এখানে ফেল করলেই আনন্দ

জয়দীপ রায়

(কলকাতা থেকে): পুজোর পরের এসময়টা কঠিন। ঝপ্ করে সমস্ত আলো একবারে নিভে যায়। একটা
মনখারাপেরচাদরে সন্ধ্যের দিকে ঢাকা পড়ে মফঃস্বল। বন্ধুরাও ফিরে চলে যায় যে যার শহরে। আরও মনখারাপ জড়ো হয়। ছোট্ট শহর গুটিয়ে যায় বিষণ্ণতায়। ইছামতির জল আরও স্হির হয়ে যায়।
এই দীর্ঘকালীন ছুটির সময়ে একদিন যদি পিছলে যাওয়া যায়, যেতে হবে পাইকপাড়া থেকে সুটিয়ার রাস্তায়। সুজিতদের বনেদিয়ানার সামনের রাস্তা ধরে বাঘের বটতলা পার করে সোজা বোয়ালদা।
ওখান থেকে সুটিয়ার রাস্তায় যেতে যেতে একটা গ্রাম্য তিনরাস্তার মোড়ে একজন বিএসএফ তোমায় আটকাবে। নতুন লোক দেখেছে।
-কাঁহা জায়েঙ্গে?
-উয়ো তো পতা নহি। ঘুমনে কে লিয়ে আয়া। কিধর জানে সে আচ্ছা লাগেগা?
ডিউটিতে সেদিন যোধপুরের রাজপুত জওয়ান থাক বা বিহারি কোনও সেনা, তোমাকে ডানদিকের রাস্তা দেখিয়ে দেবে।
ডানদিকের রাস্তা তোমাকে দেখানোর নয়। ওটা সমরদের বাড়ি আর চাষের জমি কাঁটাতারে কেটে ভাগ করে দেওয়া সুরক্ষিত সীমান্তবর্তী রাস্তা। তোমার করা প্রশ্নের জন্যই তোমায় এক অদ্ভুত মায়াবী রাস্তায় ঢুকিয়ে দেবে উর্দিধারী। তুমি গুপ্তচরের মত একের পর এক সেন্ট্রিপয়েন্ট অক্লেশে পেরিয়ে যেতে থাকবে।
কেউ বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করবে, কেউ সঙ্গে কে জানতে চাইবে। দু একজন পুরনো প্রেমের বিষয়েও কিছু বলতে চাইবে বোধহয়। তুমি কেজিবি এজেন্টের দক্ষতায় সেসব খানাতল্লাসী পেরিয়ে চলে যাবে। যেরকমভাবে তুমি এইমাত্র পেরিয়ে আসলে, লালশালুকের ছোট্ট পুকুর, বিলের জলে মাছরাঙার ছোঁ।
এইসব করতে করতে একসময়ে তুমি সেখানে পৌঁছে যাবে, যেখানে, আমি তোমাকে আনতে চেয়েছিলাম। দূর থেকে বাংলাদেশের বাড়ি ঘরদোর মসজিদ দেখতে দেখতেই তুমি হঠাৎ করে সেখানটায় গিয়ে হাজির হবে। যেখানে সরু রাস্তাটা একটু উঁচু হয়ে বড় বাঁক নিচ্ছে। বাঁদিকে। এই বাবলাগাছে ছাওয়া বাঁকটার প্রতিটি গাছেই একটা করে কাঠবিড়ালি থাকে। যারা রাস্তায় খেলা করে বেড়ায়। তোমার যান্ত্রিক আগমনেও ভয়
পায় না। শুধু তুমি যখন একেবারে পাশে এসে উরররর্ করো, তখন একদৌড়ে গুরগুর করে গাছে উঠে যায়।
তুমিও কাঠবিড়ালিটার মত খেলা পেয়ে যাও। পাখি ওড়ানোর মত কাঠবিড়ালি উরররর্ করতে করতে এগিয়ে চলো আরও গভীর রাস্তায়। অসংখ্য কাঠবিড়ালি তোমাকে আনন্দ দেবার জন্য একের পর এক গাছে উঠতে থাকে। সত্যি সত্যিই।
একসময় এইসব সেরে গিয়ে রাস্তাজোড়া কঠোর বিএসএফ ক্যাম্প আসে। যেকোন মোসাদ বা সিআইএ এখানে মুহুর্তে যুদ্ধবন্দি হয়ে যায়। এখানেই তোমাকে পরীক্ষায় বসতে হয়। ভাইবা ভোসি।
সেই পরীক্ষায় ফেল করলে তবেই তোমাকে ফেরত পাঠানো হবে পুরনো রাস্তায় আবার কাঠবিড়ালিদের আস্তানা পেরিয়ে, ম্যাকমোহন লাইনের ওপার থেকে ভেসে আসা আজানের ভেতর দিয়ে পদ্মপুকুরের কোলঘেঁসে ঘুরপথে তোমার বাড়ি। আর পাশ করলে তোমাকে দ্রুতপায়ে পৌঁছে দেওয়া হবে সড়কপথে তোমার মফঃস্বল।
তুমি তো ঘুরপথ পছন্দ করো বলেই জানি। যাও না, একবার দেখে এসো। রাস্তাটা পুরোটাই রাখা আছে তোমার জন্য। বোয়ালদা পেরিয়ে ডানহাতে জয়ন্তীপুর পর্যম্ত।
এই প্রথম তুমি কোনও পরীক্ষা দেবে যেখানে ফেল করলেই আনন্দ। একঘর।

ছবি: গুগল