কি রেখে যাবো ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য

রুখসানা আক্তার

(লন্ডন থেকে): রং ধনু চোখে চোখে ,কথা  কলি মুখে মুখে , এখানে মনের কথা বলো না ।কথা হবে মনে মনে , তুমি আমি নির্জনে ,যেখানে দিগন্তে আকাশ আর মাটিতে……।তখনকার এই গান গুলো যখন শুনি  , গান শুনতে শুনতে মন আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যায় সেই সব দিন গুলোতে। আমরা তখন হবিগঞ্জ স্টাফ কোয়াটারে থাকতাম। আমার তরুণী  ,ষোড়শী বোনদের বান্ধবী ছিলেন তখন মরিয়ম আপা, মাহমুদ আপা, সাঈদ আপা , মিনু আপা ,সাহানা আপা , লুৎফা আপা , আলেয়া আপা। তখন পরিবেশ এত খারাপ ছিল না। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ , ভালবাসা ,মমত্ববোধ , বিশ্বাস সীমাহীন ছিল।তাই মেয়েরা ছুটির দিনে খুব নির্ভয়ে নিজেদের পাড়ায় চলতে পারতো এমনকি সন্ধ্যা এবং রাতেও।  এই সব আপারা গ্রীষ্মের স্কুল কলেজের ছুটিতে দল বেঁধে আমাদের বাসায়  আমার বোনদের সঙ্গে গল্প করতে আসতেন । আমার বোনরাও বেড়াতে যেতেন। সন্ধ্যায় ঘরে গল্প করতে করতে হঠাৎ ইলেক্টিসিটি চলে গেলে সবাই রেডিও নিয়ে ছাদে চলে যেতেন। সন্ধ্যা সাতটায় সৈনিক ভাইদের  অনুরোধের আসর দুর্বার শুনার জন্য।

আমাদের বিল্ডিংটা খুব সুন্দর অবস্থানে ছিলো। আমাদের বাসাটা  পূর্ব দিকে বিল্ডিং এর এক মাথায় দোতলায় ছিলো। বাসার পরেই পূর্ব দিকে বিরাট দীঘির মতো বিশাল টলটলে পানির পুকুর ছিল।পুকুরের  পরেছিল কাঁটা তারের বেড়া।  যা দিয়ে স্টাফ কোয়াটারে বিশাল এলাকা সিকিউড  করা হয়েছিল । কাটা তারের বেড়ার পরই বিস্তীর্ণ ধান ক্ষেত। কচকচে সবুজ ধান ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে স্টাফ কোয়াটারে সীমানা থেকে শুরু হওয়া মেঠো পথ দূরের ইনতাবাজ গ্রামে গিয়ে দুই ভাগ হয়ে ডান দিকে চলে গিয়েছিল মাসুলিয়া গ্রামে আর বামে গিয়ে ইনতাবাজ গ্রামে ঢুকে গিয়েছিল। মাসুলিয়া গ্রামটার সারি সারি সুপারি গাছ আমাদের পুবের জানালা থেকেও চোখে পড়তো। আর ছাদে উঠলে একেবারে ইনতাবাজ গ্রাম , মাসুলিয়া আর অনেক দূরে সাদা কালো মেঘের সঙ্গে জিনার পুরের পাহাড় চোখে পড়তো।  খুব ভোরে ছাদে উঠলে ইনতাবাজ গ্রামের উঁচু উঁচু সবুজ  গাছ গুলোর ফাঁক দিয়ে আস্তে আস্তে  সিঁদুর রাঙা সূর্য উদয় দেখা যেত। বাসাটা একদম কর্নারে হওয়াতে ছাদে উঠলে রাতে চাঁদের আলোতে খুব সুন্দর স্বপ্নের মতো লাগতো চারিদিক। ইলেক্টিসিটি চলে গেলে চাঁদের আলো আরো বেশি করে ফুটে উঠতো  । আমি পুবের জানালায় বসে  ঝড় বৃষ্টির সময়  পুকুরের পানিতে বাতাসের বিভিন্ন রকমের ঢেউ এর খেলা দেখতাম। বৃষ্টিতে ধান ক্ষেতে ,ইনতাবাজ গ্রাম আর খেলার মাঠে  জমতে থাকা বৃষ্টির পানি দেখতে দেখতে মন আমাকে অন্য এক কল্পনার জগতে নিয়ে যেত। তখন নিজেকে নিহারঞ্জন গুপ্তের গল্পের কোনো নায়িকা বা আশুতোষ মুখপাধ্যের কোনো দুষ্ট নায়কের রাগী কোনো নায়িকার চরিত্রে কল্পনা করতাম। যা ছিল একান্তই আমার নিজস্ব জগৎ।

যাই হউক যা বলছিলাম । বড় আপাদের সঙ্গে ছাদে বসে  সন্ধ্যায় রেডিওতে দুর্বার অনুষ্টানে সাবিনা ইয়াসমিনের এই গান গুলো শুনতাম। আজ এই গানটি শুনতে শুনতে সে দিন গুলি চোখের সামনে ভাসছিল। কেমন একটা  কোনো কিছু হারিয়ে ফেলার চিন চিনে ব্যথাও বুকে অনুভব করছিলাম ।এই ভেবে যে সেই দিন আর মানুষ গুলো আর কোনোদিন ফিরবে না।

আমরা সবাই বদলে গেছি সঙ্গে গ্রাম , মাঠ , সবুজ ধান ক্ষেত, পুকুর আর সুপারি গাছ গুলো শেষ হয়ে সেই জায়গায় গুলোতে চুন সুরকি ,ইট ,সিমেন্ট দখল করেছে। আমরা এখন অবসর সময়ে গান শুনি না । বই পড়ি না । সেই জায়গা দখল করেছে হিন্দি সিরিয়াল গুলো । অথবা ফেসবুক । এখন ছুটি কাটাতে আমরা আর গ্রামে যাই না । বরং এমন জায়গায় যাই যার গল্প বলে পরিচিত জনদের সঙ্ কম্পিটিশন করা যায়। দাম্পত্য জীবন এসে দাঁড়িয়েছে পয়সা , সন্দেহ আর অবিশ্বাসের বেড়া জালে। কিন্তু লোকের সামনে অভিনয় করি , ভাব দেখাই সুখী দম্পতি। স্ট্যাটাস বজায় রাখতে হবে। এখন আমাদের টেলিফোনালাপ বা আড্ডার বিষয় বস্তু পরকীয়া ,স্বকীয়া ,  বিভিন্ন ধরণের গসিপ ,ফেসবুক ,সিরিয়াল , অসুস্থ রাজনীতি ,। বাচ্চাদের হাতে গেজেট, স্মার্ট ফোন। ওরা ব্যস্ত সেই নিয়ে। ভাবি ভালোই আছে। সারাক্ষন ওদের রুমে আছে। খাবার সময় হলে চুপচাপ খেয়ে যায়। খাবার নিয়ে চেঁচামেচি করে না ।কিন্তু বাচ্চা যে রোবটের মত খাবার খেতে হবে বলে গিলছে কিন্তু  চোখ দুটো দিয়ে পূর্ণ মনোযোগে গেজেট টিপছে খাবারের সময়টাতে ও। তার কি সময় আছে মা বাবার সঙ্গে কথা বলার বা খাবার নিয়ে  কমপ্লেইন করার । আমাদের এই অবস্থার জন্য আমরাই দায়ী। আমাদের লাগামহীন চাওয়া আমাদের জীবনকে অনিয়ন্ত্রিত পথে চালিত করছে। আমাদের চাওয়ার নির্দিষ্ট সীমানা নাই বলে আমরা জানিনা কিসে সন্তুষ্টি বা কতদূর যাব ।আমাদেরই যেখানে এই অবস্থা সেখানে বাচ্চাদের অবস্থাটা সহজে অনুমেয়। তার জীবন গেজেট , স্কুল , গেইম আর ফোন এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ।  তার চিন্তার জগত বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ পায় না । কারণ প্রকৃতি, বই , ভালো ফিল্ম ,মানুষের  সান্নিধ্য , ভালোবাসা ,ঘরের সুষ্ঠু  মানবিক পরিবেশ  , যেকোনো গঠন মূলক আলোচনা ইত্যাদির সংস্পর্শে আসলে বা  অংশ গ্ৰহণ করলে চিন্তার জগৎ বিস্তৃত হয়। আমরা কি তাদের সেই সুযোগ গুলো পারিবারিক, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় ভাবে তৈরি করে দিয়েছি? দেইনি। তাই একটা যান্ত্রিক চিন্তা ভাবনার জগতে সে ঘুরপাক খায়। বয়ঃসন্ধি কালে তার মনে অনেক উদ্ভট চিন্তা ভাবনার উদ্ভব হয়। সে কারো সঙ্গে শেয়ার করতে পারে  না । মা-বাবা ব্যস্ত নিজেদের মতো । বাচ্চাদের পিছনে মাসে মাসে এত টাকা খরচ করেন । আর কি চাই । ফলে সে নিজের মতো করে একটা ভেবে নেয় অথবা একটা ভাবনা নিয়ে সে বেশিক্ষন ভাবতে পারে না । বোর ফিল করে। কারণ সে তার চিন্তা ভাবনা প্রকাশ করতে পারলে বা আদান প্রদান করতে পারলে নিজের প্রশ্নের উত্তর পেত বা আরো নতুন উপাদান বা  চিন্তা ভাবনার সাথে পরিচয় হত ।নিজের মতামতও প্রকাশের সুযোগ পেত । ভালো মন্দ যাচাই করা শিখতো ।  ফলে সে বোর ফিল করতো না । তার মধ্যে একটা নিজস্ব ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠত। আস্তে আস্তে বড় হওয়ার মধ্যে দিয়ে জীবনটা অর্থবহ মনে হত। আজ কাল   প্রতিনিয়ত ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে যে অপরাধ গুলো বাড়ছে বা হচ্ছে তার জন্য কি আমরা ,সমাজ এবং রাষ্ট্র দায়ী না! আমরা তাদের সুস্থ  এবং স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠার জন্য , তাদের বেক্তিত্ত্ব বিকাশের জন্য সুন্দর , নিরাপদ কাঠামো , পরিবেশ , শিক্ষা এবং কোন নজীর কি  সৃষ্টি করেছি?
ছোট বেলার বেড়ে উঠা যদি সুস্থ ,সুন্দর  আনন্দ, স্নেহময় ,স্বাধীন ,নিরাপদ  পরিবেশ এবং সু শিক্ষার মধ্যে দিয়ে হয়  তবে বড় বেলায়  যেতে যেতে মানুষের  জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা এবং স্মৃতিও তত সমৃদ্ধ হয় । যা একজন মানুষকে  সুস্থ মানসিকতা, পরিমিতবোধ ,ক্রিয়েটিভ  , কনফিডেন্ট , মানবিক এবং দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন একজন মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করে। আমরা মানুষ। আমাদের মধ্যে ভালো খারাপ দুই ই থাকবে। কিন্তু একজন সুস্থ মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ তার যে কোন ঋণাত্মক প্রবণতাকে রোধ করে দিতে পারে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।এমন কোনো মানুষ নেই যে কি না সপ্তাহেও কিছু  সময় একলা কাটায় না। মানুষ এই একলা সময় নিজেকে নিয়েও ভাবে  ।তখন ফেলে আসা দিনগুলি মাঝে মাঝে স্মৃতির কৌটো থেকে উঁকি ঝুঁকি দেয় । স্মৃতি সুন্দর হলে   মনে এক পশলা বৃষ্টিপাত  হয় সেই মানুষগুলো , ভালো লাগা ,ভালোবাসা ,স্নেহ ,এবং কাটিয়ে আসা সেই জায়গাগুলোর জন্য। তখন অনেক মানুষের অনেক ভালো কথা ,কাজ  ,আদর, হাসির ঘটনা ইত্যাদি মনে পড়ে। আমরা মিস করি আবার সুখের স্মৃতি রোমন্থনে আবেগাক্রান্ত হই । কিন্তু বেদনাদায়ক, অসম্মান ,অত্যাচার, অবহেলা এবং বৈষম্যমূলক  স্মৃতি মানুষকে হীনমন্য ,ক্রোধান্বিত ও হতাশ  করে তুলে আবার নতুন করে। অনেক সময় মনে হিংসার জন্ম দেয়। স্মৃতি অনশ্বর। যতদিন মস্তিস্ক সুস্থ ভাবে কাজ করবে ততদিন ওরা আমাদের সঙ্গেই থাকবে । সে যতই হউক নারকীয় লোমহর্ষক বা মধুময়। একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে যাবো। রেখে যাবো  কর্ম এবংস্মৃতি। এমন কর্ম এবং স্মৃতি যেন রেখে না যাই যার খারাপ ফল ভোগ করবে আমাদের  বাচ্চা বা আগামী প্রজন্ম।

ছবি: গুগল