জীবনের অযৌক্তিকতা ও কামু

ফরাসী দার্শনিক, সাহিত্যিক ও নাট্যকার জ্যাঁ পল সার্ত্রে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী সাহিত্যিক আলবেয়ার কামুর মৃত্যুর পর বলেছিলেন, ‘অবধারিতভাবেই কামু আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রধানতম ব্যক্তিবর্গের একজন হয়ে উঠেছিলেন এবং ফ্রান্সের ইতিহাস ও তার নিজের শতাব্দীর তিনি ছিলেন এক স্বতন্ত্র প্রতিনিধি।’জীবনের অযৌক্তিকতা বা অ্যাবসার্ডিটি ও অস্তিত্ববাদকে সাহিত্যে নিপুন ভাবে ব্যবহার করে আলোচিত হয়েছিলেন বিশ্বনন্দিত সাহিত্যিক অ্যালবেয়ার কামু। তাঁর লেখা বারবারই জানান দিয়েছে জন্ম বা মৃত্যুর মধ্যে কোনো অর্থ নেই। আবার এই বিষয়গুলোকে তিনি একেবারে অস্বীকারও করেননি কখনো। নিজের দর্শন চিন্তা আর উপলব্ধির গভীরতা থেকে জীবনের এক ধরণের নিরর্থকতাকেই চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। তিনি বলতে চেয়েছিলেন পৃথিবীর সবকিছুর মধ্যে যুক্তি বিরাজ করে না।
বিংশ শতাব্দীতে দুটো বিশ্বযুদ্ধ, মানুষের মৃত্যু, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া সময়ের আয়নায় নিজেকে দেখতে চেয়েছিলেন কামু।
১৯১৩ সালের ৭ নভেম্বর আলজেরিয়ার এক ছোট্ট শহরে জন্ম হয় এই সাহিত্যিকের। গত মঙ্গলবার ছিলো তাঁর ১০৪তম জন্মবার্ষিকী।
আলবেয়ার কামুর বেড়ে উঠা দারিদ্র্যপীড়িত আলজেরিয়ায়। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বাবা মারা যাওয়ার পর অভাবের কারণে কামু ও তার মা নানীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৩৫ সালে তিনি দর্শনে গ্রাজুয়েট করেন ইউনির্ভাসিটি অব আলজেরিয়াস থেকে। ক্রিশ্চিয়ান মেটাফিজিক্সস এ্যান্ড নিও-প্লেটোনিজম শিরোনামের অভিসন্দর্ভ রচনা তিনি।
আলবেয়ার কামু সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। একইসঙ্গে ‘তেয়াত্র দ্য লেকিপ’ নামে একটি তারুণ্যনির্ভর প্রগতিবাদী নাট্যদল সংগঠন করেন। তার প্রথমদিককার প্রবন্ধ লঁভের্স এ লঁদ্রোয়া’ (দ্য রঙ সাইড এন্ড দ্য রাইট সাইড) এবং ‘নস’ (নাপটিয়ালস) বইতে সঙ্কলিত হয়েছে। পরে তিনি প্যারিসে যান এবং আলজেরিয়ায় ফিরে আসার আগে সেখানে পারি সোয়ার নামের দৈনিক পত্রিকাতে কিছুদিন কাজ করেন।
১৯৪১ সালে জার্মানি যখন ফ্রান্স দখল করে নেয়। সেই সময় তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের একজন পুরোধা হয়ে ওঠেন। তিনি গুপ্ত পত্রিকা কোঁবাতে লেখালেখি ও সম্পাদনার কাজ করেন। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন এবং লা পেস্ত (দ্য প্লেগ, ১৯৪৭), লে জুস্ত (দ্য জাস্ট, ১৯৪৯) ও লা শুত (দ্য ফল, ১৯৫৬) লিখে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন। পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে নাটকের প্রতি তার অনুরাগ জম্মে। এ সময় তিনি উইলিয়াম ফকনারে রিকুইয়েম ফর আ নান ও এবং দস্তয়েভস্কির দ্য পোসেসডের নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দেন।

আলবেয়ার কামু

তার লেখা নাটক কালিগুলা ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত হয়। তার শুরুর দিককার দুটি উল্লেখযোগ্য বই হল— লেত্রঁজে (১৯৪২, দ্য আউটসাইডার) এবং ল্য মিথ দ্য সিজিফ (১৯৪২, দ্য মিথ অব সিসিফাস)। আর তাঁর লেখা আলোচিত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘দ্য ফল’, ‘দ্য প্লেগ’, ‘এ হ্যাপি ডেথ’ (১৯৩৬-৩৮) ও ‘দ্য ফার্স্ট ম্যান’ (অসম্পূর্ণ ) প্রভৃতি ।
সম্ভবত দ্য আউটসাইডারের জন্যই তিনি বেশি পরিচিত। এটি খুবই জনপ্রিয় উপন্যাস। ম্যুসাল্ট নামের একজন খুনীর গল্প দ্য আউটসাইডার। সমাজের সঙ্গে তার কোনো সুসংহত সম্পর্ক ছিল না। এ সমাজে সে যেন অন্য কেউ। সমাজ তাকে কোনোভাবেই আন্দোলিত করে না। এমনকি মায়ের মৃত্যুতে তার কান্না আসে না। এক ধরনের মানসিক বিকারগ্রস্ততার আবরণে কামু একটি সময় ও তার প্রতিক্রিয়া মানুষের চরিত্রের ওপর আরোপ করেন। তিনি ১৯৫৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। কম বয়সে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের মধ্যে রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের পর পরই তার অবস্থান।আলবেয়ার কামু ১৯৬০ সালের ৪ জানুয়ারি প্যারিসে এক কার এক্সিডেন্টে মারা যান।

ছবিঃ গুগল