যখন ভাঙ্গছে মিলনমেলা

বিয়ে ভাঙা ব্যাপারটা এখন হামেশাই ঘটছে।একদিকে যেমন ভালোবেসে বিয়ে করার হারটা বেড়েছে তেমনি বেড়েছে আদালতের সামনে বিবাহ-বিচ্ছেদ প্রার্থী নর-নারীর লাইন। অর্থহীন, ভালোলাগাহীন সম্পর্কের ভার বয়ে বেড়ানোতে সবাই যেন ক্লান্ত।যার কন্ঠলগ্ন বা বাহুলগ্ন হলে একসময় শরীর মন শিউরে উঠতো, রোমাঞ্চিত হতো্ আজ যেন সে ক্যাকটাসসম।গৃহকোণের কোন কিছু চোখ না এড়ালেও চোখে পড়ে না মরে যাওয়া ভালোবাসা।এমনি সময় পার করতে করতেই বিচ্ছেদের ডিক্রি নিয়ে ঘোরা ছাড়া হাতে আর কিছু থাকে না। অথচ প্রেমের কোঠা শূন্যে পৌছানের আগেই কি ভাবা উচিত নয় যে,অভ্যাসের ঘুনোপোকা কি বাসা বেধেঁছে দুজনের মনে? সময়ের হাত ধরে একঘেয়েমীর একরাশ জীবাণু জানলা গলে ঢুকে পরেনিতো আপনাদের ঘরে? আর সব কিছু মিলিয়েই আপনাদের ভালোবাসা হয়ে পড়েছে ম্রিয়মান?

প্রাণের বাংলার এবারের প্রচ্ছদ আয়োজন আমরা মানব-মানবীর যৌথ জীবনের সেই ভেঙ্গে পড়া সংযোগ সেতুটাকে সামান্যও মেরামত করে নেয়ার ব্যাপারেই একটু খোঁজ-খবরের চেষ্টা চালিয়েছি।

দাম্পত্য সমস্যার ‘স’ দেখা গেলেই একে অন্যের ওপর দোষারোপ করতে শুরু করে।চুন থেকে পান খসলেই যেন মেনে নেয়ার ব্যাপারটা থাকে না।নিজের ভুলটা কোন ক্রমেই কেউ শুধরে নিতে চায় না।ভুলটা স্বীকার করলেই নাকি নিজের অহংবোধের বেলুনটা চুপসে যায়।আর এই একে অন্যের ওপর দোষারোপ থেকেই দাম্পত্য তিক্ততা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।শুরু হয় পাল্টাপাল্টি আক্রমন।আমাদের আশেপাশে এমনি কারণে আমরা অনেক সংসার ভাঙতে দেখেছি।যদি আপনাদের একে অপরের প্রতি সামান্যও শ্রদ্ধাভক্তি থেকে থাকে তাহলে একটু গভীরে গিয়ে ভেবে দেখুন আপনি আপনার স্বামী বা স্ত্রীকে যে, দোষারোপ করছেন তাতে দোষটা কার ক্ষেত্রে বেশী হচ্ছে? আর সেই দোষারোপ ঢাকতে আক্রমনই প্রতিরক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায় ভেবে প্রতিপক্ষ তৈরী না করে যদি একে অপরের প্রতি সহনশীল হন তাতে সংসারটা টিকে থাকবে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি আর ভালোবাসার ওপর।আসল কথাটা বোধ করি বন্ধুত্ব। নিজেদেরকে দেুজন আলাদা মানুষ ভেবে যদি বন্ধুত্বের হাতটা একে অপরের দিকে বাড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে কিন্তু অনেক সমস্যার সমাধান ঘটে যাবে।

প্রেমের সময়ে একে অন্যের সবকিছুই ভালো লাগে। বিয়ের প্রথমদিকে পরস্পরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেও কিছুদিন পর থেকেই একে অন্যের ভালোগুলো আর তেমন নজরে আসে না।কারণ স্বামী বা স্ত্রী নিজেদের গুনাবলীতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে যান যেন,এমনটাই তো হওয়ার কথা, এতে উৎসাহ দেয়ার কি আছে? দুজনেই ভুলে যান যে সম্পর্ক লালন করতে হয়। তাতে একের গুনাবলী স্রোতে ভাটা পড়ে অন্যের প্রশংসার অভাবে।সুতরাং একে অন্যের ভালো কাজের প্রশংসা অবশ্যই করতে হবে।খুব ছোট একটা ব্যাপারও যদি ভালো লাগে মুখ ফুটে বলুন আপনার সঙ্গীকে। নিদেনপক্ষে চোখের ইশারায়ও তাকে তার কাজের তারিফ করুন।তাতে সেও আপনাকে আপনার গুনের প্রশংসা করতে পিছপা হবে না।

বিয়ের পর যেমন তেমন। কিন্তু দিন যতো যায় ততোই যেন স্বামী বা স্ত্রী কেউ একজন অন্যজনকে নিজের ইচ্ছের নির্দেশনায় চালাতে চায়। তখন সে যে-ই হোক আত্মসম্মান থাকলে তখন পারস্পরিক সৌহার্দ্যের বিষয়টি নষ্ট হয়ে যায়।কোন কাজটি সে কিভাবে করবে তাও যদি আপনার নির্দেশে করতে হয়, এটা সে কেনো মেনে নেবে?তারও যে একটা নিজস্ব বিচার বিবেচনা আছে, এটা ভুলে গেলে চলবে না।এতে করে আপনার হীনমন্যতারই প্রকাশ পাবে।বিয়েটা কোন যুদ্ধক্ষেত্র নয় যে আপনাকেই জিততে হবে।প্রেমপূর্ণ পারস্পরিক সহাবস্থানের নামই বিয়ে। সেখানে দু’জনের ইচ্ছা,মত,বুদ্ধিই সমান গুরুত্ব পাবে।

বিয়ের পর কেন যেন মানুষের স্বতন্ত্র অস্তিত্বটি হারাতে বসে।একে অন্যের কাছে ‘আমার বউ’ বা ‘আমার বর’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।যেন নামগোত্রহীন একটা পদ।পরিচয়হীন এই সম্পর্কের পরিনাম অনেক সময় ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে।প্রতিটি মানুষেরই স্বতন্ত্র চরিত্র থাকে্। তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গুরুত্ব দেয়াই দাম্পত্যের প্রধান শর্ত হওয়া উচিত।অথচ স্বামী বা স্ত্রী যদি নিজের অস্তিত্ব ভুলে অমুকের স্বামী বা অমুকের স্ত্রী হয়ে সেই চরিত্রে অভিনয় করে যেতে হয় তাহলে একটা সময় অস্তিত্ব সংকট হবে এবং একসময় দাম্পত্য সমস্যার সম্মুখিন হবেন।

বিয়ের কিছুদিন পর উচ্ছ্বাসের পালা শেষ হলেই ধরে নেয়ার প্রবৃত্তিটা বড় হয়ে ওঠে। ধরেই নেয়া হয় সঙ্গীটির মুখ দেখেই মন পড়ে নেয়া সম্ভব।এই ধরে নেয়ার ফলেও ঘটে অঘটন।কারণ ‘না বলা’ কথা বোঝার অসাধারণ গুণটি সবার কেন অনেকেরই প্রায় থাকে না।তাই মনের ইচ্ছে মুখ ফুটে জানান একে অন্যকে।মনের ইচ্ছে মনে রেখে সঙ্গীকে বোঝতে না পারার দোষে দায়ী করবেন না। তাতে সমস্যা বাড়বে বই কমবেনা।

দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা যেমন জরুরী তেমনি জরুরী একে অপরের উপর যথেষ্ট বিশ্বাস থাকা।বিবাহিত জীবনে প্রেম নামক সলতেটি অনেক সময় নিবু নিবু হয় বাইরে থেকে আসা ঝোড়ো হাওয়ায়।কোন একজনের বিচ্যুতি ভীষণভাবে অন্যজনকে আহত করলেও ভালোবাসার প্রতি বিশ্বাস সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে।জীবনে এমন অনেক সময় আসে ভালোবাসার ভালোলাগাটাও উধাও হয়ে যেতেই পারে। কিন্তু তবুও ‘আমরা একে অন্যকে ভালোবাসি, ভালোবেসেই একসঙ্গে থাকবো’এই বিশ্বাসটুকুই বৈতরণী পার করে দেয়।

দাম্পত্য সম্পর্কে একে অন্যের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করা প্রয়োজন।এক সঙ্গে থাকার জন্য একের সম্পর্কে অন্যের অনেক রকম ধারনা তৈরী হয়। তাই খোলাখুলি আলোচনায় আপনারা কে কার সম্পর্কে কি ধারনা পোষন করছেন সে ‍বিষয়েও জানা থাকা প্রয়োজন।এতে যার যার দোষ-ত্রুটি প্রয়োজন মতো বদলে নেওয়া যায়।তাছাড়া আলোচনার মাধ্যমে অনেক সমস্যারও সমাধান করা যায়।

স্পর্শের ভেতর দিয়ে কথা না বলেও একে অন্যের সঙ্গে মানসিক স্তরে বা শারীরিক স্তরে যোগাযোগ ঘটানো যায় কোন রকম ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ না রেখেই স্পর্শে মধ্যে সব সময় যৌনতা থাকবে তা কিন্তু নয়।অনেক দম্পতি একে অন্যকে স্পর্শ করে যান না জেনেই এবং ক্রমাগত স্পর্শের মধ্য ‍দিয়েই নানা কাজের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে তৈরী করেন ভালোবাসার আশ্বাস।

দাম্পত্য জীবনে যৌনতার ভূমিকা গুরুত্বপুর্ণ কিন্তু তা যদি শুধুমাত্র রাতের ক্লান্ত বিছানায় একের ইচ্ছায় অন্যের আনন্দহীন সম্পর্কে আবদ্ধ থাকে তাহলে এতে ক্লান্তি আসবে অবশ্যই।এই ক্লান্তির হাত ধরেই আসে সম্পর্কে ফাটল।তাই সহজ, সাবলীল যৌন আনন্দ খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে একে অন্যকে সাহায্য করার চেষ্টাতেই হবে দাম্পত্যের ভিত শক্ত।

ছেলে-মেয়ে, শশুর-শাশুড়িসহ ভরপুর সংসারে আপনি যতই ব্যস্ত সময় কাটান না কেন তার মধ্য থেকেও নিজেদের জন্য সময় বের করে নেবেন। না হলে একে অপরের দিকে দৃষ্টি দেয়ার সুযোই মিলবে না।আর তাতে একে অপরের দিকে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ না পেতে পেতেই দু’জনে দুজনার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। সপ্তাহে একদিন বা দু’সপ্তাহে একদিন নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী বেড়িয়ে আসুন কোথাও থেকে।সেখানে হয়তো অতীত স্মৃতিচারণেই আনন্দে সময় কেটে যাবে।জীবনে ফিরে আসবে পুরানো উষ্ঞতা।সম্পর্ক যতোই পুরানো হোক না কেন মাঝে মধ্যে প্রয়োজন পরে একটু নিভৃতি, একটু নিরালা।

স্বামী-স্ত্রী যে কোন সমস্যা চারকান না করে নিজেদের মধ্যেই রাখবেন।এতে মনের মধ্যে এক ধরণের ক্ষত তৈরী হয়। সেক্ষেত্রে ক্ষতর পরিমানটা হিসেব না করে কিভাবে ক্ষতটা হলো, আর এর সমাধান কি তা দু’জনেই ভেবে দেখে কিনারা করে নিবেন।এ ক্ষেত্রে দু’জনেই খোলাখুলি আলোচনায় যাবেন।একদিনে ক্ষতটা কমবে না। তাই সময় দিতে হবে।দুটো মানুষ এক সঙ্গে থাকলে ঠুকাঠুকি হতেই পারে। তবে তৃতীয় ব্যক্তির প্রবেশ এক্ষেত্রে ঝামেলার কারণ হতে পারে। তাই সময় থাকতেই সাবধান হবেন।নিজেদের গোপন কথা নিজেদের মধ্যেই রাখবেন।

অনেকের ধারণা বিয়ের বন্ধন এমনই বন্ধন যা একবার গলায় পরলে সারাজীবনে আর কিছুই করার থাকে না।কিন্তু সম্পর্ক ব্যাপারটা পরিবর্তশীল। তাই পরিবর্তনের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিলেও নজর রাখতে হবে কোথায় কি ঘটছে।সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে হলে লালন করতে হবে।আপনার স্বামী বা স্ত্রী আজ যেমন আছেন কাল তেমন থাকবেন এ গ্যারান্টি আপনিই দিতে পারবেন। কারণ ওকে একই রকম রাখার দায়িত্ব কিন্তু আপনারই।আর একই রকম রাখলেই ধরে নেবেন না সম্পর্কটাও একই রকম থাকবে। তাই চোখ, কান, মন সব সময়ই খোলা রাখতে হবে।

দাম্পত্য জীবনের শুরু থেকেই বিবাহ বিচ্ছেদ সম্পর্কের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।এতে প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়া অনেক সহজ হবে।দু’পক্ষই যতটা পরোক্ষভাবে  সহিষ্ঞুতা ও ধৈর্য্ বাড়াবে তাতে ছোটখাটো ত্রুটির বেড়া টপকানো ততোটা সহজ হবে।বিবাহিত জীবনে খানা, খন্দ, গাড্ডা থাকবেই।তবুও এগুলো পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব যদি আপনাদের মনে পার হওয়ার সংকল্প দৃঢ় থাকে।

স্বাগতা জাহ্নবী
ছবিঃ গুগল