জীবনের কত বদল কেউ কি তা জানে

কনকচাঁপা শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

আমার মা জননী, তার বাপের বাড়ি সিরাজগঞ্জ এর বাগবেড় গ্রামে। এতো গহীন গ্রাম খুব কমই দেখেছি। কিন্তু মায়ের আমলেই সে গ্রামে মক্তব, মাদ্রাসা, পাঠশালা উচ্চবিদ্যালয় সবই ছিল। মার দাদা ছিলেন পন্ডিতমশাই। তখনকার দিনে পন্ডিতমশাই এর সম্মান আকাশ সমান। গ্রামে নিয়মিত বাচ্চারা পড়াশোনা করতো। স্বাস্থ্যসেবার জন্য ডাক্তার বদ্যি সবই ছিল। ডাক্তার নিয়মিত টিকা দিতে আসতেন। কয়েকজন ডাক্তার এর মধ্যে মার কাছে জলধর ডাক্তার এর গল্পই বেশী শুনি। তিনি বাচ্চাদের টিকা দিতে আসলে সঙ্গে লাল নীল লজেন্স আনতেন। তবুও বাচ্চারা তাকে যমদূত এর মতো ভয় পেতো। ডাক্তার বাড়ি আসলে বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যেতো। আম্মা এতো সুন্দর করে গল্পগুলো বলেন যে মনে হয় আমি সব ছবি ফ্ল্যাশব্যাক এ দেখছি। জলধর ডাক্তার আসলে নানীবুজি নানান রকম সেমাই, সুজি পিঠাপুলিতে আপ্যায়ন করতেন। আম্মারা সব সময়ই ভাবতেন এতো মজার নাস্তা খাওয়ানো হচ্ছে, ডাক্তার নিশ্চয়ই বলবেন আজ অনেক মজার খাওয়া খেয়েছি আজ আর সুঁই ফুটাবো না, বা এখুনি বলবেন আমার সুঁই টা ভেঙে গেছে, অনিবার্য কারণ বশতঃ এবারের টিকা বা ইনজেকশন দেয়া যাচছে না! আম্মা দরজার আড়ালে গিয়ে এমনই শুভকামনা জানাতে হাত তুলে মোনাজাত করতেন। কেঁদে জারজার হতেন। কিন্তু কিসের কি। নচ্ছার হৃদয়হীন ডাক্তার ইয়া বড় চকচকে সুঁই বের করে সূর্যের আলোয় ভয়ঙ্কর ভাবে নাড়াচাড়া করে বলতেন গরম পানি আনতে বলেন। একে সুঁই তায় গরম পানি! জলধর ডাক্তার কি মানুষ নাকি! সেই সুঁই ভরে ওষুধ নিয়ে তিনি একে একে সবাইকে ডেকে নিতেন, মিটিমিটি হাসতেন আর পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে হৃদয়হীন (???) দানবীয় ভঙ্গিতে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে টিকা বা ভ্যাকসিন দিতেন। বাবা চাচারাও এমন নির্দয় দানব কে সাহায্য করতে নিজ বাচ্চাকে চেপে ধরতেন। যেন দুনিয়াতে মায়া দয়া বলে কিছুই নেই। হাহাহাহাহা হাহাহাহাহা। মায়ের গল্প শুনে সত্যিই মায়া লেগে মুখে অস্ফুট উচ্চারণ বের হয়ে আসে … আহারে! এর পরই মা বলেন আসল কথা। সবার পালা শেষ করে নির্দয় জলধর আসেন আম্মাকে ধরতে। আম্মা তাঁর বাপচাচা, ডাক্তার সবার হাত গ’লে বের হয়ে দেন ভোঁ দৌড়। জলধর ও কম যান না। তিনি সুঁই ফেলে আম্মার পিছন পিছনে সারা গ্রাম দৌড়ে বেড়ান এবং শেষ অবধি আম্মাকে টিকা দিয়েই ছাড়েন। রোজবারই এমন ঘটনার অবতারণা হয়। যেমনটি আম্মা, তেমনি জলধর। জলধরের লেবেনচুশ চিকিৎসা কোন কাজেই লাগতো না। অনেক বড় হয়েও আম্মা এমন করেছেন। নিজেই এ গল্পগুলো করেন আর জলধর ডাক্তার এর জন্য মন খারাপ করেন। বলেন আহারে, বুড়ো মানুষটাকে কি যন্ত্রণাই না দিয়েছি! জীবনে অনেক গল্প অনেক কথামালা অনেক ঘটনা অনেক রকম করে ফিরে ফিরে আসে। আজ প্রায় তিরিশ বছর ধরে আম্মা মধুমেহ রোগের অধিকারী, ডায়াবেটিস। নিয়মিত হাঁটা, খাবার নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত চেকআপ সবই করেন লক্ষী মেয়ের মত।

আম্মার ডায়াবেটিস এর বিশেষজ্ঞ হেসে হেসে রোজবারই বলেন, আপনার সব অর্গান এতো ভালো আছে, আপনি তো গুডগার্ল! আমার সব রুগী এমন ভালো হলে আমাদের মত ডাক্তার দের তো থালা নিয়ে মসজিদের সামনে বসতে হবে! আম্মা তার অপূর্ব হাসি হাসেন কিন্তু বিষণ্ণ সুরে। আমি বাসায় এসে বলি, আম্মা, ডাক্তার তো খুব ভালো কথা বললেন, আপনার মন খারাপ কেন আম্মা? আম্মার কতক্ষণ চুপ থেকে বলেন এখন কত নিয়ম মানি, সব হুকুম পালন করি কিন্তু ছোট বেলায় জলধর ডাক্তারকে কতই না জ্বালিয়েছি! আমি বলি আম্মা, তার শাস্তি তো আপনি পাচ্ছেন! (এগুলো আমার দুষ্টামি মাখা মন্তব্য, মা তা বোঝেন) মা বলেন যেমন? আমি বলি বছরে একবার দুইবার টিকার ভয়ে সারা গ্রাম জলধর কে বাধ্য করেছেন দাবড়ে বেড়াতে, আর এখন? এখন দুইবেলা নিজ দেহে নিজ হাতে সুঁই ফোটান! আম্মা নির্বাক চোখে শুন্যতার দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ হয়ে থাকেন। আমার আর একবার মনে হয় জীবন এভাবেই জীবনের উপর শোধ নেয়, তা আগে আর পরে। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তেমন না, জলধর ডাক্তার বেঁচে থাকলেও কখনোই এমনটি চাইতেন না। তবুও যখনই আম্মা ইনসুলিন নিতে রেডি হন তখনো আমার একটা নাম মানসপট এ ভেসে ওঠে —–জলধর ডাক্তার!

ছবি: লেখক