আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ি নয়

পৃথিবীর বুকে আবার কি ফিরে এলো লেখক হারমেন মেলভিলের উপন্যাসের অবিস্মরণীয় তিমি-চরিত্র মবি ডিকের ভূত?গভীর সমুদ্রে বেঁচে থাকা এক ভয়ঙ্কর সাদা তিমি মাছ আর এক পা খোঁড়া তিমি শিকারী ক্যাপ্টেন এহাপের প্রতিশোধের আগুনে পোড়ানো কাহিনী এবার সত্যি সত্যি মঞ্চায়িত হচ্ছে পৃথিবীতে? নিয়তির মতো সেই তিমি মাছ বইয়ের পাতা থেকে বের হয়ে এসে তাড়িয়ে ফিরছে পৃথিবী জুড়ে কিশোর কিশোরীদের?

চারদিকে আলোচনা ‘ব্লু হোয়েল’ গেম নিয়ে। ইন্টারনেটে এই খেলা কিশোর-কিশোরীদের ঠেলে দিচ্ছে আত্নহত্যার দিকে। কেন? সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার দায়িত্ব মনোবিজ্ঞানীদের, সমাজবিজ্ঞানীদের। আমরা শুধু ভাবতে পারছি এটি কেনো খেলা নয়। মঞ্চে চলছে বিশ্বাস আর আস্থা হারিয়ে ফেলা এক রুগ্ন সময়ের নাটক। এই ‘ব্লু হোয়েল’ গেম নিয়েই এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন।  

রুশ দেশের কোনো শহরে হয়তো ঘড়ি দেখছে এক কিশোরী। ভোর সাড়ে চারটায় তাকে উঠতে হবে নিজের বাড়ির ছাদে। তারপর হেঁটে যেতে হবে বহুতল বাড়ির ছাদের রেলিং ধরে। তার জন্য অপেক্ষা করছে নির্মম মৃত্যু। আবার হয়তো ওই একই সময়ে ভারতের একটি রাজ্যে স্কুলগামী কিশোর তার নিজের হাত ধারালো ব্লেড দিয়ে কেটে ছবি আঁকছে তিমি মাছের। তার হাত বেয়ে রক্তের ধারা নেমে মিশে যাচ্ছে ভোরের আলোয়। এদের দুজনের কাছেই জীবনের চাইতেও হয়তো বিষ্ময়কর মৃত্যু। আর তাদের হাত ধরে এই মৃত্যুর অন্দরমহলে নিয়ে যাচ্ছে ‘ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ’ নামে এক মারণখেলা। হাইওয়ে দিয়ে হেডলাইট আর আয়না খুলে গাড়ি চালিয়ে আসা, ছাদ থেকে ছাদে ঝাঁপ দেওয়া, নিজের শরীরে সূচ ফোটানো আর সবশেষে আত্মহত্যা। জীবনের ওপর অনন্তকালের যতিচিহ্ন। ঘটনাগুলো যেন মৃত্যুতেও নতুন বৈচিত্র খুঁজে নেয়ার মতো। জন্মের পর তো সব কিছু একই রকম। তাই  মরে যাওয়াতেই কিছু রহস্য আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ খুঁজছে তারা।  আর সেটা কোনো খেলার কারণে হলে তো কথাই নেই। সেই খেলার যমদূত এখন নীল তিমি। পৃথিবী জুড়ে ইন্টারনেটে কিশোর-কিশোরীরা মেতে উঠেছে এই খেলায়।এই খেলাকে ডাকা হচ্ছে ‘ডেথ গেম’ নামেও।

কেউ বলছেন, গোটা ব্যাপারটাই আসলে মিথ্যা। এরকম কোনো খেলার অস্বিত্বই নেই। কেউ পর্দার আড়াল থেকে ভয় ছড়িয়ে দিচ্ছে। আবার কেউ বলছেন, এরকম খেলা আছে। আর সেটা ছড়াচ্ছে জঙ্গীবাদীরা। গোটা পৃথিবী জুড়ে অশান্তি আর অস্থিরতা ছড়িয়ে দিতে তাদের এই নিখুঁত পরিকল্পনা। যদি বলা যায় এই একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে মানুষের সমাজে ছড়িয়ে পড়া অবিশ্বাস আর অস্থিরতাই এক নীল তিমির রূপ নিয়ে তাড়া করছে আমাদের? তিমি মাছেরা কখনো কখনো সদলবলে সমুদ্রের তীরে উঠে এসে শুয়ে থাকে। ধীরে ধীরে তাদের ফুসফুস অক্সিজেন টানতে ব্যর্থ হয়। তাদের জীবনের ওপর নেমে আসে মৃত্যু। গবেষকরা বলছেন এটা তিমিদের আত্নহত্যা প্রবণতা। কিন্তু কেন তারা এভাবে মরে যায় তার কারণ সম্পর্কে কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না। ‘ব্লু হোয়েল’ খেলার পুতুল হিসেবে ব্যবহৃত কিশোর-কিশোরীরা তাহলে কোন প্রবণতার অংশ হয়ে উঠছে? তাদেরকে কি শিকার করছে আস্থাহীনতা আর জীবনের অর্থহীনতা?

এই ভয়ঙ্কর খেলার স্রষ্টা ২২ বছর বয়সী এক রুশ তরুণ। তার নাম বুদেকিন। সম্প্রতি সার্বিয়ার একটি কোর্ট তাকে তিন বছরের কারাদন্ড দিয়েছে এই খেলার মাধ্যমে টিনেজারদের আত্নহত্যায় প্ররোচিত করার অপরাধে। বুদেকিন নির্লিপ্ত। কোর্টে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে সে দায় স্বীকার করে বলেছে, পুরোটাই তার পরিকল্পনার অংশ। যাদের কোনও মূল্য নেই সমাজে তাদের আত্মহত্যা করিয়ে বুদেকিন  সমাজ জঞ্জাল মুক্ত করতে চায়।

তাহলে বুদকিনের কথার অর্থ কী দাঁড়ালো? যারা এই খেলায় অংশ নিয়ে শেষ পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে তারা কার্যত নিজেদের সমাজে মূল্যহীন জঞ্জাল বলে মেনে নিচ্ছে?

অনেকদিন আগে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল একটি মেয়ে তিমি মাছের নিঃসঙ্গতা নিয়ে। তিমি মাছটির পৃথিবীতে কেউ নেই। অসীম জলরাশির মধ্যে একা ঘুরে বেড়ানোই ছিল তার কাজ। বিজ্ঞানীরা এই তিমিটিকে ১৯৯২ সাল থেকেই লক্ষ্য করছিলেন। তাদের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়লো তিমিটি তার অন্য স্বগোত্রীয়দের মতো না। অন্য তিমি মাছদের মতো তার কোন বন্ধু নেই, কোন পরিবার নেই। সে কোন দলেরও নয়। তাকে ভালোবাসার কেউ নেই।

আমরা জানি তিমিরা গলা দিয়ে বিশেষ এক ধরণের শব্দ করতে পারে। অনেকে বলে, সেটা নাকি গান। যখন একটি তিমি এরকম শব্দ করে সমুদ্রে অন্য তিমিরাও গলা মেলায়, সেই আওয়াজ তাদের একত্রীত করে। এভাবে তারা একসঙ্গে দল বেঁধে চলাচল করে। কিন্তু সেই মেয়ে তিমির গান সেরকম কিছুই ঘটাতে পারতো না। তার কণ্ঠস্বর অন্য তিমিদের মতো ছিলো না। গবেষকরা দেখলেন যেখানে স্বাভাবিক একটি তিমি মাছের আওয়াজের ফ্রিকোয়েন্সি ১২ এবং ২৫ মেগাহার্টজ, সেখানে সেই  নিঃসঙ্গ তিমির ফ্রিকোয়েন্সি ছিল প্রায় ৫২ মেগাহার্টজ। গবেষকরা বুঝতে পারলেন এটাই এই তিমির মূল সমস্যা।তার এই হাই ফ্রিকোয়েন্সির জন্য অন্য কোন তিমি মাছেরা তার গান অনুভব করতে পারে না।তাই তার সেই গান, সেই ডাক কান্নায় পরিণত হয়ে ফিরে ফিরে আসে। আর তাতে সে হতাশ হয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনটি পড়তে পড়তে মনে হলো, পৃথিবী জুড়ে আত্নহত্যাপ্রবণ এই কিশোর-কিশোরীরা কি তাহলে সেই নিঃসঙ্গ তিমি মাছটির মতোই? তাদের কথা স্বজাতিরা কেউ শুনতে পাচ্ছে না। তাদের গান শূণ্যতায় মাথা কূটে ফিরে আসছে কান্না হয়ে?জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন সেই অমোঘ লাইন ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন’। হয়তো পৃথিবী জুড়ে এখন সেই গভীরতর অসুখের কাল চলছে। এরা নিজেদের জীবনকে অর্থহীন ভেবে সব দায় শেষ করে দিতে চাইছে।

আমেরিকার উপন্যাসিক হারমেন মেলভিল ১৮৫১ সালে লিখেছিলেন ‘মবিডিক’ উপন্যাসটি। তার মৃত্যুর অনেক বছর পর বিংশ শতাব্দীতে এসে উপন্যাসটি গোটা পৃথিবীতে আলোচিত পাঠক প্রিয় হয়ে ওঠে। গল্পের সেই তিমি মাছ একবার খেয়ে ফেলেছিল উপন্যাসের সেই অসাধারণ চরিত্র ক্যাপ্টেনের একটি পা। তাকে মারতেই সমুদ্রে ঘুরে বেড়াতো এহাপ। উপন্যাসের অন্তিমে সেই ভয়াল তিমিটি হত্যা করে তা প্রতিদ্বন্দ্বী ক্যাপ্টেনকে। জাহাজটাও ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়ে আবার সে হারিয়ে যায় আটলান্টিক সাগরের রহস্যময় জলরাশির তলায়। কিন্তু আজকে একবিংশ শতাব্দীতে এই ‘ব্লু হোয়েল’ হয়ে উঠেছে আমাদের জীবনের প্রতিদ্বন্দ্বী। জানা যাচ্ছে পুরো খেলায় ৫০ দিন ধরে ৫০টি কাজ করতে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে কিশোর-কিশোরীদের। তারপর নিছক কৌতুহলের মাকড়সা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে তাদের আটকে ফেলছে মৃত্যুর জালে। কেউ খেলতে না চাইলে তাদের হুমকী দেয়া হচ্ছে  গেম অ্যাডমিনের পক্ষ থেকে। বলা হচ্ছে খেলতে না চাইলে তাদের পরিবারের সদস্যদের খুন করা হবে।

ঢাকার বাসিন্দা কিশোরী স্বর্ণা তার সুইসাইড নোটে লিখে রেখে গেছে ‘‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ি নয়’’। স্বর্ণার পরিবার থেকে বলা হয়েছে সে ‘ব্লু হোয়েল’ গেম খেলতো বলে তাদের সন্দেহ। এই মৃত্যুর দায় তাহলে কার, একা স্বর্ণার না আমাদের সমাজের? নিজেদের জীবনকেই এভাবে উদ্বৃত্ত ভাবতে শুরু করা এই কিশোরীটির মনের মধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরী হয়েছিল সেটাই নিভিয়ে দিলো তার জীবন প্রদীপ। প্রশ্নটা ভয়ঙ্কর এক নীল তিমির আকার ধারণ করে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

শৈশবে অলস কোনো দুপুরে একা একাই যুদ্ধ করেছি হয়তো ছায়ার সঙ্গে। কোন গাছ, বারান্দার রেলিং অথবা মনটাকেই জলদস্যুদের জাহাজ বানিয়ে ভেসে গেছি দূর সমুদ্রে গুপ্তধনের আশায়। যেন আমিই ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’ উপন্যাসের কিশোর জিম। সেই সব অদৃশ্য যুদ্ধে কতবার পরাজয় ঘটেছে, জয় এসেছে। কিন্তু কখনো মৃত্যুদূত হয়ে সেই নির্দোষ খেলাগুলো তাড়া করেনি। স্বপ্ন দেখার পথটা তখন হয়তো আমাদের জানা ছিলো। কাল্পনিক দূর পৃথিবীর অজানা রোমাঞ্চ মনকে হয়তো আনন্দে ভরে দিতো। কারণ তখন আমাদের মন ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থায় বেড়ে উঠে সবকিছুর প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করেনি। চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসেনি জীবনকে।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল