পুরোনো শহরে ক’দিন

শেখ রানা , (নিউবুরি পার্ক, লন্ডন)

প্রথম দিন

এডিনবার্গ এর ঝিম ধরা সকাল, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, ফেন্সি-ডিকেন্স এর সঙ্গে পরোটা-ডিম-মাংশ আর চা দিয়ে প্রাতঃরাশ। আমার ছোটবেলার বন্ধু মাহনুর এর সঙ্গে আবার দেখা। মেডোব্যাঙ্ক। বিকেলে ব্যডমিন্টন ক্লাব এর সভ্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ আর আগের মত ব্যাডমিন্টন খেলা নন স্টপ। টাক্কু কেন হয়েছেন প্রশ্নে আশীষ’দার বিগলিত উত্তর’ আপনার শোকে’ এবং রসমালাই এর আমন্ত্রণ। সুমন-সুমীর বাসায় রাতযাপন। পল্টন রোড জায়গাটার নাম। নাম শুনেই নস্টালজিক হয়ে গেলাম। আর অতি অবশ্যই আমার আরেক বন্ধু সাফির এর সঙ্গে রি ইউনিয়ন।

এই শহরটাকে ভালোবাসি। নিরন্তর।

দ্বিতীয় দিন

ঘুম ভেঙ্গে দেখি তখনও শহর ঘুমের দেশে। অন্ধকারের চাদর গায়ে জড়িয়ে আকাশ। পল্টন লেন আরো বেশী নিঝঝুম। মানুষের শব্দ নেই, গাড়ির চলে যাওয়া নেই। এ রকম নীরবতা আমার ভালো লাগে।

সকালের নাস্তা সেরে চুপচাপ বিছানায় বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি শহর আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠছে। স্কটিশ ওয়েদার। আলোর দেখা নাই। তবু আলো আমার চোখে এসে লাগে।

ছোট্ট সাফির বারেবারে আমার ঘরে এসে আমাকে দেখে যায়, সুন্দর করে বাংলায় কথা বলে। আমার খোঁজ-খবর নেয়। চার বছরে এডিনবার্গ এর শিশুগুলো বড় হয়ে উঠছে। যখন এসেছিলাম সবাই দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলতো। আমিও বলতাম। এখন আমরা বাংলায় কথা বলি। সহজিয়া শব্দে।

আজ নিকলসন স্ট্রিটে যাবার কথা ছিল। উদ্দেশ্যবিহীন ঘুরে বেড়ানো। স্টারবাকস ক্যাফের সেই পরিচিত চেয়ারে বসে লেখালেখি। ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে গেলাম। সাফির ওর চাইল্ড মাইন্ডার এর সঙ্গে পার্কে ঘুরতে গেল। যাওয়ার আগে আরেকবার দেখে গেল আমি ঘুমিয়েছি কি না!

আলিয়ানা, ফুয়াদ দ্যা মুস্তান, আহিল, অচীন, মানহা, রাজ্য, মার্সিয়া, রাইয়ান এর সঙ্গে দেখা হলো না এখনও। কাল খেলার সময় আরহাম এর সঙ্গে দেখা একবার। মনোযোগ দিয়ে মোবাইলে গেম খেলছিল।

এবার রয়েল মেইল ধরে একদিন হাঁটবো। নির্ভার পথচলা। বস্তুগত ভাবনা নেই মাথায়, ভালোবাসার দম বন্ধ দাবী নেই, পরিচিত বন্ধুর হঠাৎ বদলে গিয়ে ক্রমাগত কটাক্ষ করার কুৎসিত দৃশ্য নেই। অনেক লেখার তাড়া নেই। ফিরে যাবার দিন নেই। ক্ষণ নেই। বাসের টিকেট নেই।

শুধু এক টুকরো আমি আছি। স্বার্থপরের মত। নিজস্ব ভাবনার বলয়ে পৃথিবী নিয়ে নতুন করে ছক কষা একদল শিশু আছে। আর আছে আমার শব্দ পাখির দল। ঠিক আমার মত করে।

সেই পাখিদেরও কোনো দল নেই। দলছুট হবার ভয় নেই।

শুধু সবুজ গাছের ডালে বসে থাকা মুহূর্ত আছে। চুপচাপ।

সুন্দর।

শেষ ক’দিন

১.

ব্যস্ততা গেল খুব। এখানকার বন্ধুদের নিয়ে একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন এর কাজ করলাম। যে কোনো কিছুর শুরুটা অনেক রোমাঞ্চকর, একইসঙ্গে কিছুটা ক্লান্তির।
আমরা ছোট্ট করে একটা অনুষ্ঠান করলাম। বাংলা গান, কবিতা আবৃত্তি, রবীন্দ্র সঙ্গীত পরিবেশন হলো। স্বল্প সংখ্যক দর্শক প্রায় পুরো সময়টা আমাদের সঙ্গে একাত্ম হলেন, ওরে নীল দরিয়া বা মন শুধু মন ছুঁয়েছে-র সঙ্গে গলা মেলালেন। অনুষ্ঠান শেষে সাউন্ড সিস্টেম প্যাক করা, চেয়ার গোছানো সব নিজেরা করলাম দলবেঁধে। খুব ভালো লাগছিলো আমার। ঠিক এ রকম মুহূর্তে আমার এক ধরণের অদ্ভুত শূন্য অনুভূতি হয়। ভিড় এড়িয়ে সবার অলক্ষ্যে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে গন্তব্যহীন।

২.

গত পরশু কিংস বিল্ডিঙে গিয়েছিলাম। সেখানে সিফাত, তাহিরা, অথৈ আর নতুন দু’জন বাংলাদেশী ছাত্র-র সঙ্গে দেখা হলো। প্রায় সবাই পি এইচ ডি করছে বিভিন্ন স্কলারশীপ নিয়ে। গবেষণার ক্লান্তির কথা শুনি বটে, কিন্তু চৌকস চোখে মুখে সাফল্যের দ্যুতি-ও চোখ এড়ায় না।

গোটস চিজ দিয়ে এক অদ্ভুত বার্গার খেলাম কিংস বিল্ডিং এর ক্যাফেতে। নাম বোধহয় হালুম(!) বার্গার। কী যে অদ্ভুত বিচ্ছিরি স্বাদ। হাসতে হাসতে সেই কথা বললাম ওদের।

৩.

একটু পরেই বাস ধরবো। লম্বা জার্নি। মেগা বাস নাম। সস্তা-র সুত্র ধরে একেবারেই আরামদায়ক নয় সেই ভ্রমণ। নয় ঘন্টার দীর্ঘ যাত্রাপথে কোথাও বিরতি দেয় না। এই কথা শুনলেই প্রথম যেটা মাথায় আসে সেটা হলো টয়লেট। বাসের ভিতরেই একটা ছোট্ট কুঠুরির মত টয়লেট আছে। একবার গিয়ে অনেকক্ষণ আটকা থাকার পর আমি আর সে পথ মাড়াইনা সাধারণত। ট্রেনের টিকেট কাটতে চেয়েছিলাম। অতি উচ্চ মূল্য দেখে শ্রাগ করলাম আর মনে মনে বললাম-‘কবির তখন সওদাগরি মন, হিসেব অংকে বিকেল আততায়ী।’

৪.

এবার এডিনবার্গ ভ্রমণ নানা কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সংগঠন এর কাজ শুরু হলো, সবাই খুব এক্সাইটেড, শিশুরা এখনও আমাকে ভুলে যায়নি, বড়রাও আমাকে মনে রেখেছে আর শহরটা আগের মতই নিশ্চুপ হয়ে আমার পাশে পাশে হাঁটে-আমি পথে নামলেই। নিকলসন স্ট্রিট বা গোর্গি রোড যেখানেই যাই।

৫.

ফিরে যাচ্ছি লন্ডনে। নতুন একটা শহরকে একটু একটু করে ভালোবাসার, আবিষ্কারের আনন্দ আছে। পুরনো শহরকে বুকে ধরে সেই আনন্দে অবগাহন হোক এবার।

ছবি: লেখক