কলেজস্ট্রিট-শিয়ালদা চত্বর, আসলে একটি মোহিনী ফাঁদ

রাহুল পণ্ডা

(কলকাতা থেকে): পুরনো পাপীরা জানে কলেজস্ট্রিট-শিয়ালদা চত্বর বাইরে যোগিনী হলেও, আসলে একটি মোহিনী ফাঁদ বিশেষ। চিত্ত দুর্বল হলেই আপনার নিঃস্ব হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না।

এই যেমন আমি, পকেটে দেড়শো টাকা নিয়ে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির পিছনে ঘুর ঘুর করছিলাম। উদ্দেশ্য মহৎ, পুরনো বই-এর দোকানে ভালো কিছু চোখে পড়লেই সস্তায় তুলব। পেলামও, ‘দেশ’-এর একটি পুরনো রবীন্দ্রসংখ্যা। তুলে নিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে দাম জিজ্ঞেস করতেই দোকানের ফচকে ছোঁড়া বলে কিনা দেড়শো! আমি বললাম, ‘রোসো খোকা, বেশি উড়ো না। এ লাইনে আমি পুরনো কাস্টমার, তিরিশ টাকা দেব। নিতে হয় নাও, নইলে এই বই নিয়ে চললাম।’ তারপর যা হয়, প্রথা-মাফিক হাউহাউ, ঘেউঘেউ, দাওদাও, নাওনাও ইত্যাদি করে রফা হল পঞ্চাশে। মুখে যাই বলি, মনে জানি আঠানব্বই সালে ছাপা এই ওল্ড ওয়াইন পঞ্চাশে পাওয়া রীতিমতো ভাগ্যের বিষয়, চূড়ান্ত বার্গেন। ফলে কেনার পর আর কাল বিলম্ব করিনি, সোজা হাঁটা লাগিয়েছি মোহিনীমোহনের দিকে।

প্রেসিডেন্সি কলেজ

আহ্লাদে ডগমগ হয়ে ফিরছি, বগলে রবীন্দ্রনাথ, পকেটে একশো টাকা। পড়তি হেমন্তের বিকেলে পরের হিসেবটা খুবই সোজা, অটো পাকড়ে শিয়ালদা যাব এবং পাঁচটা কুড়ির ফাঁকা সোনারপুর লোকাল ধরে বাড়ি, সব মিলিয়ে পনেরো টাকা খচ্চা, সুতরাং পঁচাশি টাকা বাঁচছেই আজ। চাই কী, ফেরার পথে অনুপদায় বড় ভাঁড়ে একটা চা-ও খাওয়া যেতে পারে, সঙ্গে রোল কেক।

কিন্তু প্রেসির সামনে আসতেই গুবলেট হয়ে গেল সব, ভেতর থেকে অন্তরাত্মা কাতরে উঠল, ‘ভাই।’ আমি জানতাম এটাই হবে। এমনিতে হারামি রাতদিন পড়ে পড়ে ঘুমোয়, না ঘরের কাজে লাগে, না ঘাটের, কিন্তু বেজায়গা এলে ঠিকই ধড়ফড়িয়ে উঠে হাঁক পাড়তে শুরু করে। আমি উত্তর দিলুম না, কনভারসেশনে গেলেই বিপদ এখন। কিন্তু সে বাদী ছাড়ার নয়। ফের ভেতর থেকে বন্যায় ভেসে যাওয়া ছাগল ছানার মতো হাঁকু-পাঁকু স্বর উঠে এল, ‘ভাই।’

আমি চুপ।

‘ভাই, একটি বার শোন।’

চুপ।

‘ভাই, এভাবে তুই চলে যেতে পারিস না।’

চুপ।

‘ভাই, তোরও তো ইচ্ছে করে বল।’

চুপ।

‘সেই কতক্ষণ থেকে টো টো করে ঘুরছিস। কত হাঁটলি, ঘুরলি, ধুলো পড়া বই ঝেড়ে তুললি।’

‘তো?’

‘একটু জিরিয়ে নে।’

‘বাড়ি গিয়ে জিরোব।’

‘আহা, বাড়ি ফিরতে তো আরও ঘন্টা খানেক লাগবে। তুই তো সহ্য করতে পারবি না।’

‘খুব পারব।’

‘তোর সয় না আমি জানি। কেন নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিস?’

‘কষ্ট দিচ্ছি না। এটা সংযম, এটা প্রহার, এটা চর্যা।’

‘কী লাভ? বরং চাদ্দিকের বিকেলটা দেখ। কেমন স্যান্ডউইচের মতো আকাশ, সসেজের মতো ট্রামলাইন, চিকেন রোলের মতো প্রেসির থাম। এইসব বিকেলেই তো লালসা, অসংযম, ভোগ।’

‘উফফ, এভাবে বলিস না। আমি ওটস, ফ্রুটস, জ্যুস খাই এখন। এসব আমায় মানায় না।’

‘খুবই মানায়। শরীরটাকে তো এদ্দিন চাবকালি, কী লাভ হল?’

‘ক্রমশ চাবুক হয়ে উঠছি।’

‘বাল হচ্ছো। একই রকম নাদ্যোস রয়েছ। মাঝখান থেকে কিছু অসহায় স্বাদকোরক পলান্নের অভাবে হাহাকার করতে করতে মারা গেল। এই মৃত্যু উপত্যকার দেশ বুঝি তুই চেয়েছিলি?’

‘না! আমি ঠিক এভাবে চাইনি!’

‘কী চেয়েছিলি? দিনের পর দিন ওদের আত্মত্যাগ, ওদের তাড়না, ওদের শিশুসুলভ সহজ খিদেগুলোকে নস্যাৎ করে দিয়ে কোন ইউটোপিয়ার স্বপ্ন ফাঁদছিলি তুই?’

‘তেমন কিছু নয়…’

‘কোন কিছুই নয়। আর শুনে রাখ, তোর এই সাড়ে পাঁচফুট হাইটে কোন কিছুই হওয়া সম্ভব নয়। এমনকি মেসিও তোর থেকে এক ইঞ্চি লম্বা এবং সে-ও প্রাণের সুখে বার্গার খায়।’

‘তাহলে? উপায় কী এখন?’

‘পাপ শুধরে নে।’

‘কী করতে বলিস?’

‘রাস্তা পেরোস না, সিগন্যাল হলেই বামহাতে ঢুকে যা।’

‘ওদিকে তো…’

‘হ্যাঁ, দিলখুশা। ভালোবাসা। ঢুকে যা সোজা। আস্ত একখানা চিকেন কবিরাজি অর্ডার করিস। সব পাপ ধুয়ে যাবে।’

এর পরের হিসেবটা ফের বদলে গেল জানেন তো। বইয়ের দোকানে নব্বুই টাকা বাঁচিয়েছিলাম, কবিরাজি খেতে পঁচানব্বুই টাকা বেরিয়ে গেল। পকেটে পড়ে রইল পাঁচ টাকা। স্বভাবতই নো অটো। হাঁটতে হাঁটতে শিয়ালদা। তারপর কোনক্রমে ট্রেনের টিকিট কেটে ছটা বাইশের ক্যানিং লোকালের ভিড়ে সেদ্ধ হতে হতে যখন যাদবপুরে ঠেকলাম, পকেটে ফুটো কড়িটাও নেই। চা দূরস্থান, ভাঙ্গা নিমকিও দেবে না কেউ।

বলেছিলাম না, কলেজস্ট্রীট বড় সহজ জায়গা নয়। বুঝিয়ে দেয় উল্লাস ক্ষনিকের, ব্যথা বহুক্ষণের।

ছবি: গুগল

 

  • Lutful Hossain

    বাহহ ! এখন মনে হচ্ছে কালই চলে যাই একবার। তারপর ফিরে আসি ঝাড়া পকেটে।