তিতাসের ঋত্বিক

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমার স্ক্র্যাপবুকের পৃষ্ঠা যেন উল্টে গেলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট চলচ্চিত্র প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান। পরিচালকের আসনে বাংলা সিনেমার প্রবাদসম পরিচালক ঋত্বিক ঘটক আর প্রযোজকের ভূমিকায় তিনি। কত স্মৃতি সেই মানুষটিকে ঘরে।বলতে বলতে সময় পিছিয়ে গেল চল্লিশ বছরেরও  আগে।

ঋত্বিক ঘটক একবার বলেছিলেন, ‘‘আমৃত্যু আমার জীবনে কম্প্রোমাইজ করা সম্ভব নয়। সম্ভব হলে তা অনেক আগেই করতাম এবং ভালো ছেলের মতো বেশ গুছিয়ে বসতাম কেতা নিয়ে। কিন্তু তা হয়ে উঠলো না, সম্ভবত হবেও না। তাতে বাঁচতে হলে বাঁচবো, না হলে বাঁচবো না। তবে ওই ভাবে শিল্পকে কোলবালিশ করে বাঁচতে চাই না’’।

বাংলা চলচ্চিত্রে অনমনীয় এক নাম ঋত্বিক কুমার ঘটক। সিনেমা তৈরী করেছেন, অর্থনৈতিক দৈন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, নিজস্ব শিল্পবোধ আর চিন্তাকে কখনো জলাঞ্জলি দেননি শুধু বেঁচে থাকার জন্য।তাঁর চেতনায় মানুষ কখনোই অনুপস্থিত থাকেনি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ দেশে এসে ঋত্বিক নির্মাণ করেছিলেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমা। দেশভাগ, উন্মূল মানুষের যন্ত্রণা সেখানে বন্দী হয়েছে সেলুলয়েডের ফিতায়। প্রযোজক হাবিবুর রহমান খানের আশীর্বাদ চলচ্চিত্র এদেশে নির্মাণ করেছে তিতাস একটি নদীর নাম, পদ্মা নদীর মাঝি, বড় ভালো লোক ছিল, মনের মানুষ ও শঙ্খচিলের মতো সিনেমা। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিটি নির্মিত হওয়ার প্রায় ৪৫ বছর পর প্রাণের বাংলার সঙ্গে কথা বললেন হাবিবুর রহমান, বিষয় ঋত্বিক ঘটক ও ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমা। একেবারে ভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে দেখা অন্য এক ঋত্বিক ঘটক উন্মোচীত হলেন এই কথোপকথনে।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন সেই ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে। হাবিবুর রহমানের লেখা পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ প্রাণের বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে মুদ্রিত হবে।

ঋত্বিক ঘটক ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিটির স্ক্রিপ্ট লেখা শেষ করেছিলেন বাংলাদেশে। জায়গাটা তৎকালীন ঢাকেশ্বরী কটন মিলসের গেস্ট হাউজ। ছবি করতে ঢাকায় আসার পর তাকে ওখানেই রেখেছিলাম। তবে এই উপন্যাসটি নিয়ে সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনা তাঁর অনেক আগে থেকেই ছিল। কলকাতায় বসেই চিত্রনাট্য তৈরীর প্রাথমিক কিছু কাজ করেছিলেন এ তথ্য অবশ্য আমি পরে ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর জানতে পারি।

সিনেমা প্রযোজনা করলে সেটা ঋত্বিক ঘটককে নিয়েই করবো এরকম একটি পরিকল্পনা আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করে ১৯৬৪ সাল থেকেই।

হাবিবুর রহমান খান

প্রশ্ন উঠতে পারে তখন আমি বাংলা সিনেমার প্রবাদতুল্য এই পরিচালক সম্পর্কে জানলাম কিভাবে? আসলে ১৯৬২ সাল থেকেই ঢাকায় ভারতীয় বেশকিছু পত্রিকা বিশেষ করে সিনে পত্রিকা গোপন পথ ধরে চলে আসতো। ওই সময়ে ঢাকার স্টেডিয়াম এলাকায় একটি ছোট্ট্ চাকা ঠ্যালা গাড়িতে ওসব পত্রপত্রিকা বিক্রি হতো। আমি ওই পত্রিকাগুলোর প্রায় নিয়মিত পাঠক ছিলাম। সেখানেই আমি ঋত্বিক বাবুর লেখা পড়ে তার সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠি।সেই ঝোড়ো হাওয়ার মতো মানুষটিকে তখনই আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম।

ওই সময়ে আমি ছাত্র রাজনীতি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি। হয়ে উঠি তৎকালীন ছাত্রলীগের গোপন ‘নিউক্লিয়াস’-এর কনিষ্ঠ সদস্য। পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষণ আর বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখতাম আমরা। তখন আমার মনে হতো দেশ স্বাধীন হলে আমি ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায় একটি সিনেমা প্রযোজনা করবো। আসলে আমি তো এমনি এমনি অথবা জীবনের তাগিদে সিনেমা তৈরীর কাজে নাম লেখাইনি। বলা যায় ঋত্বিক ঘটকই আমাকে টেনে এনেছিলেন এখানে। তাঁর আকর্ষণেই আমার চলচ্চিত্র প্রযোজনার সূচনা।

দু’একজনের কাছে তখন আমি আমার এই স্বপ্নের কথাটা বলেছিলাম। তারা সবাই পাগল বলেছিল আমাকে। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে বসে এই স্বপ্ন সফল হবে না কখনো এটাই ছিল তাদের বক্তব্য। কিন্তু আমি আমার স্বপ্ন বিসর্জন দিইনি।

তারপর অনেকটা সময় বয়ে গেলো। আন্দোলন আর সংগ্রামের উত্তাল স্রোতে ভেসে গেলাম আমিও। তারপর এলো ১৯৭১ সালের নয় মাসে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। আমি যুদ্ধে গেলাম। নয় মাস যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে ইতিহাসের পাতায় উত্থান ঘটলো স্বাধীন বাংলাদেশ নামে রাষ্ট্রের। আমি যুদ্ধ থেকে ফিরে এলাম। মাথা থেকে কিন্তু সিনেমা তৈরীর স্বপ্ন গেলো না।

১৯৭২ সালে হঠাৎ করেই সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়ে গেলাম। সুযোগের কথা বলতে গেলে একটু পিছিয়ে যেতে হবে। ১৯৬৯-৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কিৃতিক সংস্থা’।উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক চর্চার ধারাকে আরো জোরদার করা।

আমি ওই সংগঠনের অর্থ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ঢাকায় এলেন বাংলা সিনেমার আরেক অনন্য নির্মাতা সত্যজিৎ রায়। ঢাকার হোটেল পূর্বানীতে আমি দেখা করতে যাই তার সঙ্গে । সেখানেই পরিচয় হয় সত্যজিৎ রায়ের সহকারী বরুণ বক্সীর সঙ্গে। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর তিনিই প্রথম আমাকে সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় চলচ্চিত্র তৈরী করার প্রস্তাব দেন। সেদিন বরুণ বক্সীর প্রস্তাবে রাজি হইনি। তাকে আমি বলি, আমি সিনেমা তৈরী করতে চাই ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায়। কথাটা শুনে খানিকটা অবাক হয়েছিলেন বরুণ। বারবার জানতে চেয়েছিলেন আমি নিশ্চিত হয়ে বলছি কি না? আমি তখন অ্যাডামেন্ট সিনেমা তৈরী করলে ঋত্বিক ঘটকে নিয়েই করবো।

বরুণ বক্সী ফিরে গেলেন কলকাতায়। সেখানে তিনি খুঁজে বের করলেন উড়ুনচন্ডী ঋত্বিক ঘটককে। তাঁকে নিয়ে এলেন নিজের বাড়িতে। কিছুদিন বরুণ বক্সীর বাড়িতেই চললো ঋত্বিক ঘটকের চিকিৎসা ও পরিচর্যা। তখন ঋত্বিক ঘটক রীতিমতো মদ্যপানে আসক্ত। উনি কিছুটা ভালো হলে বরুণ আমাকে খবর পাঠায়। আমি তড়িঘড়ি করে চলে যাই কলকাতায়। আমার সামনে তখন একটিই আকাঙ্ক্ষা ঋত্বিক ঘটকের মুখোমুখি হওয়া।

আমাদের দেখা হয়েছিল বরুণ বক্সীর কলকাতার বাড়িতে। সময়টা সম্ভবত ফ্রেব্রুয়ারী মাস। প্রথম দিন ঘরে ঢুকে দেখেছিলাম বিছানায় শুয়ে আছেন তিনি। পরনে সাদা পাঞ্জাবী আর পাজামা।সেদিন দেখে মানুষটাকে আমার অন্যরকম মনে হয়েছিল। পত্রিকায় দেখা তার সেই ভীষণ এলোমেলো, অগোছালো অবয়বের সঙ্গে কোনো মিল ছিলো না। ওই বাড়িতে বসেই আমি তাঁকে প্রস্তাব দিলাম সিনেমার ব্যাপারে। উনি জানিয়ে দিলেন, অদ্বৈত মল্লবর্মণের বিখ্যাত উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মাণ করতে চান। আমি এক মুহূর্ত না ভেবে তাঁর প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিলাম। কারণ আমার তো কাহিনী নিয়ে কেনো চিন্তা ছিলো না। আমি শুধু ঋত্বিক ঘটকের কথাই ভেবে রেখেছিলাম।

এরপর কিছুদিন আমি কলকাতায়-ই রয়ে গেলাম। তখন ওই অসাধারণ মানুষটির সান্নিধ্যেই কাটতো আমার দিনরাত্রি।ওই সময়ই উনি আমাকে ‘সুবর্ণরেখা’ ছবিটি দেখার প্রস্তাব দিলেন। তখন কলকাতায় বেশ কয়েকটি মিনিয়েচার হল ছিল। স্বল্প সংখ্যক দর্শক নিয়ে সিনেমা প্রদর্শনের ব্যবস্থা হতো সেখানে।সেরকমই একটি হলে ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে বসে দেখলাম সুবর্ণরেখা। মাত্র ২৬ বছর বয়স তখন আমার। সেই সিনেমাটি দেখার মুগ্ধতা আজো কাটেনি। ওই বছর-ই এপ্রিল অথবা মে মাসে তিনি আমার সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন। ছবির শ্যুটিং শুরু হয় ১৩ জুলাই। এর আগে বেশ কয়েকদিন ওনাকে ঢাকেশ্বরীর গেস্ট হাউজে রাখার ব্যবস্থা করি। ওখানে বসেই স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ চলতে থাকে। তিতাস একটি নদীর নাম ছবিটি আমি পূর্বপ্রাণ কথাচিত্রের ব্যানারে পরিবেশন করি। মজার ব্যাপার হচ্ছে ঋত্বিক ঘটক নিজেই আমার জন্য এই নামটি ঠিক করে দিয়েছিলেন। পরে আমি অামার প্রযোজিত আর কোনো ছবি এই ব্যানারে পরিবেশন করিনি। থাকলো না হয় নামটা শুধু ঋত্বিক ঘটকের জন্যই।

মনে আছে শ্যুটিং লোকেশন দেখতে যাবার সময় পথে পড়েছিল তিতাস নদী। ঋত্বিক ঘটক গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে নদীর পানিতে গিয়ে দাঁড়ান। দু হাতের আঁজলা ভরে তিতাসের পানি ছিটিয়ে নেন নিজের চোখে মুখে। কাজটা কেন করছেন প্রশ্ন করতেই বলেছিলেন, ‘‘তুমি বুঝবে না, একটা স্বপ্নকে স্পর্শ করলাম’’।

অনুলিখনঃ ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ প্রাণের বাংলা, গুগল  

 

  • Lutful Hossain

    স্বপ্নের সঙ্গে কখনো বুঝিবা দেখা হয়েই যায়। স্বপ্নেরা বুকের ভিতর নিত্য যদি রক্তনদী জুড়ে অমন খেলা করে যায়।