ভেসে যাওয়ার ছবি ডুব

অদিতি বসু রায়,সাংবাদিক

(কলকাতা থেকে): ছোট, ছোট সংলাপ।তাও নিতান্তই স্বল্প! কিছু লংশট – বেশ কয়েকটা লম্বা, নির্বাক দৃশ্য- হাওয়া বয়ে যাওয়ার শব্দ- বেগম আখতারের রের্কড- এইসব সামান্য আয়োজন।এই নিয়েই মোস্তাফা সরয়ার ফারুকীর ছবি, ডুব।

এক বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালকের জীবনের টানা-পোড়েন ঘিরে ছবির গল্প ঘুরপাক খায়। মধ্য বয়েসে পৌঁছে তিনি, মেয়ের বন্ধুর প্রেমে পড়েন। এবং তাকে বিয়েও করেন। কিন্তু এত তো সহজ নয় পূর্ব-দাম্পত্যকে একেবারে মুছে ফেলা! মুছে ফেলা যায় না, দুই সন্তানকেও। আবার দ্বিতীয় স্ত্রীর পক্ষেও মেনে নেওয়া সম্ভব হয় না, আগের সম্পর্কের দীর্ঘসূত্রীতা। ফলে , পুরুষটির জীবনে শুরু হয় এই অমোঘ টানাটানি। এ যেন, ‘যাহা চাই, তাহা ভুল করে চাই/ যাহা পাই, তাহা চাই নে’। তিনি না পারেন বর্তমানকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে , না পারেন অতীতকে ত্যাগ করতে। এই-ই তাঁর নিয়তি হয়ে ওঠে। অসামান্য ক্রিয়েটিভ পরিচালক, সম্পর্কের ঘূর্ণিপাকে দিশেহারা হয়ে যেতে থাকেন ক্রমশ। মেয়ের কাছে তাই ফোন করে ‘বাবা’ ডাকের প্রতীক্ষা করেন চোখে জল নিয়ে। ছেলের স্কুলের সামনে অপেক্ষা করেন ঘণ্টার পর ঘন্টা।

বাংলাদেশের এক বিখ্যাত লেখক ও পরিচালকের জীবনের সঙ্গে খানিকটা মিল আছে এই ছবির। কিন্তু তা বলে, ডুব-কে সেই লেখকের জীবনের বায়োপিক বলে ধরে নেওয়া যায় না। বিশেষ করে, ছবির গল্পকার ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে যখন নাম দেওয়া হয়েছে, পরিচালকের নিজের। মুশকিল হল, আমরা সকলেই চাই কোন মতে নিজেদের ধারণার সঙ্গে বাস্তবকে মেলাতে। তাহলে, নিজের প্রতি কনফিডেন্স বাড়ে। কিন্তু এই থিয়োরিতে তো জীবন চলতে পারে না- আমার জানার বাইরের জগতও যে বিশাল। তাই যাঁরা ভাবছেন, এ ছবি সেই লেখকের জীবনের কথাকে পর্দায় তুলে এনেছে, তাঁরা ঠিক ভাবছেন না। মনে রাখা দরকার, ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘আবহমান’ ছবিটি নিয়েও নানা মানুষ ভেবে নিয়েছিলেন, তা নাকি এদেশেরই এক দুনিয়াখ্যাত চিত্র-পরিচালকের জীবন-কাহিনি। সামান্য মিল থাকলেই যে ছবি ‘বায়োপিক’ হয়ে যায় না, সেটা না বুঝলে সমস্যা।

পরিচালক খুব সামান্য পরিসরে চরিত্রগুলির বিষাদ, ভালবাসা, বাৎসল্য, বিচ্ছেদ, তুলে ধরেছেন। এই মুন্সিয়ানাই ছবিটিকে একেবারে অন্য ঘরানার বলে চিহ্নিত করে দেয়। বলে হয়, যে মানুষ যত উন্নত( আডভ্যান্সড) সে তত বেশি নীরবতা অনুভব করতে সক্ষম। ঠিক সেরকমই যে পরিচালক যত অভিজ্ঞ ও অনুভূতিসম্পন্ন তিনি তত কমকথাতেই পরিস্থিতি ইন্টারপ্রেট করে দিতে পারেন। ডুব ছবিটিতে সম্পর্কের নানা জটিল সমীকরণকে দেখাতে, ফারুকি খুব কম সংলাপের সাহায্য নিয়েছেন। বরং দৃশ্যকল্পের প্রতি তাঁর মনোযোগ অনেক বেশি। তাতে প্রতিটি চরিত্রের বক্তব্য অনেক বেশি জোরালো হয়েছে। একটা দৃশ্যের কথা বলা যাক! মেয়ে সাবেরী, মা আর ভাইকে নিয়ে ঘাষ-বনের প্রান্তরে বসে, মায়ের জন্মদিন পালন করছে – একটু আড়াল থেকে মাকে ফোন করে জানাচ্ছে মাকে সে কেন ভালবাসে সেইকথা- চারিদিকে তখন প্রবল হাওয়া বইছে শনশনিয়ে। ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে মেয়েটির মুখ – ফিরে এসে সে দেখছে, মা জায়গায় নেই- আড়াল থেকে বেড়িয়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে নিচ্ছেন মায়া – তারপর সব চুপ! একই রকম মুগ্ধতা তৈরি হয়, যখন বান্দোয়ানে মায়া এবং জাভেদ তাঁদের দাম্পত্য  উদযাপন করতে বসেন এবং জাভেদ ক্রমাগত স্মৃতিকথা আওড়াতে থাকেন। সেখান থেকেই মায়ার সঙ্গে দর্শকরাও আন্দাজ করতে পারেন আগামির অশনি-সংকেত। জাভেদের মৃত্যুকেও দেখান হয়েছে একই রকম মুন্সিয়ানায়। নীতুকে জড়িয়ে ধরার পরের শটেই মিলাদের আসর – একবারের জন্যেও তাঁর মৃতদেহকে দেখান হয় নি পর্দায়। কফিনটুকু ছাড়া। ছবি জুড়ে যে লিরিক্যাল সাবট্যান্স আছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, জাভেদের মৃত্যুর পর, যখন মায়া ড্রয়ারে তুলে রাখা ছবির ফ্রেমগুলো আবার টেবলে সাজায় আর ঠিক তার পাশে রাখা থাকে একটি ফেভিকলের স্টিক। কারণ, মৃত্যু সব অভিমান, রাগের শেষ। এরপর সামনে একসঙ্গে থাকার অনন্ত সেতু।

অভিনেতা ইরফান খানের তুলনা একমাত্র ইরফান খান নিজেই। জাভেদ আর তিনি যেন অবিচ্ছেদ্য – কেউ কারো থেকে আলাদা নন। মায়ার চরিত্রে রোকেয়া প্রাচীর কাজ অসাধারণ। পার্নো মিত্রের যে টুকু করার ছিল, তিনি তা নিষ্ঠার সঙ্গে করে দেখিয়েছেন। সাবেরীর ভূমিকায় নুসরাত ইমরোজ তিষা খুবই ভাল করেছেন। ডুব ছবিতে ক্যামেরার ভূমিকাও প্রায় চরিত্রদের মতই গুরুত্বপূর্ণ।

 ফারুকীর অন্যতম মাস্টারি ক্যামেরার ব্যবহারে। এ ছবিও তার ব্যতিক্রম নয়। আসলে উচ্চদাগের মেলোড্রামাকেই ছায়াছবি আর সিরিয়ালের মূল মেটেরিয়াল হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত বাঙালির, ফারুকীর সংযত আবেগকে গলাঃধরণ করতে অসুবিধা যে হবে, তা বলাই বাহুল্য। অভিজাত নৈঃশব্দের ভাষা যে আলাদা! সে ভাষা, সবাই বুঝবে – এ আশা না রাখাই মঙ্গল!

ছবিঃ গুগল