গোলাপ যে নামে ডাকো

তখনো সেই নাইটিঙ্গেল পাখিটি তার বুক ঘষে চলেছে গোলাপের কাঁটায়। ক্ষতবিক্ষত হয়ে রক্ত ঝরছে তার বুক থেকে। সেই রক্ত মিশে যাচ্ছে সাদা গোলাপের পাপড়িতে, অন্তরাত্নায়। কিন্তু তবুও গোলাপ যথেষ্ট লাল হয়ে উঠছে না। কিন্তু নাইটিঙ্গেল তো জানে সেই যুবক ছাত্রের প্রেমিকা চেয়েছে একটি লাল গোলাপ। পৃথিবী তখনও মুখ দেখেনি লাল গোলাপের। কিন্তু সেই প্রেমিকার চাই লাল গোলাপ। একটু একটু করে নাইটিঙ্গেলের রক্ত মিশে ধীরে ধীরে গোলাপ ধারণ করলো লাল রঙ। আর কাঁটার আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়ে পড়ে রইলো সেই নাইটিঙ্গেলের প্রাণহীন শরীর।
এভাবেই কি পৃথিবীতে গোলাপ ভালোবাসা, বেদনা আর মৃত্যুকে ধারণ করে হয়ে উঠেছিল ঘোর লাল বর্ণ? না। এতো অস্কার ওয়াইল্ডের সেই বিখ্যাত রূপকথার গল্পের শেষ পরিণতি। গোলাপ ফুল তো তারও বহু আগেই মোহনীয় বর্ণে রঞ্জিত হয়ে মাথা তুলেছে পৃথিবীতে। বিখ্যাত হয়ে উঠেছে নিজের রূপ আর কাঁটায়। গ্রীক উপকথায় বলা আছে, প্রেমের দেবী ভেনাসের পায়ের রক্ত থেকে গোলাপের জন্ম।
এবার প্রাণের বাংলায় প্রচ্ছদ আয়োজনে থাকছে সেই চিরকালের গোলাপ।

গোলাপের জন্ম মুহূর্ত জানতে হলে ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টে পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় সাড়ে তিন কোটি বছর আগে।মানুষের দৃষ্টি খুঁজে পেয়েছিল গোলাপ। পৃথিবীর কোন ভূভাগে, কোন বিমূখ প্রান্তরে প্রথম জন্ম নিয়েছিল এই ফুল?ইরানের কোনো ধূসরে? চীনের মহা প্রাচীর ঘেঁষে? মিশরের রাজ প্রাসাদের বাগানে? নাকি ইউরোপের কোনো গহীন অরণ্যে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। মিলবেও না। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে গোলাপের জন্ম কথা। জানাবে এই অনন্য ফুলটিকে ঘিরে যুদ্ধ, রক্তপাত, ভালোবাসা আর সাহিত্যে জন্ম নেয়া উজ্জ্বল সব পংক্তিমালার কথা।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,
“আমারি চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ
চুনি উঠল রাঙা হয়ে
আমি চোখ মেললুম আকাশে
জ্বলে উঠল আলো
গোলাপের দিকে তাকিয়ে বললুম সুন্দর
সুন্দর হল সে…”
আর অনেক বছর পরে এসে প্রয়াত কবি আবুল হাসান লিখলেন দীর্ঘশ্বাসের মতো লাইন, ‘‘গোলাপ এতো মলিনতা নিয়ে তবুও গোলাপ।’’
আসলে গোলাপ নিয়ে মানুষের ঘোর যেন কাটতেই চায় না। পৃথিবীতে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ প্রজাতির গোলাপ রয়েছে। এই সমস্ত প্রজাতির মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন উপ-প্রজাতী। সব মিলিয়ে প্রায় ৫৫০টি আলাদা আলাদা গোলাপের অস্তিত্ব রয়েছে পৃথিবীজুড়ে। শোনা যায়, গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো শয্যায় প্রেমিক মার্ক অ্যান্টোনির সঙ্গে মিলিত হতেন রানী ক্লিওপেট্রা। ইতিহাস বলে, দুনিয়া কাঁপানো সম্রাট নেপোলিয়নের স্ত্রীর ছিল দুনিয়ার সেরা গোলাপ বাগান। সেই গোলাপের মোহিনীয় সৌন্দর্য্ দেখতে ভীড় জমাতো অনান্য রাজন্যবর্গ। প্রাচীন রোমে প্রেমের বেলায় এই গোলাপ কথা বলতো ভিন্ন ভাষায়। সেখানে তখন প্রেমিকার সঙ্গে গাঢ় গভীর সান্নিধ্যে ডুবে যাবার সময় প্রেমিক পুরুষ বন্ধ দরজায় আটকে রাখতো লাল গোলাপ। সেখানে অন্তরঙ্গ গোপনীয়তাকে প্রকাশ করতো এই ফুল। গোলাপ নিয়েতো কবিতা, গল্প লেখার কোনো শেষ নেই। শেষ নেই ছবি আর গানের।
কিন্তু গোলাপের কাঁটা? প্রেমে যেমন গোলাপ অবিষ্মরণীয় তেমনি প্রত্যাখ্যানে খ্যাতিমান গোলাপের কাঁটা।গোলাপের মতো সেও তো বিখ্যাত, আলোচিত। কাঁটা যেন প্রেমের দ্বিতীয় পৃষ্ঠা। প্রত্যাখ্যানের বেদনা, বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক কাঁটা। লম্বা ডাঁটির ডাচ গোলাপের কাঁটা থাকে না। দেখতে অনেকটা ‘কাপ’-এর মতো এই গোলাপের সুরভি কম হলেও স্থায়িত্ব অনেক বেশি। ডাচ গোলাপের ডাঁটিও প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার লম্বা। কিন্তু কাঁটা ছাড়া গোলাপ ফুলের গাছ ভাবা যায় না। কিন্তু তবুও এখন এই নয়া পৃথিবীতে বছরের নির্দিষ্ট দিনে প্রেমিক প্রেমিকাদের লাগে গোলাপ ফুল। দিনটা ভ্যালেনটাইন্স ডে। গোলাপের উৎসব সাজিয়ে তোলে ভালোবাসার অনুভূতিকে। সে উৎসবে গোলাপ যেমন থাকে, থাকে তার কাঁটাও। তরুণ তরুণীরা হয়তো প্রেমে পড়ে এই দিনে। কিন্তু ভেঙ্গেও যায় সেই প্রেম।
কবি রাইনার মারিয়া রিলকে মারা যান আঙুলে গোলাপ কাঁটা ফুটে। সত্যিই কি এমনটাই ঘটেছিল? কবি জানতেনই না যে গোলাপ তার মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে তার মৃত্যুকেও করে দেবে গোলাপের মতন রক্তিম। এলিজি ও সনেটগুচ্ছ লেখা শেষ করার পরের বছর থেকেই রিলকের শরীর খারাপ হতে শুরু করে।

মূল্যবান জুলিয়েট গোলাপ

মাঝে মাঝেই তাকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে তখন। এরই মাঝে একদিন বাগানের একটি গোলাপ ফুল তুলতে গিয়ে আঙুলে কাঁটা ফুটল তাঁর। সেই ছোট ক্ষতের ছিদ্রপথ ধরেই হয়তো তাকে আক্রমণ করেছিল লিউকিমিয়া। যন্ত্রণাময় রোগ কবিকে টেনে নিয়ে গেল মৃত্যুর দিকে। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে কবর দেওয়া হলো নিকটবর্তী একটি গির্জার প্রাঙ্গণে। সমাধিস্তম্ভে উৎকীর্ণ হলো সেই ক্ষুদ্রাকার, কিন্তু বহু স্মৃতিসহ কবিতা, যা তিনি মৃত্যুর এক বছর আগে লিখে রেখেছিলেন ‘গোলাপ বিশুদ্ধ স্ববিরোধ, কারোরই নিদ্রা/না-হবার আনন্দ তুমি, অনেক চক্ষু পল্লবের তুলে’।
গোলাপের আদি নিবাস এশিয়ায়। বিখ্যাত লাল গোলাপের জন্ম চীন দেশে।অল্প কিছু প্রজাতির বাড়ি ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও উত্তর পশ্চিম আফ্রিকায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে গোলাপের প্রাচীনতম আবাসস্থল জার্মানি। জার্মানির হিল্ডেসিম ক্যাথিড্রালে গেলে দেখা মিলবে সেই হাজার বছরের পুরনো গোলাপের। সেটাই পৃথিবীর আদি গোলাপ।
প্রেম একটি লাল গোলাপ। কিন্তু প্রেমের রঙ কি লাল? কবিরা তো বলেছেন ভালোবাসার রঙ নীল।মজার ব্যাপার হচ্ছে এখনো পৃথিবীর দুর্লভতম, মূল্যবান গোলাপ জুলিয়েটের রঙ মোটেই লাল নয়, গোলাপী।দুনিয়াজোড়া রূপ আর দামের জন্য বিখ্যাত এই ‘জুলিয়েট’ নামের গোলাপেরও গল্প আছে।ইংল্যান্ডের গোলাপ-চাষী ডেভিড অস্টিন ১৫ বছর ধরে গবেষণা করে ফুটিয়েছেন এই হাইব্রিড গোলাপ। লেখক ও গোলাপ চাষী অস্টিনের এই অসাধারণ ঘ্রাণের গোলাপ ফোটাতে ব্যয় হয়ে গেছে ৩ মিলিয়ন পাউন্ড। তাই এই গোলাপের দামও হাঁকা হচ্ছে ৫ মিলিয়ন ডলার। পৃথিবীতে এই মুহূর্তে দামী গোলাপ ‘জুলিয়েট’।
স্পেনের কবি হিমেনেথ গোলাপ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘‘গোলাপকান্তি তোমার রচিত নগ্নতায়।’’ মোগল সম্রাট বাবরও হয়তো হিমেনেথের মতো গোলাপের নগ্নতায় মুগ্ধ হয়ে তার প্রেমে পড়েছিলেন। অনেকের ধারণা, ভারতবর্ষের মাটিতে তিনিই প্রথম গোলাপের চারা পুঁতে দিয়েছিলেন। ভারতবর্ষে দুটো বিষয়ের অভাব বোধ করেছিলেন বাবর। একটি হলো সামঞ্জস্য আর অন্যটি বাগান। আগ্রায় পৌঁছেই তাই শুরু করেছিলেন বাগান। যেমনটা তার হাতে গড়ে উঠেছিল কাবুলে। ভারতবর্ষের মাটিতে তার স্বরচিত বাগানে ফুল ফোঁটার সঙ্গে সঙ্গে নিজের স্মৃতি কথায় লিখলেন, ‘‘শেষ পর্যন্ত সুষমা ও সামঞ্জস্যহীন এই হিন্দুস্থানে বাগান বানানো গেল একটা নিয়ম-শৃঙ্খলা সহকারে। চারদিকে মানানসই প্রান্তরেখা এবং নকশা দিয়ে প্রতিটি প্রান্তকে গোলাপ আর নিখুঁত বিন্যাসে সাজিয়ে।’’
বাবরের এই বাগান আগ্রা থেকে ক্রমেই তার শিকড় বিস্তার করলো ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে। ভিন দেশের গোলাপ ভারতবর্ষের মাটি আর আবহাওয়াকে আপন করে নিল। গোলাপ উঠে এলো মোগল রাজপুত্র-রাজকন্যাদের হাতে।ভালোবাসার আকাশে ছড়িয়ে দিলো সুঘ্রাণ। কিন্তু কবিতায় তখনো শুরু হয়নি গোলাপের ফুটে ওঠা। তবে ফরাসী কবিতায় গোলাপ ফুলের সৌরভ পাওয়া যায় বেশ আগে থেকেই। ওমর খৈয়াম লিখলেন,
‘‘দীর্ণ হিয়া কোন সে রাজার/রক্তে নাওয়া এই গোলাপ/কার দেওয়া সে লালচে আভা/হৃদয়-ছেঁচা শোণিত ছাপ।’’
মোগল সম্রাটের বদান্যতায় এই অঞ্চলে এসেছিল গোলাপ। রাজা আর সম্রাটদের ভালোবাসা প্রকাশের অন্য নামও ছিল গোলাপ। কিন্তু গোলাপকে ঘিরে ঝলসে উঠেছে তরবারি, ঝরেছে রক্ত। ইংল্যান্ডে ১৪৫৫ থেকে ১৪৮৭ সাল অবধি চলেছে গৃহযুদ্ধ। যার নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে ‘ ওয়ার অফ রোজেস’ নামে। বিবাদমান দুই পক্ষ সেখানে সাদা আর লাল গোলাপের চিহ্নে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। হাউজ অফ ইয়র্কের চিহ্ন ছিল সাদা গোলাপ আর হাউজ অফ ল্যাংকাস্টারের লাল গোলাপ। যুদ্ধ শেষে লাল গোলাপই বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছিল।
ফুরিয়ে এলো গোলাপের গল্প। তবুও কি শেষ হলো? গোলাপ ফুল যে জড়িয়ে গেছে চিকিৎসায়। গোলাপ ভিটামিন এ,সি, বি-৩ ও ই এর অন্যতম উৎস। গোলাপজল “রিলাক্সিং এজেন্ট” হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা স্নায়ুগুলোকে সতেজ করে।গোলাপের পাপড়ি মেশানো চা আলসার, অ্যাজমা, ডিহাইড্রেশন দূর করতে কাজ করে। রোজ টি পিত্তথলি ও যকৃতকে ভালো রাখে। এখন বলা হচ্ছে গোলাপজল চুলের বৃদ্ধির জন্য উপকারী।
মুগল সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের আবিস্কার করা ‘আতর-ই-জাহাঙ্গীর’ থেকে গোলাপের আতর প্রচলিত হয়। গোলাপ দিয়ে জেলি, মিষ্টি, হালুয়াসহ নানা ধরনের খাদ্যসামগ্রী সুগন্ধী করা হতো সেই আদিকাল থেকে। ভেষজ হিসেবেও গোলাপ গাছ ব্যবহার করা হয়। গোলাপের পাপড়ি থেকে জ্যাম, জেলি তৈরী করা হয়। সুগন্ধির জন্য গোলাপজল ব্যবহার করা হয়। গোলাপ ফুলের সুবাসকে কাজে লাগিয়ে পারফিউম, সাবানসহ বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী তৈরি করা হয়। গোলাপে গেনারিয়ল নামে এক ধরনের অ্যারোম্যাটিক অ্যালকোহল জাতীয় পদার্থ পাওয়া যায়। যা এর সুগন্ধের জন্য দায়ী। গোলাপ থেকে এক ধরণের তেলও উৎপাদিত হয়।
প্রখ্যাত প্রয়াত কথাশিল্পী কমলকুমার মজুমদার তাঁর ‘গোলাপ সুন্দরী’ উপন্যাসের কয়েকটি লাইন দিয়ে লেখাটা শেষ করি।কমল কুমার লিখেছিলেন, ‘হায় গোলাপের মতো বিস্মৃত ফুল আর নাই সমস্ত মুহূর্তে যাহার অনিত্যতা, প্রথমে শুকায় ধীরে, ঝরিয়া চুপ, ক্ষণেকেই কোথায় ফুটিয়া ওঠে, সমক্ষে থাকিয়াও চির-বিস্মৃত’ বিলাস এই রুগ্ণ কথাটি প্রত্যহই বারবার উদ্বিগ্ন প্রষ্ফুটিত গোলাপের প্রতি চাহিয়া ভাবিয়াছে এ সত্য তাহার নিজস্ব অভিজ্ঞতা।’

এতকিছুর পরও গোলাপ রয়ে গেলো সেই গোলাপই। গোলাপকে যে নামেই ডাকি…।।।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট, গোলাপ যে নামে ডাকো (কাব্য সংকলন)
ছবিঃ গুগল