তোমার ও আঁখির তারায়…

তোমার ও আঁখির তারায়-বহুকাল আগে শোনা একটা গানের লাইন। কে গেয়েছিলেন এখন আর মনেই পড়ে না। শুধু কানে ভেসে আসে গায়কি ভঙ্গী আর গাইতে গাইতে সুরের খাদে নেমে আঁখি শব্দটার ওপর দেয়া জোরটুকু। লিখতে বসে হঠাৎ মনে হলো আজকাল কেউ আর আঁখি শব্দটা ব্যবহার করে না। সবাই বলে চোখ। আমার কাছে চোখ শব্দটি সবসময়ই কেমন যেন গিলে খাওয়ার মতো একটা ব্যাপার। চোখ প্রহরীর মতো ঘিরে রাখে, চোখ রাখে গুপ্তচর। কিন্তু আঁখি শব্দটির ভেতরে হারিয়ে যাবার একটা ব্যাপার আছে, পুরনো দিনের ভালোবাসার গন্ধ আছে। প্রাচীন কালে কবিরা তো এই আঁখির মাঝেই ডুবে মরতে চেয়েছেন।এক সময়ে শোনা যেতো চার চোখের মিলনেই ভালোবাসা জন্ম নিতো মুহূর্তে। পদ্মপুকুরের মতো কারো টলটলে চোখের দিকে তাকিয়েই বুকের মধ্যে জেগে উঠতো ভালোবাসার মহাদেশ।তাহলে ভালোবাসা কি ‘তোমার ও আঁখি পল্লবে’ থাকে?

কোথায় থাকে ভালোবাসা? এ প্রশ্নটির উত্তর আজ অবধি আমরা কেউ জানি না। কিন্তু তার খোঁজ জানতে মানুষের চেষ্টা অফুরান। এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন সেই অধরা ভালোবাসাকে নিয়েই।

গত শতাব্দীতে প্রেমের সঙ্গে যে আঁখি শব্দটার একটা মাখামাখি ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে কি এই শতাব্দীতে এসে ভালোবাসার সেই মাখামাখিটা কমে গেলো?আর এমনটাই বা ভাবছি কেন, আঁখির তারাতেই ভালোবাসা থাকে! মন নিয়ে নাড়াচাড়া করা বিজ্ঞান বলে ভালোবাসার জন্ম মস্তিষ্কে। মানুষের মাথার ভেতরে নানা রাসায়নিক ক্ষরণের নাম হচ্ছে ভালোবাসা।বিজ্ঞান মানুষের ভালোবাসা, ভালোবাসার প্রক্রিয়া নিয়ে ঘাটাঘাটি করছে বিস্তর।আবিষ্কার করার চেষ্টা করছে প্রেমে পড়ার ফলে মানুষের মগজে কত ধরণের চমকপ্রদ ঘটনার সূত্রপাত হয়।  

মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা নতুন করে জানান দিচ্ছে প্রেমে পড়ার প্রথম অনুভূতিটুকু বুঝতে কেনো মানুষের মস্তিষ্ক সময় নেয় ৪ মিনিট ৯০ সেকেন্ড। একটু আগে বলছিলাম কারো পদ্মপুকুরের মতো টলটলে চোখ ভালোবাসার কথা বলে, কোনো বৃষ্টির দুপুর অথবা শীতের অলস বিকেলে ‘ভালোবাসার চিরকালীন বাঘ’ বের হয় প্রেমের শিকার ধরতে তা আসলে বাস্তবে ঘটে না। গবেষণা জানাচ্ছে, মানুষের প্রেমে পড়ার ব্যাপারটা শতকরা ৫৫ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয় শরীরের ইশারা। ৩৮ শতাংশ নির্ধারণ করে কন্ঠস্বরের গতি আর বাকী সাত শতাংশ প্রকাশিত হয় কথায়।

তাহলে ভালোবাসায় মন বলে বিষয়টির অস্তিত্ব কোথায়? প্রখ্যাত কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র শশী কুসুমকে প্রশ্ন করেছিল, ‘‘তোমার মন নাই কুসুম, শুধুই শরীর?’’ মানুষ তো এভাবেই যুগে যুগে এভাবেই ভালোবাসার মধ্যে খুঁজতে চেয়েছে গভীর এক মনের অস্তিত্ব। নাকি ভালোবাসায় মন আর শরীর সব একাকার হয়ে থাকে? প্রশ্নের সমাধান পাওয়া যায়নি এখনো।

ধরা যাক দুই হাজার বছরের পুরনো এক শহরে কোনো তরুণ নাবিক ভালোবেসে ফেললো একটি মেয়েকে। নাবিকের জাহাজ তখন ছেড়ে যাচ্ছে গহীন সমুদ্রে। বন্দরে জাহাজের মাস্তুল ছোঁয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি সেই তরুণ নাবিককে কথা দিলো আবার তাদের দেখা হবে সেখানেই। নাবিকের দৃষ্টি তখন নিবদ্ধ মেয়েটির গভীর ভালোবাসাময় আঁখিতে। তারপর জাহাজ ভাসলো দূর সমুদ্রে। কত বছর পার হলো। মেয়েটি অপেক্ষায় থাকলো। নাবিকের জীবনে কত ঝড়, কত সমুদ্রের অচেনা হাওয়া হানা দিয়ে গেলো। তারপর আবার বন্দরে ফেরার কাল। ফিরে আসা সেই পুরনো শহরে। কিন্তু তরুণীটি কই!তার কাছে তো তখন অপেক্ষা মৃত্যুর চেয়েও কষ্টের। নাবিকের আশায় থেকে থেকে মেয়েটি এক সময়ে বিয়ে করে ফেলেছে অন্য এক যুবককে। ঘর হয়েছে তার, সংসার হয়েছে।

নাবিকের বুকে তখন অভিমানের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। একা এক জাহাজ নিয়ে নাবিক ভেসে গেলো আবার সেই সমুদ্রে। ফেরা হয়নি সেই নাবিকের আর সেই মেয়েটির কাছে। তারপর থেকে গভীর সমুদ্রে জাহাজের নাবিকেরা দেখেছে এক ভৌতিক জাহাজকে ভেসে যেতে। জাহাজটি কখনো কোনো বন্দরে গিয়ে থামে, অপেক্ষা করে। তারপর আবার পাল উঠে যায় ভৌতিক জাহাজটির মাস্তুলে। ভেসে পড়ে অচিন সমুদ্রে সেই প্রেমিকার খোঁজে। সমুদ্র নাবিককে ফিরিয়ে দেয়নি, মেয়েটি ফিরিয়ে দিয়েছিল।এসবই তো গল্প। প্যান্ডোরা অ্যান্ড দি ফ্লাইং ডাচম্যানের ভালোবাসার অসমাপ্ত কাহিনি।

দুই হাজার বছর পরে এই শহরে একটি মেয়ের জন্য কি অপেক্ষায় রয়ে গেছে কোনো যুবক? শাহবাগের রাস্তায় সেনা শাসনের আওতায় পড়ে কাটা পড়েছিল অনেক কৃষ্ঞচূড়া গাছ। তখন কী কেউ গভীর অভিমানে শহর ত্যাগ করেছিল?যার কাছে প্রেমিকা অনেক কৃষ্হচূড়া ফুল চেয়েছিল। আর তা দিতে পারে নি বলে ভেঙ্গে গিয়েছিল তাদের ভালোবাসা? আমরা ঠিক জানি না। কিন্তু ভালোবাসার গল্প এমনি করে এগিয়ে চলে সময়কে অতিক্রম করে। থামিয়ে দেয় বিজ্ঞানের গবেষণা। কারো গভীর চোখের তারায় খুঁজে ফেরে সে নিজেকেই।

ভালোবাসার পেছন পেছন তখনো উড়ে আসে ধূলোর ঝড়, অস্ত্রের ঝনঝনানি। পৃথিবী বহুবার এমন দেখেছে। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় আর সাহিত্যে  সেসব কাহিনি লেখা আছে। ১৮৪৮ সাল থেকে শুরু করে ১৯১৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সম্রাট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রথম ফ্রাঞ্জ জোসেফ।  উত্তরাধিকারসূত্রে তার একমাত্র ছেলে  রুডলফ ছিলেন সিংহাসনের একমাত্র দাবীদার। ১৮৮১ সালে রুডলফের বিয়ে হয় বেলজিয়ামের রাজকুমারী স্টেফানির সঙ্গে। কিন্তু একমাত্র সন্তান এলিজাবেথের জন্মের পর থেকে তাদের মাঝে দূরত্ব তৈরী হয়। মদ ও পরনারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন রুডলফ। ১৮৮৮ সালে ৩০ বছর বয়সী রুডলফ ১৭ বছর বয়সী মেরি ভেটসেরার প্রেমে পড়ে যান। কিন্তু সম্রাট জোসেফ তাদের এ সম্পর্ক মেনে নেন নি। তিনি রুডলফকে কড়া ভাষায় এ সম্পর্ক থেকে সরে আসতে বলেন। বাবার এমন সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া সম্ভব ছিলো না রুডলফের পক্ষে। এজন্য প্রথমে তিনি পিস্তল দিয়ে গুলি করে খুন করেন মেরিকে, এরপর গুলি চালান নিজের দেহে। ভালোবাসার গল্প এখানেই শেষ নয়। তারপর অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সিংহাসনের দাবি নিয়ে ঘটে যায় অনেক ঘটনা।রুডলফের মৃত্যুর পর তার বাবার আর কোনো পুত্র সন্তান ছিলো যে সিংহাসনে বসবে। ফলে রাজার ভাইয়ের ছেলে ফার্ডিনান্ডই হয়ে ওঠে সিংহাসনের উত্তরাধিকার। কিন্তু তাকে ১৯১৪ সালে খুন করে  সার্বিয়ান জাতীয়তাবাদী সংগঠন ব্ল্যাক হ্যান্ডের সদস্যরা। ফার্ডিনান্ডের নিহতের খবরে নড়েচড়ে বসে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। তারা যুদ্ধ ঘোষণা করে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে। ওদিকে সার্বিয়ায় সঙ্গে মিত্রতা ছিলো রাশিয়ার। তারা এগিয়ে আসে সার্বিয়ার সাহায্যার্থে। জার্মানির সঙ্গে সখ্য ছিলো অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির। তাই তারা যুদ্ধ ঘোষণা করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। রাশিয়ার মিত্র ফ্রান্সই বা বসে থাকবে কেন? তারা তখন মাঠে নেমে পড়ে জার্মানি এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে। ওদিকে জার্মানি যখন ফ্রান্সে আক্রমণ চালায়, তখন চুপ করে বসে থাকে নি ব্রিটেনও। কারণ তারা ছিলো আবার ফ্রান্সের মিত্র রাষ্ট্র। এভাবে একে একে যুদ্ধে জড়াতে শুরু করে বিশ্বের নানা দেশ। আর এভাবেই শুরু হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের। এ যুদ্ধের পেছনে আরো অনেকগুলো কারণ থাকলেও শুধুমাত্র ফার্ডিনান্ডের মৃত্যুই যেন সব কারণকে পেছনে ফেলে মুখ্য হয়ে উঠেছিলো।

আর সেই প্রাণঘাতী ঘটনাপ্রবাহের অন্তরালে প্রেম, প্রত্যাখ্যান আর পরকীয়া হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।

প্রখ্যাত কথাশিল্পী চার্লস ডিকেন্স প্রেমে পড়েছিলেন অষ্টাদশী নেলির। গভীর পরকীয়া প্রেম গড়ায় সংসার ভেঙ্গে যাওয়ার ঘটনায়। নয় সন্তানের বাবা ডিকেন্স ৪৫ বছর বয়সে এসে নেলির ভালোবাসার বেড়াজাল থেকে আর বের হতে পারেননি। তাই পরিত্যাগ করেন নিজের স্ত্রীকেও। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নেলির সঙ্গেই সংসার করেন লেখক। সাহিত্যের আলোচকরা বলেন, ডিকেন্সের অনেক লেখাতেই নেলিকে খুঁজে পাওয়া যায়।  তার অবদান ডিকেন্সের লেখায় অসামান্য।

তাহলে কী দাঁড়ালো শেষ অবধি? ভালোবাসা সব নিষেধ আর হিসেবের বাইরে দাঁড়িয়ে অদৃশ্য রুমাল নাড়ে বুকের ভেতরে? কারো ভীরু আঁখি পল্লবে অঝোরে নামা বৃষ্টি দেখে কারো বুকে দুলে ওঠে যমুনা নদী? আজো হয়তো দোলে। কিন্তু বিজ্ঞানের হিসেব নিকেশ তো সে আবেগকে মূল্য দেয় না। বিজ্ঞান বলে মানুষের মাথার ভেতরে ভালোবাসা নামের বোধটাকে জাগিয়ে তুলতে তার মগজের ১২টি জায়গা একসঙ্গে কাজ করে। ব্যাপারটা নেশা করার জন্য কোকেন নেয়ার মাত্রায় ঘটে যায়। ক্ষরণ ঘটে মাত্রাতিরিক্ত ডোপামিন, অক্সিটসিন, অ্যাড্রিনালিন আর ভাসোপ্রসিন নামে রাসায়নিক তরলের। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে আবেগ, বুকের ভেতরের তোলপাড়ের কোনো স্থান নেই। নেই কারো আখিঁর ভাষা পড়ার তাড়না।

গ্রীকরা ভালোবাসাকে বলে ম্যানিয়া। ইংরেজিতে বললে, ম্যাডনেস ফ্রম দা গড। ঐশ্বরিক উন্মাদনা। শেক্সপীয়ার বলে গেছেন, প্রথম দর্শনে যে প্রেম ঘটে না সেটা প্রেম নয়। তাহলে প্রেম কোথায় এসে দাঁড়ালো এই একবিংশ শতাব্দীতে? যখন হাতের মুঠোয় ইন্টারনেট, যখন ভোগবাদ মনের মৃত্যু ঘটাতে এসে উপস্থিত একচক্ষু দানবের মতো তখন ভালোবাসার সঙ্গে তো দেখা হয় না সেই আঁখি পল্লবের। সেখানে তো ভালোবাসা রুদ্ধশ্বাস হয়ে মরে চোখের পাহারায়। দিন শেষে চাওয়া পাওয়ার হিসেব কষতে গিয়ে ফুরিয়ে যায় প্রেম। তবু কবি আবুল হাসান যখন লেখেন-‘‘হে মেয়ে হে ম্লান মেয়ে তোমাকে ভালোবাসি তাই
ভালোবাসার কবিতা আমি কোনোদিন কখনো লিখবো না!’’ তখন আবার সেই ভীরু প্রেম হয়তো আবার দুরুদুরু বক্ষে অপেক্ষা করে কারো পায়ের শব্দ শোনার জন্য। তাকাতে চায় কারো আঁখির তারায়।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃসৌজন্য অভিনয় শিল্পী জ্যোতিকা জ্যোতি