ঘুণপোকা..

জসিম মল্লিক,(টরন্টো থেকে)

আমি আসলে একটু কিম্ভুত। সবসময় এটা মনে হয় আমার। আমি কে! কেনো এই আমি! কেনো এই জন্ম! কেনো বেঁচে থাকা! আমার অস্তিত্বের দাবী কি! এইসব আত্ম জিজ্ঞাসার উত্তর সহজে মেলে না। মাথাটা ভোম্বল লাগে। রাতে ঘুম হয় না ঠিকঠাক। জেসমিন প্রায়ই বলে ঘুমের মধ্যে কথা বলো কেনো! মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে! বাজে স্বভাব! আমার একটু টেনশন হয়। ঘুমের মধ্যে না জানি কি বলি! মহা যন্ত্রণা তো! জেসমিনের কথায় আমি বোকা সুলভ হাসি। আজকাল প্রায়ই মনে হয় সেই ছোটবেলার আমি আর এখনকার আমি দুজন সম্পূর্ন আলাদা। দেশের আমি আর বিদেশের আমি এক না। বরিশালের আমি আর টরন্টোর আমি এক না।

জেসমিন আর আমি

শৈশবের আমি’র সঙ্গে এখনকার আমি’র কেনো মিল নাই। চিন্তায় মিল নাই, জীবন যাপনে মিল নাই, অর্থনৈতিক মিল নেই। শুধু একটা জায়গায় মিল সেটা হচ্ছে অভিমান। সেটা হচ্ছে দুঃখবোধ। সেটা বদলায়নি। বদলাবে না। আমার অপমানবোধ খুব প্রবল। আমি সব সহ্য করতে পারি কিন্তু কেউ আমাকে অপমান করুক, অন্যায় আচরন করুক, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করুক সেটা আমি একদম সহ্য করতে পারি না। ঘুণপোকার মতো কুঁড়ে কুঁড়ে খায় আমাকে।

জীবনে আমি কি অপমানিত হইনি! অনেকই হয়েছি, প্রত্যাখ্যাত হইনি! অনেকই হয়েছি। এখনও কি হই না! হই। এখনও আমি ডিপ্রাইভ হই, অন্যায়ের শিকার হই। যারা আমাকে অসম্মান করে, তুচ্ছজ্ঞান করে, আমার যোগ্যতা আর সততাকে মূল্য দেয় না তারা কি জানে যে আমাকে অনেক মানুষ ভালওবাসে! বা হয়ত জেনে শুনেই আমার প্রতি অন্যায় আচরন করে ,অবিচার করে। এগুলো করে দেখাতে চায় যে অবজ্ঞা করা অনেক সহজ। এটা করে তারা তৃপ্তি পায়। মূর্খদের হাতে ক্ষমতা গেলে তারা ক্ষমতা দেখাতে পছন্দ করে। এটা মানুষের সহজত ধর্ম। এক জীবনে সব মানুষকেই এসবের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কেউই নিরবচ্ছিন্নভাবে সুখী নয়। সবারই উথ্থান পতন আছে। সবারই আমলনামা লেখা হয়। কেউ সেটা আগে বোঝে কেউ দেরিতে।

মনে আছে আমি এক বাঙ্গালি ম্যানেজারের অধীনে কাজ করেছিলাম। সে ছিল অল্প শিক্ষিত, বাচাল আর ধুরন্দর টাইপ। আমি যতদিন কাজ করেছি সে তার পক্ষে যতটুকু সম্ভব আমাকে হার্ড টাইম দিয়েছে। বিনা কারনে আমার উপর রুষ্ট ছিল। যারা তাকে তোয়াজ করতো তাদের ফেভার করতো, আমি তোয়াজ করতে পারি না বলে আমাকে পছন্দ করতো না। মুখে মিষ্টি ঝরে পড়তো ঠিকই কিন্তু আমার প্রতি সবধরনের অবিচার করেছে। সে নিজে ছিল ফাঁকিবাজ। মালিককে ঠকাতো। আমি কোনো ফেভার চাইতাম না, আমি চাইতাম ফেয়ারনেস। একজন বাঙ্গালি আর একজন বাঙ্গালিকে সহ্য করতে পারে না, জেলাস হয় কেনো! অন্য জাতিরাও কি এমন! কে জানে। শুধু বিদেশে বলেই না দেশেও এই অভিজ্ঞতা আমার ছিলো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এসব মেনে নিতে হয়। একটা কষ্টের ঘুণপোকা শুধু কেঁটে চলে।

দুই.

একসময় আমি নিজের উপর খুব মনোযোগী ছিলাম। নিয়ম মতো জীবন যাপন করতাম। রোজ সকালে গাড়ি নিয়ে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিতাম, তারপর গুলশান পার্কে ঘড়ি ধরে ৩০ মিনিট হাঁটতাম, শরীরে ঘাম দেখা দিত। ঘরে ফিরে শাওয়ার করে ফিটফাট হয়ে অফিসে চলে যেতাম। যেদিন সকালে পারতাম না সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে মানিকমিয়া এভিনিউতে গাড়ি পার্ক করে সংসদ ভবন এলাকায় হাঁটতাম। রাতে দারুন ঘুম হতো। কানাডা আসার পরও সেই অভ্যাস অনেকদিন ছিল। সকালে ঘুম ভেঙ্গে যেতো। শরীর ধরে রাখার জন্য ভোরে উঠে সামান্য ফ্রিহ্যান্ড ব্যায়াম করতাম, কয়েকটা বেন্ডিং আর তিন চারটা আসন। আজকাল ওসব মনে পরলেও ক্লান্তি চলে আসে। জিমে যাওয়ার কথা মনে করলে আসে জ্বর। অথচ ওসব দরকার খুব। জেসমিন বলে সারাক্ষন ওই চেয়ারটায় বসে থাক কেনো!
কি করব তাহলে!
আগেতো প্রচুর হাঁটতা এখন তো দেখি না।
হাঁটি মাঝে মাঝে।
জিমেও যাও না।
আলসে লাগে।
তাতো লাগবেই। আলসেমির জন্যই কিছু করতে পারো নাই জীবনে।
সবাই সব কিছু পারে না বুজছো!
এইসব কথা শুনতে ইচ্ছে করে না।
ওকে শুননা। কিছু ব্যর্থ মানুষও থাকে।
শখ করে ব্যর্থ।
মোটেও তা না। এখানে আসার পর আমার ইচ্ছেটাই নষ্ট হয়ে গেছে। এই জীবনতো আসলে কোনো জীবন না। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তিগুলো মুখ থুবড়ে পরেছে জীবন থেকে।
অকৃতজ্ঞের মতো কথা বলবা না। নিজেই এসেছো। আমরা আসতে চাইনি! এখন এসব কথা বলার কোনো মানে নাই। এই দেশ অনেক দিয়েছে।
তুমি সবকিছু মনে নিতে পার। আমি কেনো যে পারি না!
মেনে নেবো না তো কি করবো। টেবিলে মাথা গুজে চিন্তা করলে কোনো কিছু হবে!
আরে রাগ করো কেনো। দেখছো না কেউ কাউকে ভ্যালু করে না। সবাই শ্রেষ্ঠ।
দেশে বুঝি মানুষের ভ্যালু আছে! ওখানে আরো ডিপ্রাইভ। সেটা নিজেই জানো। সবকিছু ভুলে গেছো! তুমিইতো বলতা জেসমিন থাকব না এদেশে। সততার কোনো দাম নাই। এদেশে সততার দাম আছে।
আচ্ছা বাবা ঠিক আছে।
নিজের যত্ন নাও তাহলেই হবে!

তিন.
শরীরের উপর এতো মায়া কেনো সবার! কেউ সবসময় চোখে চোখে রাখুক এটা ভাল লাগে না আমার। এটা ঠিক যে একসময় আমি সতর্কভাবে রাস্তা পার হতাম, সুন্দর ভঙ্গিতে সিঁড়ি বেয়ে উঠতাম কিংবা নামতাম, সুন্দর ভঙ্গিতে টেলিফোন তুলে নিতাম কানে, সবকিছুতেই একটা মোনোযোগ ছিল। এখন আমি সকালে লেপের ভিতর একটা খোদল তৈরি করে শুয়ে থাকি। খোঁদলের ভিতর নিঃশ্বাস আর গায়ের তাপ জমে ওঠে। আস্তে আস্তে বেলা বাড়ে টের পাই। পর্দার ফাঁকে দিনের আলো তীব্র হয়। একসময় উঠি। প্রথমে ফোনটা অন করি। ফেসবুকে ম্যাসেজ দেখি ঘুম ঘুম চোখে।
জেসমিন বলবে বাজে অভ্যাস। যাও ফ্রেশ হও।
সকালের চা টা আমি বানাই। এই কাজটা আমি নিষ্ঠা নিয়ে করি। কানাডা আসার পর এই অভ্যাস হয়েছে আমার। জেসমিনও অপেক্ষা করে আমার হাতের চায়ের। বন্ধুরা বা আত্মীয়রা এলে বলবে জসিম ভাইয়ের হাতের চা খাব।
একদিন রাতে বরিশালের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আমার মনে হয়েছিল আচ্ছা জীবনের সুসময় কি পেরিয়ে এসেছি! কোন সময়টা সুসময় ছিল তাওতো মনে করতে পারি না। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই এক অনন্ত লড়াই সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছি। বেঁচে থাকার সংগ্রাম, লিখবো বলে সংগ্রাম, সংসার নিয়ে সংগ্রাম, সন্তানদের জন্য সংগ্রাম। ওরা কি মনে রাখবে বাবা মায়েরা কত অনন্ত ত্যাগ করে!! মনে কি রাখে! সেই রাতে আকাশে তারা না, মেঘ না, কিছুই দেখা যায় না। শুধু ধোঁয়ার মতো কুয়াশা ঘিরে থাকে আমাকে। বহুদূর দিয়ে মন্থর বিষন্ন ট্রাক চলে যাওয়ার শব্দ হয়, টুপ টাপ করে অন্ধকারে কোথাও গাছের পাতা কি শিশির ঝরে পড়ে। দূরে কোনও ল্যাম্পপোস্টের ক্ষীণ আভা লেগে কুয়াশা সামান্য হলদে হয়ে আছে। কেনো যেনো মনে হলো আর উচ্চাশা নাই। উচ্চাশার হাত থেকে মুক্তি।
জেসিমনকে আজকে বললাম, একটা আশ্চর্য্য ব্যাপার কি জানো!
কি।
দেশে আমার নিজস্ব থাকার কোনো জায়গা নাই।
কিছু করো নাই তাই নাই।
কারো কাছে থাকতে ইচ্ছে করে না। কারো কাছে কিছু চেয়ে নিতে পারি না।
ওসব নিয়ে এখন ভেবে কোনো লাভ নাই।
আমি মজা করে বললাম, এবার গিয়ে ফার্মগেট ওভার ব্রিজে থাকব। হিহিহি।
ঢং দেখলে বাঁচি না..।

ছবি: লেখক ও গুগল