আপনার মনের জোরের প্রমান দিন

খাদিজা ফাল্গুনি

ব্লু হোয়েল ডেয়ারের শুরু ২০১৩ সালে। আর এর স্রষ্টা, ফিলিপ বুদাইকি এই ডেয়ার গেমের প্ল্যান করছিলো তারও পাঁচ বছর আগে থেকে।

বয়:সন্ধির অসম্ভব জটিল সময়ে সারাক্ষনই বড়ভাই আর মায়ের হাতে মার খেত ফিলিপ। স্কুলে তার কোন বন্ধু ছিলো না, সে কারো সঙ্গেই মিশতে পারতো না। বছর তিনেক সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং আর সাইকোলজি নিয়ে পড়ার সময়েই তার এই পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায় এবং তাকে বহি:ষ্কার করা হয়। এই ঘটনাটির তদন্তকারী অ্যান্টনি ব্রেইডোর অনুসন্ধানে জানা যায়, ফিলিপ পড়াশোনা করতো না বললেই চলে, এবং সারাক্ষণ ইন্টারনেটে পড়ে থাকতো। দেখতে খুব একটা খারাপ ছিলো না, ফলে সহজেই কমবয়সী মেয়েদের আকর্ষন করতে পারতো সে।

ফিলিপ বুদাইকি

ফিলিপ বুদাইকি অনলাইনে ফিলিপ লিস (শেয়াল) পরিচয়ে যোগাযোগ করতো। সাইকোলজির ছাত্র ছিলো, দুই এক কথার পরেই ধরে ফেলতে পারতো কে মানসিকভাবে দুর্বল। ধীরে ধীরে সে এদের বিশ্বাস অর্জন করতো, মেন্টাল সাপোর্ট দিতো, আর আস্তে আস্তে তাদের বিচার, বুদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার করতো। বিচারের সময় জুরিরা ধারনা করছিলেন, কারো জীবনে স্থান না পাওয়া ফিলিপ লিস যখন আবিষ্কার করতো কিছু মানুষের ভালো থাকা, খারাপ থাকা, এমন কী মৃত্যুর সিদ্ধান্তও সে নিতে পারে, তা তাকে একধরনের অসুস্থ আনন্দ দিতো। এবং তাদের সে করুণাও করতো না, ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতো। তারই ৫০দিনের প্রসেসকে বলা হয়েছে ব্লু হোয়েল ডেয়ার।

ফিলিপ বুদাইকির স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, সে নিজেই কমবয়সী, দু:খবিলাসী মানুষদের খুঁজে বের করতো, এবং ডেয়ার প্রোগ্রামে আনার জন্যে প্রভাবিত করতো। সে খেয়াল রাখতো এই ভিকটিম বা চ্যালেঞ্জগ্রহনকারীরা যেন কোনমতেই ঠিকমতো ঘুমাতে না পারে এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। এজন্য সারাক্ষণ ভুতের ভয় দেখিয়ে, ডিপ্রেসিং মিউজিক শুনিয়ে স্নায়ু দুর্বল করিয়ে রাখতো। পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করিয়ে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতো। টাস্কের অংশ হিসেবে ড্রাগস ধরিয়ে বিবেক বোধ বিচারশক্তি বিহীন করে ফেলতো। ভিকটিম এমন অবস্থায় পৌছে যেত সেখানে সে ফিলিপের আদেশ ছাড়া কিছুই করতে পারতো না, শারীরিক, মানসিকভাবে তাদের একপর্যায়ে মনে হতে থাকতো ফিলিপের আদেশ বা মৃত্যুই তাদের মুক্তির একমাত্র পথ।

এসব ফিলিপ কেন করতো? সে স্পষ্টভাবেই বলেছে, ‘তার বিশ্বাস এসব মানুষ সমাজের জঞ্জাল ছাড়া কিছু না। স্বাভাবিক ও হতাশ এসব মানুষের দলভাগ করা খুবই দরকার, এবং এদের সরিয়ে সমাজকে পরিষ্কার করতে হবে।’ ফিলিপ বিশ্বাস করতো, এরা কোনদিনই ভালো কিছু করতে পারবেনা। সে একাই ১৭টি মেয়েকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলো, বলেছিলো, এমন আরো ২৮জন তৈরি আছে যারা যেকোন মুহুর্তে সুইসাইড করবে, সে না থাকলেও।আদালতে প্রমানিত হয়েছে যে ফিলিপ বুদাইকির বাইপোলার। এটার মানে হলো সে সারাক্ষণই ম্যানিক ডিপ্রেশনে ভোগে, সবসময় নিজের মুড অনুযায়ী অন্যদের সঙ্গে যা খুশি তা ব্যবহার করে এবং প্রায় সময়ই সেসব আচরণ মারাত্মক আকার ধারণ করে। বাইপোলার, ম্যনিয়াক, সাইকো যাই বলেন না কেন, জেলে থাকা অবস্থায় এই ফিলিপের কাছেই হাজার হাজার প্রেমপত্র পাঠিয়েছে তার প্রভাবে থাকা মেয়েরা। তারা অপেক্ষায় আছে কবে ফিলিপ তার তিনবছরের সাজার মেয়াদ শেষে বের হবে। ফিলিপ যে চ্যালেঞ্জ ২০১৩তে বন্ধ করেছে তাই জানাজানি হয়ে একটা চ্যালেঞ্জ বের হয়ে গেছে, যেটার লিংক খুব বেছে নির্বাচিত করা শিকারদের গোপনে শেয়ার করা হয়, এবং এই ডেয়ার নেয়া এখন বিশ্বজুড়ে ট্রেন্ডে পরিনত হচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, ফিলিপ বুদাইকি এই ব্যাপারটা একদমই পছন্দ করে নাই!

কয়েকটা জরুরি বিষয়ঃ

* ফিলিপের শিকারদের কেউই তাদের সোস্যাল মিডিয়ার অ্যাপে পরিবারের সদস্যদের অ্যাড রাখতো না। তারা কী করছে, কী ভাবছে, প্রাইভেসির নামে সবই পরিবারের সদস্যদের কাছে গোপন রাখতো। ফিলিপের একটা প্রধান লক্ষ্য থাকতো ওই দূরত্বটাকে স্থায়ী করে দেয়া। তাই যারা যারা ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম বা অন্যান্য সোস্যাল অ্যপে পরিবারের সদস্যদের ব্লক করে রাখেন, তারা এইবার অন্তত বোঝেন বিপদটা।

*  এই ট্রেন্ডে পড়ে যারা মরেছে বা মরার জন্যে প্রস্তুত হয়েছে সবার মনে হতো তাদের কেউ ভালোবাসে না। তারা একা বড় একা। এই সব দু:খবিলাসী, আত্নকেন্দ্রিক মানুষগুলো ভারচুয়াল জগতে পড়ে থাকতো ভালোবাসার খোঁজে।

* এইবার অন্তত সারাক্ষণ ‘কিচ্ছু ভালো লাগেনা’ রোগ থেকে বের হন। অবস্থা বেশি খারাপ হয়ে গেলে বিশ্বস্ত কারো সঙ্গে শেয়ার করেন, পরিবারকে সময় দেন। নিজের দু:খ সরিয়ে মায়ের সঙ্গে মিলে একদিন ঘর মোছেন, বাবার সঙ্গে বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে কাঁচাবাজারে, মাছ বাজারে ঘোরেন। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের আড্ডাখানা, আর অলস নেটব্রাউজিং ফিলিপ বুদাইকিদের অসুস্থ মনো:বিকারের শিকার খোঁজার জায়গা।কেন এমন এক ম্যানিয়াকের চ্যালেঞ্জে পা দেবেন আপনি? নিজের মনের জোর পরীক্ষা করে দেখার জন্য? নিজেকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট? বাপু, এতই যদি মনের জোর থাকে তাহলে ওই চ্যালেঞ্জ না নিয়ে থাকেন দেখি?

ছবি: গুগল