দ্বিখণ্ডিত

স্মৃতি সাহা

শ্বেতার মনজুড়ে আজ ডাহুকের ডাক। প্রতিটি শ্বাস যেন আজ দীর্ঘশ্বাসের অবিচ্ছিন্ন মিছিল। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় বৃষ্টিভেজা গাছের নতুন পাতাগুলো এই মধ্যরাতে কেমন জ্বলজ্বল করছে। শ্বেতার হাত বাড়িয়ে সেই আলো ছুঁতে ইচ্ছে করে! শ্বেতার খুব মায়ের কথা মনে পড়ছে। এমন বৃষ্টির রাতে মাথার কাছের জানালা খোলা রেখেই শ্বেতা যখন ঘুমিয়ে পড়তো তখন মাঝরাতে মা সেই যে বড় ট্রাংক, তা থেকে কাঁথা এনে মমতার উষ্ণতা জড়িয়ে দিতো। শ্বেতা হাত-পা গুটিয়ে খোঁজে সেই উষ্ণতা। শ্বেতার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। প্রাণভোরে আর একবার নিঃশ্বাস নেয় শ্বেতা। বাতাসে কি আজ সজনে ফুলের গন্ধ! সাদা আর হলুদে মেশানো সজনে ফুল। সেবার সেই একটানা জ্বর যখন পুরো শীতের ছুটিটা মাটি করলো তখন দিনভর বড়ঘরের বারান্দায় শীতলপাটি বিছিয়ে মা শুইয়ে রাখতো। রান্নাঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে মায়ের চোখ পাহারায় রাখতো শ্বেতাকে। আর শ্বেতার চোখ!! তা নির্নিমেষ আটকে রইতো উঠোনের সজনে গাছের ফুলে। সাদা-হলুদে যখন ঘোর লেগে আসতো তখন নিজে থেকেই চোখ বুজে আসতো। শ্বেতার বন্ধ চোখের কার্ণিশে এখন সাদা-হলুদের ঘোর। বিন্দু বিন্দু হলুদ আস্তে আস্তে বৃত্ত অতঃপর বৃত্তগুলো বড় হতে হতে ফ্যাকাসে হলুদ আর শেষে সাদা হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। শ্বেতা হলুদ বৃত্তগুলোকে আঁকড়ে ধরতে চায়। ঠিক এমন একটা বৃত্তের মধ্যে আটকে গেছে শ্বেতা আর অনিকেতের জীবন। না, অনিকেত নয়, অনিকেত রায়-এর জীবন।
অনিকেত রায় এ সময়ের একজন বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক। পর পর দু’বার সাহিত্যে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার ঘরে তুলেছেন। তাঁর এক একটি লেখা যেন সমাজের দর্পন, জীবনের আলেখ্য। শুধু সমাজের সমস্যা দেখিয়ে তিনি তাঁর দায় শেষ করেন না, সমাধানটাও নিয়ম করে উপসংহারে দিয়ে দেন। তাই তাঁর লেখাতে যথাযথ সাহিত্যমানের সাথে সাথে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা মেটানোর ইচ্ছেটাও থাকে প্রকট। আর এজন্যই মনে হয় এসময়ের একজন আদর্শ লেখক হিসেবে তাঁর নাম থাকে সর্বাগ্রে। শ্বেতাও লিখতে ভালবাসে। তা সে স্কুলের দেয়াল পত্রিকা হোক বা কলেজের পাক্ষিক পত্রিকা, সব কিছুতেই শ্বেতা এক সময়ে লেখা দিতো। বন্ধুবান্ধব তো আছেই কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত শ্বেতার লেখার প্রশংসা করতো। আর এমন প্রশংসা শ্বেতাকে লিখতে উৎসাহ দিত দ্বিগুণ। এমন উৎসাহে শ্বেতা লিখে চলেছে অবিরাম। এক বন্ধুর সাহায্য নিয়ে একটি লেখা পাঠিয়ে দেয় জনপ্রিয় একটি দৈনিকে। শ্বেতাকে অবাক করে লেখাটা আসে সেই পত্রিকার সাহিত্য বিভাগে। আর ঠিক সেইদিন থেকেই শ্বেতা নিজের লেখার প্রতি আরোও নিবিষ্ট হয়ে ওঠে। এরপরের সময়টুকু শুধুই শ্বেতার লেখা গল্প হয়ে ওঠার সময়। আর ঠিক সেই সময়ের অলিন্দে অনিকেত রায়-এর নিঃশ্চুপ প্রবেশ। শ্বেতার লেখা যখন আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে তখন একদিন একটি পত্রিকা অফিসে দেখা অনিকেত রায়ের সঙ্গে। দৃঢ় ব্যক্তিত্ব আর আন্তরিকতার মিশেলে এক সম্মান আদায় করে নেবার মতো মানুষ অনিকেত রায়। শ্বেতাও ঠিক ঠিক সেই সম্মানের জায়গাতেই বসিয়েছিলো তাকে। আর নিজে থেকেই ফোন নম্বর দিয়েছিলেন অনিকেত রায়, শ্বেতা সম্ভাবনাময়ী লেখিকা তাই। লেখা নিয়ে যেকোনো সহায়তা শ্বেতাকে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে তিনি দেবেন এটা আশ্বস্ত করেছিলেন। শ্বেতার খুব নির্ভার লাগছে। বন্ধ চোখের গহ্বরে কোনো আলোর রেখা দ্যোতিত হচ্ছে কি!! হ্যাঁ, “দ্যোতিত” এই শব্দটিই অনিকেত রায়কে আরোও কাছে এনে দেয় শ্বেতার। শব্দটিকে একটি লেখায় ঠিক কিভাবে ব্যবহার করবে তা নিয়ে যখন দ্বিধান্বিত তখন অনিকেত রায়কে ফোন দিয়ে বসে শ্বেতা। আর ঠিক সেই মুহূর্ত হতে পালটে যায় শ্বেতার জীবন। একজন মানুষ কিভাবে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায় তা এই সময়েই অনুধাবন করে শ্বেতা। অনিকেত রায়ের বলে যাওয়া কথাগুলো রেশ জমা হতে থাকে শ্বেতার মনের একান্ত সিন্দুকে। আর সেই রেশ প্রতিনিয়ত সুদের হিসেবে বাড়তে থাকে। অনিকেত রায়ের লেখা চরিত্রগুলো আস্তে আস্তে কাছে বড় জীবন্ত হয়ে ওঠে। শ্বেতা নিজেকে হারাতে থাকে অনিকেত রায়ের ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল প্রভার কাছে।
প্রতিদিন নিয়ম করে শ্বেতা ফোন দিতে থাকে। অনিকেত রায়ের নির্মিত চরিত্রগুলো নিয়ে শুরু হওয়া কথাগুলো শেষ হতো ব্যক্তি অনিকেতে গিয়ে। আর শ্বেতার নিজের শব্দে আঁকা চরিত্রগুলো খেই হারাতে থাকে, গল্পগুলো মাঝপথে হারিয়ে যেতে থাকে। আর ঠিক তখনই অনিকেত রায় শ্বেতাকে লেখার শব্দের বাইরে অন্যকিছু শব্দের নিদারুণ “বুকে” উপহার দেয়। শ্বেতার ঠিক সেই “বুকে” গ্রহন করার শক্তি ছিলো না। তাই শ্বেতা আজ সাদা হলুদ সজনে ফুলের খোঁজে হারিয়ে যাচ্ছে।
পরদিন সকালে খবরের কাগজে খবরটা পায় অনিকেত রায়। “সম্ভামনাময়ী লেখিকা শ্বেতা রহমানের অকালমৃত্যু। অজানা কারণে লেখিকা ঘুমের ওষুধ সেবন করে আত্মহত্যা করেছেন।” বুকটা মোচড়ে ওঠে অনিকেত রায়ের। খবরের পাশেই মেয়েটার হাস্যোজ্জল ছবি যেন তাঁকে ব্যঙ্গ করে! দু’দিন আগেই পঞ্চাশ পেরুনো এই বিবাহিত লেখক শ্বেতাকে বুঝিয়েছিলেন শ্বেতা ভূল করছে। লেখক আর লেখকের সৃষ্টিকে এক করে ফেলছে। গল্পের চরিত্র আর লেখক এক নয়। তবুও মেয়েটির এক কথা ” সৃষ্টি কিভাবে স্রষ্টা থেকে ভিন্ন হয়!” মধ্যবয়স্ক এই লেখক অপারগ হয়ে গেল এটা বোঝাতে “এ সব আমার কল্পনা”। “কল্পনা তো আমাদের ভিতরে থাকা আমিই করি তাহলে সেই আমি কেন কল্পনার আমি নই!” এই প্রশ্নের উত্তরে অনিকেত রায় শুধু বলেছিলেন,” তোমার বয়স কম। তুমি বুঝবে না এখন। তাই এখন আর আমাদের কথা বলে লাভ নেই। নিজের লেখা আর জীবনকে সময় দাও।” ” সময়ের সবটা দিয়ে দিয়েছি যে….” ঠিক এটাই শেষ কথা ছিল শ্বেতার।

ছবিঃ গুগল