প্যারিস থেকে জুরিখ- দশ

নিজামুল হক বিপুল

বরফে ঢাকা আল্পস পর্বত আর খ্যাপাটে চালকের গল্প…

অফিসিয়াল কাজে গেলে কোথাও ঘুরে দেখার সুযোগ থাকে খুব কম। কারণ সারাণত দৌড়ের উপর থাকতে হয়। সেই দৌড়ের উপরই মাঝে মধ্যে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ানোর ফুরসত বের করেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বা শহর এক ঝলক পরখ করে দেখার চেষ্টা করেছিলাম দুই দুইবারের ইউরোপ ভ্রমণের সময়। হেতু ছিল বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন। কারণ শুধুমাত্র ঘুরে বেড়ানোর জন্য হয়তো বা ইউরোপ যাবার সুযোগ না ও হতে পারে। তাই সময়টাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি।
২০১৫ সালের নভেম্বরে যখন দ্বিতীয়বারের মত ফ্রান্সের রাজধানী শিল্প সংস্কৃতির শহর প্যারিস যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তখন কাজের ফাঁকে ফাঁকে পাশের দেশ বেলজিয়াম আর সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহর গিয়েছিলাম কিছু সময়ের জন্য। রোববার সাপ্তাহিক ছুটি হওয়ার কারণে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের কার্যক্রমও বন্ধ থাকে। তাই ছুটির দিনটাকে নিজের মত করে সাজিয়ে নিয়ে এক সকালে তীব্র শীত উপেক্ষা করে আমরা যাত্রা করেছিলাম ব্রাসেলসের উদ্দ্যেশে। এক দিন আগেই বাসের টিকেট কেটে নিয়েছিলাম আমরা। আমরা বলতে আমি ছাড়াও কালের কণ্ঠের তৌফিক মারুফ, সকালের খবরের রবিউল ইসলাম এবং বাংলা ভিশনের ইমরুল কায়েস। খুব ভোরে বাস ছাড়বে বেলজিয়ামের রাজধানী  ব্রাসেলসের উদ্দ্যেশে। নির্ধারিত সময়ের আগেই আমরা চার জন প্ল্যাস দো ক্লিসি থেকে মেট্টোতে করে সোজা পৌঁছে গেলাম বাস স্টপেজে। অনেকটা বিমানের মতই বোডিং পাস নিশ্চিত করে ইউরো লাইনের নির্দিষ্ট বাসে উঠে পড়লাম। যাত্রী হাতে গোনা ১২-১৪ জন। যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিল আফ্রিকান কালোমানিক। মধ্যবয়সী বাসের চালক পোশাক-আশাকে দেখতে বেশ স্মার্ট। চশমা পরিহিত। তবে ইংরেজী বলতে পারেন না, এমনকি বুঝেনও না। তার সব কথাই চলে স্প্যানিশ ভাষায়।
যাক নির্ধারিত সময়েই প্যারিস শহরকে বাই বাই টা টা জানিয়ে বাস ছুটে চললো ব্রাসেলসের পথে। যেমন প্রশস্ত তেমনি মসৃণ পিচ ঢালা পথ। বিলাস বহুল বাস চলছে দুরন্ত গতিতে। রাস্তার দুই পাশের নয়নাভিরাম দৃশ্য, মহাসড়ক থেকে অনেক দূরে ছোট ছোট শহর আর গ্রাম দেখতে দেখতে এক সময় দু’চোখ জুড়ে তন্দ্রা জেঁকে বসলো। এরই মধ্যে হঠাৎ ল্ক্ষ্য করলাম ভোরের সূর্য উঁকিঝুকি দিচ্ছে। আমাদের গাড়িখানা রাস্তার মাঝে একটি ফিলিং স্টেশনে থেমে গেছে। ফিলিং স্টেশনের একপাশে একটি বার। চালক স্টাট বন্ধ করে জানালেন, ২০ মিনিটের বিরতি।
আমরা সবাই নেমে পড়লাম। কেউবা কিছুটা রিলাকস্ হতে গেলেন ওয়াশ রুমে। কেউবা এক হাতে এক পেয়ালা কফি নিয়ে অন্যহাতে এক শলকা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে টানতে লাগলেন। এরই মধ্যে কখন যে ২০ মিনিট শেষ হয়ে গেছে টেরই পেলাম না। দেখলাম চালক গাড়িতে উঠে হর্ণ বাজিয়ে দ্রুত গাড়িতে উঠার তাগিদ দিচ্ছেন। আমরা প্রায় সবাই গাড়িতে উঠে পড়েছি, কিন্তু দু’একজন বাকি ছিলেন। তাদের জন্য গাড়ি ছাড়তে পারছিল না। এতে করে চালক বেশ বিরক্ত হচ্ছিলেন। হাতের ঘড়ি দেখছিলেন এবং ইংরেজী বলতে না পারায় নিজের ভাষায়ই বিড়বিড় করে কি যেন বকে যাচ্ছিলেন অনর্গল। এক পর্যায়ে চালক গাড়ি থেকে নিচে নেমে সবাইকে ডাকাডাকি করছিলেন, দু-একজন উঠতে দেরি করায় খ্যাপাটে চালক নিজেই নিজের দুই হাত দিয়ে দুই গাল জুড়ে চপেটাঘাত করতে লাগলেন। যেটাকে আমরা বলি চড়ানো বা চড় মারা। এই দৃশ্য দেখে যে দুই-তিন জন নিচে ছিলেন তারা দ্রুত গাড়িতে উঠে পড়লেন। চালক গাড়ির দরজা লক করে বিড়বিড় করতে করতেই গাড়ি চালাতে শুরু করলেন। বুঝতে  পারলাম সময়ের প্রতি অতি যত্নশীল চালক যাত্রীদের সময়জ্ঞান দেখে চরম বিরক্ত।
সকাল গড়িয়ে দুপুর ১২টার দিকে আমরা যখন ব্রাসেলস শহরে পৌঁছলাম। শহরের যে স্থানটিতে আমাদের নামানো হলো সেটি মূলত ব্রাসেলস সেন্ট্রাল রেলস্টেশন। আমাদের কারোরই কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই ব্রাসেলস শহর সম্পর্কে। সবাই নতুন। আগে থেকে ব্রাসেলসে বসবাসরত বাংলাদেশী কারো সঙ্গে যোগযোগও করা হয়নি। তাই ব্রাসেলস নেমে প্যারিস থেকে নূরুল ওয়াহেদ দুই জনের মোবাইল নম্বর দিয়ে বলেছিলেন, তাদের সঙ্গে যেন যোগযোগ করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ওই দুই জনের কাউকেই পাওয়া গেল না। কারণ একজন ব্রাসেলস শহরের বাইরে অনেক দূরে। অন্যজন দুই দিন আগেই বাংলাদেশে গেছেন। এই অবস্থায় আমরা রেল স্টেশনে ঘুরে ঘুরে কিছু সময়কাটানোর পর বেরিয়ে পড়লাম শহর ঘুরতে। রেল স্টেশনে থাকা অবস্থায় দেখা মিললো এক বাংলাদেশীর সঙ্গে। তিনি দিন কয়েক হলো ব্রাসেলসে এসেছেন। জানালেন, রেল স্টেশনেই কাটছে তার দিন। গ্রীস থেকে এসেছেন। ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রীস গিয়েছিলেন। সেখান থেকে হাঙ্গেরি, জার্মানী হয়ে ট্রেনে করে ব্রাসেলস এসে পৌঁছেছেন। তার চেহারার দিকে তাকিয়ে বোঝা গেল ভীষণ বিধ্বস্ত। একটু জীবিকার সন্ধানে দেশ ছেড়ে এসে মহাবিপদেই আছেন এই বাঙালী যুবক।
যাক আমরা বেরিয়ে পড়লাম শহর বেলজিয়াম ঘুরে দেখতে। হাতে সময় কম, সন্ধ্যায়ই রাতেই প্যারিসের উদ্দ্যেশে যাত্রা করতে হবে। তাই স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে বলেই আমরা রেল স্টেশন থেকে হাঁটা শুরু করলাম ডাউন টাউনের দিকে। মিনিট পনেরো হাঁটার পর কাংখিত গন্তব্যে পৌঁছে আমরা মুগ্ধ। তবে ক্ষুধায় রীতিমত ক্লান্ত। তাই সবাই মিলে ঢুকে পড়লাম একটি ফাস্টফুডের দোকানে। প্রত্যেকে একটা করে চিকেন স্যান্ডুস নিলাম। কিন্তু এতো বিরাট স্যান্ডুস কিছুতেই শেষ করা করা যাচ্ছিল না। পেট পুজা শেষে ঘুরে ঘুরে দেখলাম ডাউন টাউন। হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত পুরো শহর। ক্রিসমাসকে সামনে রেখে নানান সাজে সাজানো হয়েছে ডাউনটাউনকে। ঘুরে দেখার সময়ই আবিস্কার করলাম একটি ‘বার মিউজিয়াম’। কিন্তু বিকেল হয়ে যাওয়ায় মিউজিয়াম বন্ধ হয়ে গেল। ভিতরে যাওয়া গেল না। বাইরে থেকেই মিউজিয়ামের ছবি ক্যামেরাবন্দী করলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে আমরা ধীরে ধীরে আবারো হাঁটা শুরু করলাম ব্রাসেলস স্টেশনের দিকে।
বেলভিউ লেক আর পাহাড়ের শহর জুরিখ…
জলবায়ু সম্মেলনের শেষ দিনে আমরা গিয়েছিলাম সাদা বরফে ঢাকা আল্পস পর্বতের পাদদেশে। মানে জুরিখ। পাহাড়-টিলা,লেক ঘেরা সুইজারল্যান্ডের অপূর্ব সুন্দর শহর। জুরিখ যাওয়াটা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। আগে থেকেই আমি, তৌফিক মারুফ এবং রবিউল ইসলাম ট্রেনের টিকেট কেটে রেখেছিলাম। সম্মেলনের রিপোর্ট পাঠিয়ে প্যারিসের গার্দে লিস্ট রেলস্টেশন থেকে বিকেলের ট্রেনে জুরিখের পথে যাত্রা করেছিলাম। দ্রুতগতির টিভিজি ট্রেনে জার্নির মজাই আলাদা।
জুরিখ যাবার আগেই সেখানে বসবাসরত আতিক ভাইয়ের সঙ্গে পূর্ব পরিচয় সূত্রে যোগাযোগ করেছিলেন সহযাত্রী তৌফিক মারুফ। তাই জুরিখ ঘুরতে গিয়ে কোন রকম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি। সন্ধ্যা সাতটার দিকে জুরিখ রেলস্টেশনে পৌঁছেই আতিক ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন তোফিক মারুফ। কিছুক্ষণের মধ্যেই আতিক ভাই স্টেশনে। আমাদের সাদরে গ্রহণ করলেন। তারপর নিয়ে গেলেন শহর লাগোয়া নিজের বাসায়। অনেকটা পাহাড়ি এলাকা। ডুপ্লেক্স বাড়ি। স্ত্রী আর দুই সন্তান নিয়ে এখানে বসবাস করছেন কয়েক বছর ধরে। বাসায় যেতেই রনি ভাবীর সে কি আতিথেয়তা। হালকা নাস্তা পর্ব শেষ করে আতিক ভাই বললেন, আমাদের হাতে যেহেতু সময় আছে তখন বাসার খুব কাছেই লেক ঘুরে দেখা যেতে পারে।
আমরা বেরিয়ে পড়লাম। বেলভিউ লেকের পাড়ে গিয়ে রীতিমত মুগ্ধ। আতিক ভাই জানালেন, এই লেকে হলিউড, বলিউডের অনেক বিখ্যাত সিনেমার শুটিং হয়েছে। এই লেক জুরিখ শহরের সৌন্দর্য্য যেন শত শত গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। লেকের সৌন্দর্য্য ভ্রমণপিপাসুদের মুগ্ধ করে। রাতের বেলা হওয়ায় লেকের মধ্যে থাকা শত শত বোট নোঙর করা দেখা গেলেও চড়ার সুযোগ হয়নি। তাছাড়া বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা। তাই বেশ কিছু সময় লেকের পাড়ে ঘুরে আমরা আবারো বাসায় চলে গেলাম। লেকের পার থেকেই দেখা গেল, অন্য পাড়ে পাহাড়ের উপর বাসা-বাড়ি। এমনকি ফাইভ স্টার হোটেলও গড়ে উঠেছে।
রাতে রনি ভাবীর হাতে রান্না করা নানা পদের ভর্তাসহ মাছ-মাংসের বাঙালী খাবার খেয়ে আমরা কিছুটা সময় আড্ডায় মেতে উঠলাম। দারুণ আড্ডাবাজ আতিক ভাইদের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। ঢাকা শহরের লালমাটিয়ায় নিজেদের বাড়ি। নানা বিষয়ে আড্ডা শেষে আমরা দ্রুত ঘুমিয়ে পড়লাম। কারণ পরদিন খুব ভোরে আমাদের গন্তব্য হচ্ছে বরফে ঢাকা আল্পস পর্বত।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবী চলে গেলেন কর্মস্থলে। যাবার আগে সকালের নাস্তায় টেবিল সাজিয়ে রেখে গেলেন। ঘুম থেকে উঠে আমরা নাস্তা শেষ করে দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম আল্পসের উদ্দেশ্যে। আতিক ভাইয়ের বিএমডব্লিউ গাড়িতে করে আতিক ভাই আমাদের নিয়ে ছুটে চললেন নির্দিষ্ট গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। গাড়ি এরাস্তা-ওরাস্তা পেরিয়ে ছুটে চললো দ্রুত গতিতে। চালকের আসনে বসা আতিক ভাই রাস্তার দুই পাশের নানা দৃশ্য দেখিয়ে সেগুলোর বর্ণনা করলেন।  আমরা যখন আল্পসের পথে যাচ্ছিলাম তখনও দেখেছি পাহাড়ের পাদদেশে থাকা ঘরবাড়ি সাদা বরফে ঢেকে আছে। সৌন্দর্য উপভোগ করতে এক জায়গায়তো গাড়ি থামিয়ে দিলেন আতিক ভাই। তারপর বরফের মধ্যে শুয়ে, বসে সমানে চললো ক্যামেরার ক্লিকবাজি। এক সময় আমাদের গাড়ি দুই পাশে বরফে ঢাকা আল্পস পর্বতের মাঝ দিয়ে মসৃণ সড়ক ধরে ক্রমেই ভিতরের দিকে ঢুকে পড়লো। প্রায় ৬০-৭০ কিলোমিটার পথ স্বল্প সময়ে পাড়ি দিয়ে আমরা আল্পসের পাদদেশে সাদা বরফের মধ্যে পা রাখলাম। স্থানটির নাম ‘হোকইয়াবরিং’। অপূর্ব সুন্দর এক দৃশ্য। চারিদিকে শুধু বরফ আর বরফ। পাহাড়ের পর পাহাড় একেবারে চূড়া থেকে সমতল পর্যন্ত বরফে ঢাকা। সেখানে দেশি-বিদেশী শত শত পর্যটকের ভিড়। প্রায় ঘণ্টা দুই সেখানে কাটিয়ে আমরা আবারো ফিরে আসলাম জুরিখ শহরে। ততোক্ষণে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। আমরা দ্রুত দুপুরের খাবার খেয়ে ফেরার প্রস্তুতি নিলাম। সন্ধ্যা সাতটায় আমাদের প্যারিস যাবার ট্রেন। আতিক ভাই ও ভাবীর আতিথেয়তায় মুগ্ধ আমরা বিদায় জানালাম জুরিখ শহরকে।

ছবি: লেখক