আমাদের স্বর্গীয় টিফিন এবং…

কনকচাঁপা শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

ছোট বেলায় যখন শান্তিবাগ তেতুল তলা প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম তখন আসলে স্কুল কি, ক্লাস কি, টিফিন কি এগুলো কিছুই বুঝতাম না। শুধু কাগজ কলম বই ইত্যাদির সঙ্গেই আমার পূর্ব পরিচয় ছিল। তারপর ও আম্মা হাতে পাঁচটা পয়সা গুঁজে দিয়ে বলতেন আজেবাজে আচার খাবিনা কিন্তু! আমি ভাবতাম আচার কেনই খেতে হবে! বা খেতেই হবে কেন! কয়েকটি ক্লাস করার পর দেখতাম ঢং ঢং কিছু একটা বাজছে! শিক্ষক ক্লাসে থাকতেই শোরগোল হৈচৈ শুরু হতো। শিক্ষক এর গা ঘেঁষেই সব দৌড়ে স্কুল গেটের বাইরে চলে যেত একেবারে আচার ওয়ালার কাছে কিন্তু মা তো আচার খেতেই মানা করলেন! পাশে আরেকটি ক্রস ক্রস লম্বা বাঁশের ঝুড়ির মাথার উপর পেয়ারা, আমড়া, বেতফল, দাতই, আনই, লুকলুকি,তেতুল আমলকি ম্যালা কিছু সাজানো। কিন্তু ওগুলোর চেয়ে আচারই মজা। পাশে দেখি রত্না’পা আচার খাচ্ছেন। আমি তাকাতেই বলেন উহু, আম্মা ওগুলো খেতে মানা করেছে। তো তুই যে ওগুলো খাচ্ছিস? বাহ রে, আমি তো বড়, বড়দের এগুলো খাওয়া নিষেধ না। কি জানি, হতেও পারে। এভাবেই কেটে যায় আমার পাঁচ পয়সার টিফিনের গল্প। তারপর আমরা যখন মাদারটেক চলে এলাম এক বছর পড়লাম মাদারটেক সরকারি প্রাইমারি স্কুলে। সেখানেও আচারের অত্যাচার।কি এক যন্ত্রণা। সবাই খায়, আমি হাবার মত বসে থাকি। এর পর এক ক্লাস পড়লাম মাদারটেক এর দক্ষিণ গাঁ এর তাইজুদ্দিন আদর্শ বিদ্যালয়ে। সেখানে কোন টিফিনের বালাই ছিল না। বাসা থেকে রুটি ভাজি নিয়ে বসে ক্লাসেই খেতাম। স্কুলের ক্লাসরুম টুকু ছাড়া কোথাও কোন গাছপালা ছিল না তাই ক্লাসেই বসে থাকতাম টিফিন আওয়ার। তারপরও ওই এক বছর আয়ুর স্কুলটার প্রতি আমার অগাধ মায়া। এরপর আমি ভর্তি হলাম মাদারটেক আব্দুল আজিজ উচ্চ বিদ্যালয় এ। সেখানেই আমার অপূর্ব কৈশোর কেটেছে সেই সঙ্গে বলাই বাহুল্য টিফিন পিরিয়ডের সেই অদ্ভুত মোহনীয় সময়। আহা! কতই না দারুন ছিলো সেই সময়। তখন আমার টিফিনের পয়সা বরাদ্দ ছিল একটাকা। সেই সময়ে তা যথেষ্টই ছিল। তবে আম্মা কিছু খুচরা পয়সা বিছানার তোষকের নীচে রাখতেন। সেখান থেকে (খুবই লজ্জা ও অনুতাপের বিষয়) দু’চার আনা পয়সা আস্তে করে একটু ভেতর দিকে ঠেলে দিয়ে রাখতাম। যখন দেখতাম পাঁচ ছয় দিনেও ওই ঠেলে দেয়া পয়সার কোন খোঁজ হচ্ছে না তখন হয়তো দুরুদুরু বুকে তা (এমন ভাব যে আমি, আম্মা, আল্লাহ কেউই দেখছেন না) সরিয়ে জ্যমিতি বক্সে ভরতাম। (আল্লাহ, মাফ করে দিও আল্লাহ। আর কখনোই এমন করবো না ইনশাআল্লাহ। যদি সেই সোনালি টিফিন ঘন্টা ও পাই তবুও না) সেই পয়সা দিয়ে আমি কখনো কখনো আইসক্রিম, মুড়ি বিস্কুট, প্যাকেট আচার খেতাম। রং বেরং এর কাগজ কিনতাম। এবং খুবই অদ্ভুত ব্যাপার যে ওই অল্প পয়সা থেকেই আমি আম্মা এবং দাদীমার জন্য ম্যাচ মানে দিয়াশিলাই কিনতাম। যখন মোটামুটি বড় হয়ে গেলাম তখন টিফিনের ক্ষুধা কমে গেল। বেড়ে গেল আড্ডার ক্ষুধা। গীবত আমি কখনোই পছন্দ করতাম না, আমার বন্ধু রুমা, আফরিনও কখনোই গীবত এ অভ্যস্ত ছিলনা। বরং অনেক সময়ে টিফিন আওয়ার এ আমরা হোমওয়ার্ক করে নিতাম। তবে কে কবে কোথায় প্রেমে পড়লো এই গল্প খুবই বিস্ময়ের সঙ্গে আগ্রহ নিয়ে শুনতাম আর ভাবতাম এই মেয়েটি তো ডাকাত দলের সর্দারের চাইতেও সাহসী। তাকে বাহবা দিতে চেয়েও সমাজের ভালমন্দ ভেবে কপট ধিক্কার জানাতাম। যদিও মনে মনে জানতাম যদি একদিন ভালবাসা, মৃত্যু যে তারপর তাও যদি হয়! আমি চাই আমার সঙ্গে তাই হোক। কিন্তু মাকে ভয়, বাবাকে ভয়, যাকে ভালোবাসি তাকে ভয় নিজেকে ভয়, নানাভাইয়ের ভয়, ওস্তাদজী র ভয়। তাহলে? আমি কি এমন একাই বসে থাকবো? ওই হাত কি আমি কখনোই ধরবো না? এসব অযাচিত ভয়ঙ্কর ভাবনায় আমার টিফিনের প্রতি আগ্রহ একদম কমে গেলো। অসাধ্য সাধন করা আরাধনার মত টিফিনের পরমানু সমান পয়সা জমাতে লাগলাম আমি অজানা তাঁর জন্য। একটা আংটি কিনবো! হা হা হা হা হা। কে সে, কি তাঁর আঙ্গুলের মাপ, কেমন তাঁর পছন্দ কিছুই জানি না আমি অথচ পয়সা জমাই! রাতে সেই পয়সা হাতে নিয়েই লাল হয়ে যাই। কি অভাবনীয় কল্পবিলাসী ছিলাম আমি! আমার সেই টিফিন আওয়ার, আমার সেই বড় হয়ে ওঠা, আমার সেই কাল্পনিক ভাবনা, আমার সেই কল্পিত মনের মানুষ না খুঁজে পাওয়া, সব কিছুই আমাকে এখনো আন্দোলিত করে, আমার নির্জন দুপুর রাঙিয়ে তোলে, আমাকে ভাবায়! টিফিন আওয়ার এর সেই ঘন্টা আমার জীবনে স্থায়ী একটা ছাপ ফেলেছে। আমার কাছে তা খুব মুল্যবান। ভালোবাসি স্কুল, ভালোবাসি বন্ধু, ভালোবাসি জীবন ভালোবাসি কল্পনা।

ছবি: গুগল