বার্কিং টু টিলবুরি টাউন

শেখ রানা (নিউবুরি পার্ক, লন্ডন)

এক.

খুব ভোরে উঠে নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়ি। লন্ডনে আন্ডারগ্রাউন্ডের মানচিত্র মাথায় সবে ম্যাপিং করেছি, কিন্তু আমাকে ছুটতে হচ্ছে সি টু সি ট্রেন ধরে। এখানে বলে ওভারগ্রাউন্ড। মিনিট চল্লিশ দূরত্বে পৌঁছে যাই টিলবুই টাউন। স্টেশনের খুব কাছেই কারখানা।

জীবন হরেক রঙের ঝাঁপি নিয়ে আমাকে বরণ করে নেয়। নানা রঙের, কথার, ভাবনার মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। সেই রঙের আইল ধরে ক্রিসমাসে নতুন কাজ শুরু করি আমি। এক বিশাল কারখানায় নিয়ম মেনে টাচ ইন করে নির্দিষ্ট সময়ে ঢুকে পড়ি। এন্তার ব্যস্ততা শুরু হয় তারপর। রাজ্যের সামগ্রী প্যাকিং করা, স্ক্যান করা আর তারপর নির্দিষ্ট বেল্টে পৌঁছে দেয়া। দশ ঘন্টার এক এক শিফটে শেষদিকে এসে ছোট্ট শরীরে আর কুলায় না। কিন্তু তবু ভালো লাগে আমার। বিরতির ঘোষণা হতেই লাইন ধরে সবাই ক্যান্টিনে যায়। ক্যান্টিনে বসে মাঝেমাঝে আমার নিজেকে সিনেমার চরিত্র মনে হয়। কিন্তু আমি জানি আমার নাম দুখু মিয়া।

এই জীবনে কত বিচিত্র কাজ যে করলাম। সিঙ্গাপুরে এক মাস মসজিদের খাবার বিতরনকারী, ঢাকায় ফিরে এসে প্রোডাকশন হাউজের ক্রিপ্ট রাইটার, লন্ডন পেপার বিক্রেতা, রিটেইল শপের টিম মেম্বার, ফুটবল মাঠের সেফটি স্টুয়ার্ড, খেলার পোষাক আর সরঞ্জামাদী দোকানের সেলসম্যান, টিভির জন্য বিজ্ঞাপন লেখা, আবার ঢাকায় ফিরে এসে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় দুই দফায় কপিরাইটার, স্কটল্যান্ডে চিকেন শপে চিকেন নিয়ে হুমাহুমি, সেইন্সব্যারি শপের অনলাইন শপার হয়ে আবার লন্ডনে ফিরে এসে কারখানার শ্রমিক। আর সবকিছু ছাপিয়ে আমার গীতিকার পরিচয়। গান লেখা। খুব মাঝে মাঝে গান লেখার কাজ।

জীবনের রূপ-রস-গন্ধ প্রসারিত দুহাতে আলিঙ্গন করেছি। জীবনও আমাকে আলিঙ্গন করেছে, প্রায়শ। পাশে বসে দু’দন্ড জিরিয়ে, আমার সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পর ফিরে গেছে দেয়ালে, আকাশে, দৃশ্যে, অদৃশ্যে।

সময় নাম নিয়ে আড়াল করেছে নিজেকে।

দুই.

এই লিরিক আর গানের আদল খুব বিপরীত অথচ কি অদ্ভুতভাবেই না একই ছায়াতলে বিশ্রাম নেয়। সম্মিলিত আনন্দ আর নিজস্ব হাহাকারের পাশাপাশি অবস্থানে আমাকে মনে করিয়ে দেয় জীবন মানে বিষাদ আর ‘না বিষাদী’ সময়ের পথ চলা। অবিরাম, অবিশ্রান্ত।

ফিরে পেতে চাই- লিরিকটা লিখেছিলাম ঢাকায়, রাজশাহীর উত্তাল বোহেমিয়ান জীবন থেকে ফিরে এসে। দোর্দন্ড প্রতাপে যখন নিঃসঙ্গতা আর হাহাকার আমাকে গ্রাস করে নিয়েছিল এক রাতে। আঁধার সর্বগ্রাসী হয়ে আমার বুক পাঁজরের দখল নিয়ে নিয়েছিল।

গভীর রাতে লিখতে বসেছিলাম-ফিরে পেতে চাই। লিখতে লিখতে মনে হচ্ছিল -কিছু দাঁড়াচ্ছে না। আমি শুধু লেখাটা শেষ করে একটা শান্তির ঘুমঘরে প্রবেশ করতে চাইছিলাম। যে ঘর থেকে আর না বের হলেও দুঃখ থাকবে না আমার।

তীর হারা দুঃসময়ে তখন আমার জীবন টালমাটাল। লিরিকটা যত লিখছিলাম তত আকুল হয়ে কৈশোরে ফিরছিলাম। হাইকোর্টের সেই নিশ্চিত সবুজ জীবনে। প্রিয় কারো আঙিনায় ফিরতে চাইছিলাম। আর বৃষ্টি তখন আমার লেখার নিয়মিত অনুষঙ্গ, ভাবনারও।

বাপ্পা ভাইকে তখন লিরিক শেষ হলে দিয়ে আসতাম। একটা ফাইল ছিল বোধ করি। আমার লিরিকগুলো ওখানেই জমা হতো। আমাকে চমকে দিয়ে এক-দুইটা গান সুর হতো। এভাবেই একদিন ফিরে পেতে চাই সুর হলো, সঙ্গীত হলো। আর সেই বিষাদ গানটা অপার্থিব আনন্দ নিয়ে গলায় তুলে নিলেন সঞ্জীব’দা-বাপ্পা ভাই।

একটা কনসার্ট এর কথা আমার খুব মনে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এক ডিপার্টমেন্ট এর নবীন বরণ বা শিক্ষা সমাপনী উপলক্ষ্য। সে সময় দলছুটের সঙ্গে বিভিন্ন কনসার্টে আমিও যেতাম। বাপ্পা ভাই আমাকে ‘পরী’, ‘ফিরে পেতে চাই’ বা ‘বৃষ্টি পড়ে’-গাওয়ার আগে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন। আমি অতীব সংকোচ নিয়ে অনেক মানুষের সামনে দাড়াতাম। নার্ভাস হয়ে হাত নাড়তাম। তারপর স্টেজের পিছনে গিয়ে প্রায় লুকিয়ে থাকতাম।

২০০৩-০৪ এর দিকে। টি এস সি-র অডিটোরিয়ামে সেই কনসার্ট শুরুই হলো ‘ফিরে পেতে চাই’ দিয়ে। তারপর গাড়ি চলে না, বায়োস্কোপ, পরীর-র মত তুমুল জনপ্রিয় গান হলো। কনসার্ট শেষ হচ্ছে ঘোষণা শোনা মাত্র দর্শকসারি থেকে একযোগে ‘ফিরে পেতে চাই’ আবার গাইবার অনুরোধ। আবার গাওয়া হলো-

আমি ফিরে পেতে চাই/ সেই বৃষ্টি ভেজা সুর/ আমি ফিরে পেতে চাই/ সাত সুখের সমুদ্দুর/ শুধু একটিবার, একটিবার/ তুমি বৃষ্টি ঝড়াও ফিরে চাও/ আমার সুরের সাথে, তোমার সুর মেলাও/ সুর মেলাও…

সবাই একসঙ্গে সুর মেলালো ফিরে পেতে চাওয়ার সেই গানে। সেই মুহূর্তগুলো তখন আমাকে শূন্যতা ছাড়া আর কিচ্ছু দেয় নি। অথচ এখন ফিরে তাকালেই পরম শান্তি লাগে অন্তরে।

অনেক গানের ভিড়ে একটা সুন্দর গান কোনোদিন উধাও হয় না। কারো না কারো আকুল দিনে থেকে যায় নিভৃতে।

জীবন কোলাহলে সুন্দর। জীবন নিভৃতে আরো বেশী সুন্দর।

তিন.

অনেক দিন পর একটা লিরিক লিখলাম। আজ সেই লিরিক দিয়ে গীতিকারের গল্প শেষ হোক বরং। নাম দিয়েছি-জীবন পরস্পর।

দমে দমে মানুষ মরে, মারো

আমি তখন দূরে সরি আরো

কত দূরে গেলে বলো-

মৃত্যুতে সুন্দর

তুমি তখন প্রসাদ নিয়ে ব্যস্ত

বাস্তবতায় কী নিদারুণ ত্রস্ত

কত কথা বলা হলে-

স্বপ্নালু অন্তর

পৃথিবীতে মানুষ যখন সংখ্যা

শিরোনামে আনন্দ আর শঙ্কা

আর কিছুদূর গেলেই পাবো-

খবর বিনোদন

বিনোদনের শেষ ও কিন্তু আছে

আমার তোমার প্রশ্নগুলোর আঁচে

যাদের হবার কথা ছিলো-

খেই হারানো স্বর

তারাই এখন ধরা ছোঁয়ার উর্ব্ধে

আমি তুমি পক্ষে ও বিরুদ্ধে

দ্বন্দ্বমুখর হয়ে আছে-

জীবন পরস্পর

ছবি: লেখক