রফিক আজাদের তিনটি কবিতা

দুঃখ/কষ্ট

পাখি উড়ে গেলে পাখির পালক পড়ে থাকে।
পাখি উড়ে গেলে তার নরম পালক
কঠিন মাটিতে পড়ে থাকা ঠিক নয়-
এই ভেবে কষ্ট পেয়েছিলে।

তুমি চলে গেলে দূরে
নিঃস্ব, রিক্ত পাখির পালকসম পড়ে থাকি।

পরিত্যাক্ত পালকের প্রতি মমতাবশত
একদিন, কোন এক কালে তুমি কষ্ট পেয়েছিলে;
পাখির পালক খসে গেলে কষ্ট পাই?
দুঃখ নয়, সাধারণ কষ্টের কথাই বলেছিলে?
দুঃখ ও কষ্টের মধ্যে পার্থক্য অনেক;
বহু রক্তক্ষরণের পর শব্দ দুটির যাথারথ বোঝা যায়।
আমার তো অর্ধেক জীবন চলে গেল
নেহাত মামুলি এই দুটি শব্দ আর তার মানে খুঁজে পেতে!
বুকের গোপনে আজও খুব দুঃখ পাই,
পনেরো বছর আগে তুমি খুব সাধারণ কষ্ট পেয়েছিলে?
উচ্চারিত তোমার শব্দের বড় ভুল মানে করে,
আজো আমি দুঃখ-এই দুঃখজনক শব্দের সাথে
ভাগ করে নিই রাতে আমার বালিশ।

 

সুন্দরের দিকে চোখ রেখে

সুন্দরের দিকে চোখ রেখে
অনন্ত ঝর্নার জলে
এইভাবে খোঁজা শুরু হয়
নুড়ি ও পাথরে-
মানুষ নামের যোগ্য কেউ-কেউ খোঁজে
মাটিতে, মাটির ভাঁড়ে, জলের গভীরে;
শিকড় চারিয়ে দিয়ে অবিরাম অন্বেষণ চলে।
অসম্ভব দীর্ঘ এক পরিব্যাপ্ত বেলাভূমি থেকে
পানিয় জলের জন্য খালি পায়ে এসেছে মানব।

সুন্দরের দিকে চোখ রেখে মূলত সত্যকে খোঁজা;
নারীর ভিতরে স্বাদু তালশাঁশ, কেউ বা আবার
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারীকে দেখে খুব
গাঢ় নিদ্রা থেকে সহসা উত্থিত হতে;
সুন্দরের দিকে চোখ রেখে মুগ্ধ মরমানুষেরা
মধ্যদিন আর মধ্যরাত্রির তফাত ভুলে যায়;
অবলীলাক্রমে কেউ পেরোয় পর্বত;
প্রাচীন মাটির স্তুপ
খোঁড়াখুঁড়ি করে খোঁজে রাখালদাসেরা;
ভালোবেসে এক ফ্রগম্যানচোখের গভীর জলে
লাফ দিয়ে পড়ে; বিন্যস্ত বাগানে কেউ
শতায়ু বৃক্ষের গায়ে ছুরির ফলায়
দীর্ঘসূত্রী হাহাকার রেখে যেতে চায়।
সুন্দরের দিকে চোখ রেখে সত্যের সামান্য অংশ
খুঁজে পেতে অনেকেই লাঙলের ফলা আঁকড়ে ধরে-
সত্যের বদলে কিছু উঠে আসে সুন্দরের সীতা।

সত্যে ও সুন্দরে কোন দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ বাধে না।

 

ভালোবাসার সংজ্ঞা

ভালোবাসা মানে  দুজনের পাগলামি,
পরষ্পরকে হৃদয়ের কাছে টানা;
ভালোবাসা মানে  জীবনের ঝুঁকি নেয়া,
বিরহ-বালুতে খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি।
ভালোবাসা মানে  একে অপরের প্রতি
খুব করে ঝুঁকে থাকা;
ভালোবাসা মানে  ব্যাপক বৃষ্টি, বৃষ্টির একটানা
ভিতর-বাহিরে দুজনের হেঁটে যাওয়া;
ভালোবাসা মানে  ঠান্ডা কফির পেয়ালা সামনে
অবিরাম কথা বলা;
ভালোবাসা মানে  শেষ হয়ে যাওয়া কথার পরেও
মুখোমুখি বসে থাকা।