এ কাপ অফ কফি’ কিন্তু এখন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাঙালীর জীবনে। এই শহরে কিন্তু ঠান্ডা ঘেরা, নামের তখমা আঁটা অনেক চেইন কফির দোকান বসেছে। তাদের সুশোভিত শোভন নির্জনতা অথবা কোলাহল নাগরিক নারী অথবা পুরুষকে নির্ঘুম রাখছে অনেক রাত পর্য্ন্ত। আড্ডায় কফি, প্রেমে কফি, পরকীয়ায় কফি, নিঃসঙ্গতায় কফি। বলা যায় এক ধরণের কালচারে পরিণত হয়েছে কফি। খুব বেশীদিন আগেকার কথা নয়। এই আশির দশকেও ঢাকা শহরে এরকম এক্সক্লুসিভ কফির দোকানের কথা কেউ ভাবতে পারতো না। নিউ মার্কেটের গেটের দুপাশে ছিল কফি বিক্রির দোকান। পাইপ দিয়ে পেতলের জগে গরম পানি, দুধ চিনি আর কফি মিশিয়ে পরিবেশন করা হতো ফেনা তোলা কফি। মানুষ বলতো এসপ্রেসো কফি। সেই কফিযাত্রা এখন পরিণত হয়েছে কফি সংস্কৃতিতে। এখন বিষন্নতা কাটাতেও কফি লাগে বাঙালীর, ধোঁয়া ওঠা কফি প্রয়োজন কান্নায়ও। সবার জানা হয়ে গেছে শট, মিডিয়াম অথবা লার্জ কফি। মুখস্ত হয়ে গেছে লাটে, ক্যাপাচিনো আর কোল্ড কফির আদ্যপান্ত।

বাঙালীর একদা প্রিয় পানীয়ের তালিকায় এক নম্বর জায়গাটি দখল করে রেখেছিল চা। চায়ের কাপে ঝড় তোলা ছিল প্রিয় স্বভাব।বলছি না যে চা আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। তবে খানিকটা যে পিছিয়ে গেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। উঠতি বিত্তবান শ্রেণী তাদের খোলস বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে ফেলেছে চায়ের নেশাও।
নিউ ইয়র্ক শহরের ব্রুকলিনে আলফা ডমিঞ্চো কোম্পানী ‘এক্সট্র্যাকশন ল্যাব’ নামে একটি কফির দোকান খুলেছে। সেখানে এক কাপ ইথিওপিয়ান গিশার দাম পড়বে আমাদের দেশীয় মুদ্রায় ১২০০ টাকা। কিন্তু ইথিওপিয়ান গিশার এত দাম কেন? এটি বিরল। খুব বেশি পাওয়া যায় না। কারণ, উৎপাদন হয় খুব কম। ইথিওপিয়া ছাড়া পানামার কিছু অংশে এই বিশেষ কফির চাষ হয়। ভীষণ দামী এই কফি এখন পৃথিবী জুড়ে কফি প্রেমিকদের কাছে প্রথম প্রেমের মতোই।

কফি কিন্তু এই শহরে প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ধরে নিই ঘড়ির কাটা মধ্যরাত ছুঁয়েছে অথবা ছোঁয় নি। বসে আছেন এই শহরে কফির সুগন্ধ মাখা কোনো অভিজাত কফিখানায়। সামনে অ্যাটেন্ডেন্ট রেখে গেলো ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফি। দেখবেন সেই তরলের ওপর নকশা করে ভাসছে ভালোবাসার বিখ্যাত চিহ্ন। কাপের ওপর চাঁদের মতো ভাসতে ভাসতে সেই ভালোবাসা চিহ্ন হয়তো জীবন্ত হয়ে উঠবে আপনার সামনে একটু পরেই। শূণ্য চেয়ারে এসে বসবে প্রিয় মানুষ। তারপর রাত গড়াবে, কফিও গড়াবে। থাকবে বেঁচে প্রেম। এমন প্রেম কফির কাপ ঘিরে বেঁচে থাকে নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, সুইজারল্যান্ড, ইস্তাম্বুল অথবা কলকাতায়। কফির ভাষা সবখানেই একই রকম। ধরে নিই রিফাত আর জায়েদের দেখা হলো একদিন এই শহরের এক নামকরা কফিখানায়। দুজনের মধ্যে সংযোগ সেতু স্থাপন করে দিল সেই কফির পেয়ালা। বাইরে রাত নিঝুম, ভেতরে জমজমাট কফির আসর। ঠান্ডা হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো কফির তামাটে সুঘ্রাণ আর গানের উচ্চকিত সুরে ভেসে এই দুটি চরিত্র মুহূর্তেই চলে এলো কাছাকাছি। তারপর সেই কফির দোকানে অনেকগুলো দুপুর আর রাত গভীরে তাদের দেখা হতে লাগলো। রিফাতের মনে হলো এই তো ভালোবাসা। জায়েদেরও কি তাই মনে হয়েছিল? হয়তো নয়।কফির কাপ থেকে ভালোবাসার তীর হয়তো রূপালী তীরের মতো উঠে এসে গেঁথে যায় নি তার বুকে। আর সে জন্যই জায়েদকে ডাক দিয়ে হৃদয়ের কাছে নিয়ে গিয়েছিল অন্য কফির আড্ডা, অন্য কোনো কফি জয়েন্ট। আর সেখানেই জায়েদ জড়িয়ে গেল সন্ধ্যার সঙ্গে। সন্ধ্যা আবার জয়েদেরই বন্ধু অয়নের স্ত্রী। জায়েদের এই চলে যাওয়া, ভেসে যাওয়া আটকাতে পারেনি রিফাত। রিফাতের কাছে যা ছিল ভালোবাসা জায়েদের কাছে সেটা ‘জাস্ট চ্যাট’। রিফাতকে অবশ্য এখনো মাঝে মাঝে ওই কফি জয়েন্টে এক কাপ কফির সামনে নিঃসঙ্গ বসে থাকতে দেখা যায়।

কলকাতা কফি হাউস

এরকম নিঃসঙ্গ মানুষদের ভীড় রাতের কফিখানার আড্ডায় কিন্তু কম নয়। মান্না দে ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গেয়ে স্মৃতি, বন্ধুত্ব, প্রেম আর হারানোর বেদনাকে গেঁথে দিয়েছিলেন এক গানের মাঝে। কলকাতা শহরে ঐতিহ্যবাহী কফি হাউসের চাইতেও যেন বাঙালীর মনে অমরত্ব পেয়েছে এই গান।

মান্না দে

কিন্তু সত্যিই তো কফি হাউসের সেই আড্ডা তো টিকে থাকে নি। টিকে থাকে না। সময় তার ভারী হাত দিয়ে চেনা মানুষগুলোকে টেনে নিয়ে যায় কোন অচেনা মেঘের বাড়ি কে জানে? রোদে পুড়ে অথবা বৃষ্টিতে ভিজে সেই চেনা দিনগুলো হঠাৎ একদিন অচেনা হয়ে যায়। আর তাই হয়তো অটলান্টিকের ওপারে কফিখানায় দেখা মেলে কেনো এক নিঃসঙ্গ মানুষের। সেই একই মানুষের ছায়া এই শহরেও চোখে পড়ে। এই নিঃসঙ্গ মানুষদের জন্য সুইজারল্যান্ডের জেনিভা শহরে খোলা হয়েছে ভিন্ন ধরণের কফির দোকান। সেখানে মিলবে যৌন পরিসেবা। তবে এজন্য খদ্দেরদের গুনতে হবে বাড়তি টাকা। সেই কফি শপগুলোতে গেলেই আপনার হাতে ধরিয়ে দেয়া হবে একটি আইপ্যাড। সেই আইপ্যাডে একের পর এক ভেসে উঠবে যৌন কর্মীদের ছবি। ক্রেতা নির্দিষ্ট একজনকে পছন্দ করলে সেই রমণীর হাতেই তার জন্য আসবে কফির পেয়ালা। কফি পান করতে করতে খদ্দের পাবেন ওই নারীর যৌন স্পর্শ। খরচ হবে সুইস মুদ্রায় ৬৫ ফ্রাংক। বাংলাদেশী টাকায় সেটা দাঁড়াবে ৫৫১২ টাকা। ওই টাকার বিনিময়ে পাওয়া যাবে ১০ মিনিটের যৌন পরিসেবা।

যৌনতার সঙ্গে কফি সেবনের কেনো সম্পর্ক রয়েছে কি? গবেষকদের খনন কাজ চলছে এই সেক্টরেও। জানা গেছে, নারী-পুরুষের যৌন মিলনের আগে কফি পান বিষয়টা সঙ্গমকে আরো জোরালো আরো আনন্দময় করে তোলে। পশ্চিমে এখন বিশেষ ধরণের ভায়েগ্রাকফি তৈরী করেও বাজারজাত করা হচ্ছে। যৌন ক্ষমতা বাড়াতে কফির শক্তি নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞান ইতিমধ্যে বলে দিয়েছে কফির মধ্যে থাকা ক্যাফিন মানুষের স্মৃতিভ্রষ্টতা প্রতিরোধ করে। ৬৫ বা তার বেশী বয়সী ব্যক্তিদের ওপর গবেষণা চালিয়ে তারা দেখেছেন দৈনিক এক কাপ কফি খাওয়ার ফলে তাদের মনের রাখার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সিএনএন এর প্রতিবেদনে সম্প্রতি বলা হয়েছে, কফি আপনাকে শুধু চাঙ্গা করবে তাই নয়, আপনার বুদ্ধিকেও কিছুটা শাণিত করতে পারে। কফির উপাদান ক্যাফেইন স্নায়বিক কর্মকাণ্ডকে ত্বরান্বিত করতে পারে। নিয়মিত কফি পানে মানসিক অবস্থার উন্নতি হতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে গঠনমূলক মনোভাব তৈরীতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি কফি পান হার্টএ্যাটাক ও হার্টএ্যাটাকের কারণে মৃত্যুর হার কমাতে পারে এমন তথ্য পাওয়া গিয়েছে অনেক গবেষণায়। ১৫ বছর ব্যাপী ৪১,০০০ হাজার মহিলার অংশগ্রহণে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে প্রতিদিন ৩ কাপ করে কফি পান হার্ট এ্যাটাকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম। পুরুষদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ তথ্য পাওয়া গিয়েছে। কফিতে ক্যাভনয়েড নামক শক্তিশালী এন্টিঅক্সিডেন্ট আছে যা হৃদ রোগের ঝুঁকি কমিয়ে আনে।

এক্সট্র্যাকশন ল্যাব

চা বা চকলেটের চেয়ে কফিতে অধিক পরিমাণে ক্যাফেইন থাকে। এ ক্যাফেইন রক্তের এলডিএল (ক্ষতিকারক কলেস্টেরল) কমাতে এবং এইচডিএল (উপকারী কলেস্টেরল) বৃদ্ধি করতে ভূমিকা রাখে। আর সেজন্যই চিকিৎসকরা আজকাল দিনে ৪ কাপ ব্ল্যাক কফি খাওয়ার জন্য তাগাদা দিচ্ছেন। সেই কথিত গল্পের ছাগলটাকে আসলে ধন্যবাদ জানাতে পারে বাঙালী। গোটা বিশ্বের মতো এই মুল্লুকেও কফি কালচারের সূচনা তো ছাগলটি না থাকলে হতো না। জীবনের পরতে পরতে কফি জড়িয়েও যেত না।চা খোর বাঙালীর জীবনে আসতো না কফি নামের সেই রবিনহুড।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল